মৃৎশিল্প

শওকত আলী রতন

আমাদের দেশের অতি প্রাচীন শিল্পের নাম মৃৎশিল্প। মৃৎশিল্পের কারিগরেরা কুমার বা পাল নামে পরিচিত। যুগ যুগ ধরে এ পেশার সাথে জড়িতরা মাটি দিয়ে তৈজসপত্র তৈরির মাধ্যমে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। গভীর ভালোবাসা আর মমতা দিয়ে নিপুণ হাতের কারুকাজের মাধ্যমে তৈরি করেন নানা তৈজসপত্র। কুমারদের জীবন-জীবিকার উপকরণ হলো মাটি। এঁটেল মাটিকে কয়েকটি ধাপে কাজ করার পর একটি পণ্য ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা হয়। কিন্তু কালের বিবর্তনে আধুনিকতার ছোঁয়ায় তাদের ভালোবাসার সেই জীবিকার জায়গাটি দিন দিন ফিকে হতে বসেছে। দিন যতই যাচ্ছে, ততই বাড়ছে নতুন নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার। আর প্রযুক্তির ব্যবহারের কারণে মাটির তৈরী তৈজসপত্রের জায়গা দখল করছে অন্য সব সামগ্রী। একসময় আমাদের দেশে মাটির তৈরি নানা তৈজসপত্রের আধিক্য থাকলেও প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে মাটির জিনিসপত্রের ব্যবহার কমে গেছে অনেকাংশে। তবে মাটির সব জিনিসই কিন্তু হারিয়ে যায়নি। মাটির তৈরী নানা পট-পটারি, ফুলদানি ও বাহারি মাটির হাঁড়ির কদর এখন আছে। শহরবাসী ঘর সাজাতে অনেকেই মাটির সামগ্রী ব্যবহার করেন, তার পরও এ পেশায় যারা আছেন তাদের চলছে দুর্দিন।
জানা যায়, ঢাকার দোহার উপজেলায় প্রায় ২০০ বছর আগে গোড়াপত্তন হয়েছিল এ শিল্পের। সেই থেকে আজো নানা প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে টিকে থাকলেও আগের সেই জৌলুশ নেই প্রাচীন এ শিল্পের। উপজেলার অরঙ্গাবাদ, কার্তিকপুর, কাচারীঘাট, লটাখোলা, জয়পাড়া, দোহার ও মালিকান্দা এলাকায় পাল সম্প্রদায়ের লোকজন এ পেশার সাথে সম্পৃক্ত আছেন দীর্ঘ দিন ধরে।
মাত্র দেড় যুগ আগেও দোহারের কারিগরদের হাতে তৈরী মৃৎশিল্পের দাপট ও কদর দুটোই ছিল। আর্থিক অবস্থাও ছিল অনেক ভালো। একসময় দোহারে দেড় থেকে দুই শতাধিক পরিবার মাটির জিনিসপত্র তৈরি করে অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করত পাল সম্প্রদায়ের লোকজন। আগের মতো কাজকর্ম না থাকায় এ পেশার লোকজন দুঃখদুর্দশা আর হতাশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। বর্তমানে সব মিলয়ে ২০-২৫টি পরিবার এ কাজের সাথে সম্পৃক্ত থেকে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করছে।
এ ছাড়া মাটির তৈরী তৈজসপত্রের ব্যবহার কমে যাওয়ায় বর্তমানে হাতেগোনা কয়েকটি পণ্য তৈরি হয়। কুমারপাড়া এলাকা ঘুরে জানা গেছে, দুই দশক আগেও এ পেশার শিল্পীরা সোনালি যুগ পার করেছেন। মাটির তৈর বিভিন্ন ধরনের হাঁড়ি, সরা, কলস, বাসন, বদনা, মুড়ি ভাজার খোলা, কোলা, ভাটি ও মঠ তৈরি হতো কুমারপল্লীতে। তখন চাহিদা ছিল ব্যাপক আর বিক্রিও হতো সন্তোষজনক। বর্তমানে লোকসংখ্যা যে হারে বেড়েছে, সে অনুযায়ী বাড়েনি মৃৎশিল্পের চাহিদা। বরং দিন দিন এর চাহিদা কমে যাওয়ার ফলে তাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে আর্থিক সঙ্কট, বেড়েছে দরিদ্রতা। বাজারে আধুনিক প্রযুক্তির অ্যালুমিনিয়াম, প্লাস্টিক ও স্টিলের তৈজসপত্রের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে মাটির তৈরী অনেক পণ্যই হারিয়ে গেছে। এখন যেসব পণ্যের ব্যবহার বিদ্যমান আছে সেগুলো তৈরি করে কুমারপাড়ার মৃৎশিল্পীরা। প্রতিযোগিতার মাধ্যমে এখনো টিকে রয়েছে পাতিল, হাতানি, খাদা, সরা, পিঠা তৈরির খাঁজ, জালের কাঠি, মাটির ব্যাংক ও জলকান্দা ইত্যাদি। তবে দইয়ের পাতিলের চাহিদা সবচেয়ে বেশি এখানে।
