নির্যাতন বন্ধ করে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিন : বিসিডব্লিউএস

নয়া দিগন্ত অনলাইন

মানবিক কারণে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিলেও এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি, অর্থনৈতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকট। এই সংকট মোকাবিলায় আর্ন্তজাতিকভাবে মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা আরো জোরদার করা দরকার। সেই সাথে রোহিঙ্গা নারী ও শিশুরা যাতে এদেশে কোনো ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে না পরেন, সেই দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।
গত ২৮ অক্টোবর বাংলাদেশ সেন্টার ফর উইমেন সলিডারিটির উদ্যোগে, ঢাকায় অবস্থিত, মহিলা সমিতির আইভি রহমান হলে "নির্মম গণহত্যার শিকার রোহিঙ্গাদের প্রতি করণীয় এবং পবিত্র হজ্বব্রত পালনের স্মৃতি অভিজ্ঞতা” শীর্ষক মুক্ত আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
স্বনামধন্য সঙ্গীত শিল্পী ফাতেমা-তুজ-জোহরার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মুক্ত আলোচনা সভায় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন হেল্প এজ ইন্টারন্যাশনাল-এর বোর্ড মেম্বার(জাতিসঙ্ঘের সাবেক সিডো সদস্য ও বিটিভির সাবেক ডিজি) ফেরদৌস আরা বেগম, বার্ড-এর সাবেক ডিরেক্টর নুরুন্নাহার বেগম, বাংলাদেশ উইমেন জার্নালিস্টস ফোরামের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও দৈনিক যুগান্তরের সিনিয়র সাংবাদিক রোজী ফেরদৌস, বাংলাদেশ উইমেন জার্নালিস্টস ফোরামের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও দৈনিক দিনকালের সাবেক কূটনৈতিক প্রতিবেদক মাহমুদা চৌধুরী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এডভোকেট মরিয়ম মানসুর, সমাজসেবামূলক কাজের সাথে যুক্ত লুৎফুন্নেসা ও বিভিন্ন অঙ্গনের এবং পেশার সাথে যুক্ত নারীরা।
আলোচনা সভায় ফেরদৌস আরা বেগম বলেন, "রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন চালিয়ে যেভাবে তাদের হত্যা করা হয়েছে তা ইতিহাসে বিরল। মিয়ানমার সরকারের এ ধরনের আচরণের তীব্র নিন্দা জানাই। সারা বিশ্বের সকল মানুষ এই নির্যাতনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। রোহিঙ্গাদের এই মানবিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। মিয়ানমারের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করে সম্মিলিতভাবে প্রতিবাদ করতে হবে। আমার প্রস্তাবনা হলো, ১. মিয়ানমার তাদের মাতৃভূমি। সেখানে সসম্মানে, নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে, তাদের ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করা । এর বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির ব্যবস্থা করা। ২.যতদিন তারা এদেশে আছে, সরকার মানবিক দায়িত্ব নিয়ে জায়গা দিলেও, আমাদের সব বাংলাদেশীর পক্ষ থেকে তাদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া। আমরা ১৬ কোটি মানুষ। ১ টাকা করে দিলেও ১৬ কোটি টাকা হয়ে যাবে। ৩. রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরে নাকি অনেক শিশু ওতরুণীরা হারিয়ে যাচ্ছে। এখানে নারী ও শিশু পাচারকারীরা যাতে তাদের উদ্দেশ্য সফল না করতে পারে, তাই সরকারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে । যতদিন তারা নিজেদের দেশে ফিরে যেতে না পারে, ততদিন পর্যন্ত।"
বার্ড-এর ডেপুটি ডিরেক্টর নুরুন্নাহার বেগম বলেন, "নিজের মাতৃভূমি ছেড়ে যাওয়া কতটা কষ্টের তা আমরা '৭১ সাল থেকেই জানি। আরাকানে রোহিঙ্গাদের উপর হত্যা, ধর্ষণসহ যে নৃশংসতা চালানো হচ্ছে তা যেকোনো দেশে যুদ্ধ ঘোষণা করা হলে, সেখানেও এত নৃশংসতা দেখা যায় না। তিনি রোহিঙ্গাদের প্রতি মানবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করায় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান। বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের বসবাসের স্থানগুলো যেন নিরাপদ হয় এবং এখানে কোন নারী ও শিশুরা যেন বঞ্চনার শিকার না হয়, তাদের সম্পদ, অর্থ যেন কেউ হাতিয়ে নিতে না পারে, সে দিকে সরকার কে লক্ষ্য রাখতে হবে।"
