আশার ফুলটি ঝরে গেল
আশার ফুলটি ঝরে গেল

আশার ফুলটি ঝরে গেল

মো. মাঈন উদ্দিন

হ্যালো, হ্যালো, আর একটা কথা শোনো। তুমি কিন্তু অবশ্যই দশটার আগেই আসবে। শাহবাগের মোড়ে। জাদুঘরের গেটের বাম পাশটায়। তোমাকে নিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যাব। সময় সম্পর্কে সচেতন না হলে আবার তোমার সাথে আড়ি দেবো কিন্তু। 

-ঠিক আছে। দশটার আগেই আমি আসছি। লাইন কেটে দেয় ইভা।

আমার জন্মদিন কখনোই ঘটা করে পালন করিনি। তাই জন্মদিন নিয়ে এত মাতামাতিও নেই আমার। আজ আমার জন্মদিন, আমিই জানতাম না যদি না রাত বারোটা এক মিনিটে ইভা ফেসবুকে আমাকে উইশ করত। ইভার এই এক মহৎ গুণ। সময় সম্পর্কে সে খুবই সচেতন। পাঁচটার কাজ সে ঠিক পাঁচটাই করবে। পাঁচটা এক মিনিটে নয়। আমার অবস্থাটা তার উল্টো, আমি কখনো সময় সম্পর্কে সচেতন ছিলাম না, এখনো নই। শত চেষ্টা করেও সময়জ্ঞানটা আয়ত্তে আনতে পারিনি কখনো, এই সময়জ্ঞানহীনতার জন্য ইভা আমার সাথে কথা বলেনি এত দিন। সকাল বেলা ইভার ফোন পেয়ে ঘুম ভাঙে। কত দিন পর ইভার সাথে ফোনে কথা হলো। ইভা আর আমার সম্পর্ক পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এই পাঁচ বছরে কখনো আমাদের সম্পর্কের মাঝে পোকা ধরেনি। ইভার সান্নিধ্যে এসে আমার চালচলন, আচার-আচরণ, কথাবার্তা সব কিছুতেই রাতারাতি পরিবর্তন এসেছে। এ যেন জাদুর কাঠির আজব ছোঁয়া। হবেই না কেন, ইভা শুধু রূপবতীই নয়, বুদ্ধিমতিও। ইভা আমাদের ব্যাচে বরাবরই প্রথম হয়। আর আমি শেষের দিকের চার-পাঁচজনের গণ্ডি থেকে কখনো বের হতে পারিনি। আসলে ভালোবাসার মায়াজালে আটকা না পড়লে আমার মতো গবেটের সাথে ইভার জড়ানোর কথা না।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সকাল নয়টা বেজে গেছে। এক লাফে বিছানা ছেড়ে উঠলাম। না, আজ আর দেরি করা চলবে না। যে করেই হোক দশটার আগেই পৌঁছাতে হবে। চট করে গোসলটা সেরে নিলাম। ব্ল্যাক জিন্সের প্যান্টের সঙ্গে ব্লু টি-শার্ট পরে আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখলাম। এই পোশাকই ইভার পছন্দ। এই ব্লু টি-শার্টটি ইভাই আমাকে উপহার দিয়েছে। অনেক দিন পর সুখ নামক এক খণ্ড শুভ্র মেঘ উড়ে এসে আমার হৃদয় উঠোনজুড়ে বসেছে। আজ নিজেকে বেশ ফুরফুরে লাগছে। প্রায় এক মাস ধরে ইভার সাথে দেখা নেই, কথা নেই। ইভার চাঁদসম মুখখানি দেখা হয় না। দেখা হয় না সেই সুশ্রী চুলের আঁকাবাঁকা সিঁথি। কিন্তু তার মুক্তা ঝরানো হাসির মুহূর্তগুলো অনুভব করি সারাক্ষণ।

আজ আবার দেখা হবে। হবে চার চোখের নিবিড় মিলন। মনে মনে একটা পণ করে নিলাম- যখন আশপাশে কেউ থাকবে না সেই সুযোগে ইভার টুল পড়া গালে ছোট্ট করে একটা ভালোবাসার তিলক বসিয়ে দেবো। আমি দাঁড়িয়ে আছি জাদুঘরের গেটের বাম পাশটাই। ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে ঘুরছে। তাকিয়ে দেখি দশটা দশ মিনিট বাজে। কী আশ্চর্য! সময় সম্বন্ধে সচেতন হতে যে ইভা এত দিন আমাকে বারবার সতর্ক করেছে সেই ইভাই আজ সময়জ্ঞানহীন হয়ে গেল। এমন তো হওয়ার কথা নয়। তাহলে কি কোনো বিপদ...! মনে হয় জ্যামে আটকা পড়েছে। জ্যামের কথাটা তো ইভাও জানে, তাহলে..! এক অজানা শঙ্কায় আমার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে। হঠাৎ শাহবাগের মোড়ে গাড়ির জটলা। দূরে মানুষজনের জটলা দেখতে পাচ্ছি। কোনো সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে ওখানটায়। আমি উঁকি মেরে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছি। এমন সময় দুজন পথচারীর কথা আমার কর্ণকুহরে আঘাত করল।
-শুধু দেখলাম ফুলগুলো পড়ে গেল আর ফুলগুলো উঠাতে গিয়েই চাকার পিষ্ট হলো মেয়েটি। আহারে, কয়েকটি গোলাপের কারণে মেয়েটার জীবনটাই গেল।
-কখনো কখনো একগুচ্ছ ফুল হয়ে ওঠে মহামূল্যবান। হয়তো কোনো প্রিয় মানুষকে উইশ করার জন্যই ওই ফুলগুলো তার ভীষণ দরকার ছিল।

আমি এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে ভিড়ের দিকে দৌড়ালাম। ভিড় ঠেলে দেখি ইভা চিৎ হয়ে পড়ে আছে। তার বুকের তাজা রক্তে রাজপথ ছেয়ে গেছে। একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। একটি ট্রলিতে শুয়ে আছে ইভা। চোখ দুটি বড় বড় করে এক পলকে আমায় দেখছে সে। ডাক্তার স্পন্দন পরীক্ষা করে জানালেন, ইভা আর কোনো দিন সময়অসচেতনতার জন্য আমাকে সতর্ক করবে না। ইভা আর কোনো দিনও আমাকে জন্মদিনে উইশ করবে না। কখনো গোলাপ হাতে হাত বাড়িয়ে বলবে না- এ শুধু গোলাপ নয়, আমার বুকের সবটুকু ভালোবাসা, শুধু তোমার জন্য। শুধু তোমার...!

নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.