মাটিকে কয়েকটি ধাপে কাজ করার পর কেবল তৈরি করা হয় এসব পণ্য। আর এ জন্য সময় ও শ্রম দুটোরই প্রয়োজন।
মাটিকে প্রথমে পানি দিয়ে পায়ের সাহায্যে ভালোভাবে ছেনে নরম করতে হয়, সেই মাটি কখনো হাতের সাহায্যে আবার কখনো চাকার সাহায্যে তৈরি করা হয় মাটির তৈজসপত্র। যখন বানানো হয়, তখন খুবই নরম থাকে এগুলো। রোদে চার-পাঁচ দিন পর্যন্ত ভালোভাবে শুকিয়ে নিতে হয়। শুকানোর পর তাতে রঙ দিয়ে তারপর আগুনে পোড়াতে হয়। পোড়ানোর পরই ব্যবহার উপযোগী হয় মাটির তৈরি তৈজসপত্র। আর সবগুলো কাজই করে থাকেন এ সম্প্রদায়ের নারীরা। মূলত এ শিল্পকে টিকিয়ে রেখেছেন নারীরা। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এ কাজ করতে হয় তাদের। হাড়ভাঙা খাটুনির দিয়ে একেকটি পণ্য তৈরি করতে হয়। যা চোখে না দেখলে বিশ^াস করা দুরূহ।
দোহার কুমারপাড়ার একজন শিল্পী জানান, একসময় আমাদের চাল কিনে খেতে হয়নি। গ্রামে গ্রামে চিটা ধানের বিনিময়ে হাঁড়ি-পাতিল বিক্রি করে যে ধান পাওয়া যেত, তা দিয়েই চলে যেত প্রায় সারা বছর। কিন্তু চাহিদা না থাকায় গ্রামে গ্রামে গিয়ে আগের মতো বিক্রি হয় না। শুধু সপ্তাহে একদিন জয়পাড়ার হাটে বিক্রি করা হয় এসব পণ্য। তারপরও বিক্রি আগের মতো হয় না।
কুমারপাড়ায় ঢুকলেই চোখে পড়ে তাদের কষ্টের জীবনযাত্রা। গোটা পাড়াতেই যেন লেগে আছে শত কষ্ট আর অভাবের ছোঁয়া। উপজেলার কাচারীঘাট এলাকার কুমারপাড়ার উল্লাদ পাল নামে একজন ক্ষোভের সাথে বললেন, কুমাররা কিভাবে আছে এ খোঁজখবর কেউ রাখেন না। জানতেও চান না তাদের সুখ-দুঃখ, সুবিধা-অসুবিধার কথা।
মাটির ও জ্বালানির দাম বেড়ে অনেক গেছে অনেক। আগে যে মাটি এ হাজার টাকা দিয়ে কিনতে হতো তার বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। কুমারদের টিকে থাকার আর কোনো রাস্তা নেই। তারা বলেন, তাদের সন্তানেরা এ পেশা বাদ দিয়ে অন্য পেশায় কাজ করছে। সরকার যদি এ পেশাকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে একসময় বন্ধ হয়ে যাবে মৃৎশিল্প। লটাখোলা কুমারপল্লীর শান্তি পাল জানান, মাটির জিনিসপত্রের ব্যবহার না থাকায় আমরা কোনোরকম কাজ করে চলছে আমাদের জীবন। অন্য কোনো পেশায় কাজ করতে পারব না বলে নিরুপায় হয়ে পূর্বপুরুষের রেখা যাওয়া কাজ করছি। এই কাজে হাড়ভাঙা খাটুনি অথচ আয় নেই। খরচ বাদ দিয়ে যো সামান্য আয় হয় তা দিয়ে খেয়েপড়ে বেঁচে আছি। পরবর্তী বংশদরদের জন্য যে কিছু রেখে যাব, সে ব্যবস্তা নেই আমাদের।
নিজেদের বসবাসের জন্য সামান্য ভিটেটুকু ছাড়া তাদের অন্য কোনো জমি নেই। তারপরও তারা তাদের এই পেশার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে আঁকড়ে ধরে আছেন এই শিল্পকে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.