বাংলাদেশ উইমেন জার্নালিস্টস ফোরামের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট রোজী ফেরদৌস বলেন, "রোহিঙ্গা নারী, শিশুসহ সকলের মানবিক বিপর্যয়ের খবরে আমাদের অন্তরে প্রতিনিয়ত রক্ত ক্ষরণ হচ্ছে। এ জন্য মিয়ানমার সরকারের প্রতি নানাভাবে চাপ প্রদান সহ প্রয়োজনে তাদের শাস্তি প্রদানের জন্য বিশ্বের সকল দেশকে এগিয়ে আসতে হবে। শত শত নারী গর্ভবতী দেখা যাচ্ছে। এত নারী কেন গর্ভবতী তা নিয়ে আমাদের মনে প্রশ্ন ছিল। জানা গেল ধর্ষণের ভয়ে তারা গর্ভধারণ করে। কী সাংঘাতিক ব্যাপার! প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ আসছে সে জন্য আমাদের সাধ্য অনুযায়ী তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। আর হজ্জ্বের স্মৃতিচারণ প্রসঙ্গে বলবো, এটা আমার স্বপ্ন পূরণের অভিজ্ঞতা। ঐ পবিত্র ভূমিতে গেলে মন অন্যরকম হয়ে যায়। ঈমানের মজবুতি আসে। প্রত্যেক সামর্থ্যবানের হজ্জ্ব করা উচিত।"
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মরিয়াম মানসুর বলেন, "আমি এখন খবর পড়তে পারি না, খবর দেখতে পারি না আমার কষ্ট হয়। সকল ধর্মে মানবহত্যা নিষিদ্ধ এবং মহাপাপ তাহলে কেন এই হত্যাকাণ্ড? শিশুদের পর্যন্ত হত্যা করা হচ্ছে তাদের তো কোনো দোষ নেই। এই নির্যাতনের বিরুদ্ধে আমাদের সোচ্চার হতে হবে। রোহিঙ্গাদের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।"
বাংলাদেশ উইমেন জার্নালিস্টস ফোরামের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাহমুদা চৌধুরী বলেন, "আমাদের পররাষ্ট্রনীতিকে আরো মজবুত করতে হবে এবং রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে জাতিসঙ্ঘের মাধ্যামে মিয়ানমারের উপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে। বলা হচ্ছে ১০ লাখ রোহিঙ্গা এসেছে। এখনও আসছে। আমাদের দরিদ্র এই দেশ এত মানুষের ভার কীভাবে সহ্য করবে? এর একটা স্থায়ী সমাধান করতে হবে। আজ সমগ্র বিশ্ব বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে। অনেক দেশ আবার বাংলাদেশের উপর রোহিঙ্গা ইস্যুকে জোর করে চাপিয়ে দিচ্ছে। দুঃখজনক হলেও সত্য অনেক মুসলিম দেশ রোহিঙ্গা ইস্যুতে নিরব ভূমিকা পালন করছে । তাই, আমাদের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিয়ে মিয়ানমারের উপর চাপ সৃষ্টির বিকল্প নেই।"
সভাপতির বক্তব্যে বিশিষ্ট সংঙ্গীতশিল্পী ফাতেমা-তুজ-জোহরা বলেন, "হেমন্তের এই সুন্দর সকালে, আমাদের কিছু অসুন্দর কথা বলতে হচ্ছে। ১৯৭১ সালে আমরা ছিলাম শরণার্থী। আমাদেরটা ছিল মুক্তিযুদ্ধ। আর রোহিঙ্গাদের এটা হচ্ছে মৃত্যুযুদ্ধ। এখানে কোন যুদ্ধ নেই। আছে শুধু মৃত্যুর খবর। বর্তমান বিশ্ব কী করবে তা জানি না, তবে আমাদের নির্লিপ্ত থাকার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের এই দুটি হাত খুব দুর্বল। এই হাত দুটো দিয়ে কিছু করতে পারছি না। আমাদের আন্তর্জাতিক সমর্থন দরকার। তা না হলে তো আমাদের পক্ষে একা কিছু করা সম্ভব হচ্ছে না । আমাদের মনটা অনেক বড়।কিন্তু, সামর্থ্য ছোট। রোহিঙ্গাদের প্রতি সাহসিকতাপূর্ণ ভূমিকার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে তিনি ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, তাদের দায়িত্ব নেয়াটা খুব সহজ কাজ ছিল না। কিন্তু, এর শেষ কোথায়? তাদের তো নিজেদের বাড়িতে নিরাপদে, সসম্মানে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। হজ্জ্বের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, হজ্জ্ব করতে পারা আল্লাহ্‌র এক বিশেষ নেয়ামত প্রাপ্তি। আমার রাসুল যে পথে হেঁটেছেন, আমি সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছি, যে ধূলো বালিতে তার স্মৃতি জড়িয়ে আছে, তার উপর দিয়ে আমি হাঁটছি এ এক বিস্ময়কর আনন্দ। এটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না।
অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট নজরুল সঙ্গীত শিল্পী ইয়াসমিন মুশতারীর গান পরিবেশনায় এক অন্যরকম আবহ তৈরী হয়। উপস্থিত সবাই অনুরোধ করলে সভাপতি নিজের লেখা একটি নাতে রাসুল ও একটি নজরুল সঙ্গীত পরিবেশন করেন । সব শেষে একটি কেক কাটা হয়। এতে বাংলাদেশ সেন্টার ফর উইমেন সলিডারিটির মুক্ত মত প্রকাশ অনুষ্ঠানে আনন্দ এক ভিন্ন মাত্রা পায় । আমন্ত্রিত অতিথি ছাড়াও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন চিফ কোঅর্ডিনেটর শাহিন আখতার আঁখি, উইমেন জার্নালিষ্টস ফোরামের প্রচার-প্রকাশনা এবং সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক ও অনুষ্ঠানের কো অর্ডিনেটর খাতুনে জান্নাত কণা, সাব কো অর্ডিনেটর আকলিমা ফেরদেৌসী ও মুশফিকা সাদিয়া। উপস্থাপনায় ছিলেন-টিভি সংবাদ উপস্থাপক ফারজানা মাহবুবা।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.