মানবিকতায় জর্ডানের রানী

আলমগীর কবির

রোহিঙ্গাদের ওপর যেভাবে বর্বর নির্যাতন চালিয়েছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী, তাতে সবচেয়ে জোরালো প্রতিবাদ হওয়ার কথা মুসলিম বিশ্ব, বিশেষ করে আরব দেশগুলো থেকে। কিন্তু নিজেদের অন্তর্দ্বন্দ্ব তাদের প্রতিবাদের ভাষাকে নরম করে দিয়েছে। তার পরেও সবার দৃষ্টি ওই দিকেই বেশি। এর মধ্যে জর্দানের রানীর রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবির পরিদর্শন এবং এর আগে গত ৭ সেপ্টেম্বর তুরস্কের ফার্স্টলেডি এমিনি এরদোগানের সফর বিশ্ব দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
রোহিঙ্গাশিবির পরিদর্শন শেষে জর্ডানের রানি রানিয়া আল আবদুল্লাহ বলেছেন, কেবল মানবিক করণে নয়, ন্যায়বিচারের স্বার্থে রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানো উচিত। তিনি মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করে রোহিঙ্গা নির্যাতন বন্ধ করা এবং তাদের দেশটিতে ফিরিয়ে নিতে এখনই ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানান। ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটির (আইসিআর) পর্ষদ সদস্য ও জাতিসঙ্ঘের ত্রাণবিষয়ক সংস্থাগুলোর একজন দূত রানী রানিয়া আল আবদুল্লাহ।
তিনি জানিয়েছেন, রোহিঙ্গাশিবির পরিদর্শন করে তার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, তা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরবেন। একই সাথে রোহিঙ্গাদের জন্য জরুরি সহায়তার পরিমাণ দ্রুত যাতে বাড়ানো সম্ভব হয়, সে চেষ্টা চালাবেন।
রানীর এসব কর্মকাণ্ড তার মানবিক মূল্যবোধ রানির অতীত কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আকর্ষণ বাড়িয়েছে। জর্ডানের রানী রানিয়া আল আবদুল্লাহ বা রানিয়া আল-ইয়ানি ১৯৭০ সালের কুয়েতের এক ফিলিস্তিন পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পরে কর্মক্ষেত্রের কারণে জর্ডানের আসেন এবং এখানেই জর্ডানের প্রিন্স বা যুবরাজ আবদুল্লাহর সাথে তার পরিচয় হয়। এই পরিচয়ের ফলে বিয়ে পর্যন্ত গড়ায় এবং তিনি হয়ে ওঠেন যুবরাজ আবদুল্লাহর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও পরামর্শক। যুবরাজের কর্মক্ষেত্রে তার বিচক্ষণ প্রভাব দেখা যায়। যেমনÑ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিককরণ, সাংস্কৃতিক বিনিময়, তরুণযুবার ভবিষ্যৎ এবং ক্ষুদ্র-অর্থনীতি (গরপৎড় ভরহধহপব)। তিনি সামাজিক মাধ্যম ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্ট্রাগ্রাম ও টুইটারে নিজেকে পরিচিত ও জনপ্রিয় করেছেন। তার দুই মেয়ে ও দুই ছেলে আছে। সামাজিক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও সরকারি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
শিক্ষা ক্ষেত্রে তার অবদান বেশ আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৫ সাথে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে রানী ও রাজা ‘শিক্ষক পুরস্কার’ চালু করেন। এ ছাড়া শিশুদের জন্য মিউজিয়াম, স্কুল ও বৃত্তির ব্যবস্থা করেন। এসব কাজের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য তিনি ‘চ্যাম্পিয়ন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান খুলেছেন যার প্রধান কর্মকর্তারূপে তিনি পরিচালিত করেন প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া তিনি ‘রয়েল হেলথ অ্যাওয়ারনেস সোসাইটি’র চেয়ারম্যান।
‘রানী রানিয়ার প্রথম কাজ ১৯৯৫ সালে জর্ডান রিভার ফাউন্ডেশন গড়ে তোলার মাধ্যমে। ২০০৩ সালে তিনি ‘আল-আমান ফান্ড ফর দি ফিউচার অব অরফান’Ñ এই সংগঠনের সাথে আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর করেন, যার ফলে দরিদ্র, মেধাবী ও অনাথ যুবসমাজের শিক্ষার প্রসার ঘটে। তিনি ‘ইনজাজ আল-আরব’ নামে একটি সংগঠনের মুখপাত্ররূপে তরুণযুবাদের শিক্ষা প্রদান এবং তাদের সাথে আলোচনা করেন। প্রতিষ্ঠানটি আরব বিশ্বের যুবাদের প্রতিষ্ঠান, যার মাধ্যমে তারা নিজেদের মতামত ও শিক্ষার প্রসার ঘটাতে পারে। ২০০০ সালে ইউনিসেফ গ্লোবাল লিডারশিপ ইনিশিয়েটিভে তাকে আমন্ত্রণ জানায়। যেখানে তিনি অন্য বিশ্বনেতাদের সাথে শিশুদের অধিকার সুরক্ষায় অংশ নেন। ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে তিনি ইউনিসেফের প্রথম শিশুদের অ্যাডভোকেট হিসেবে সম্মানিত হন। ২০০৯ সালে রানীর সম্মানিত বিশ্বনেতারূপে ইউএনজিইআইর মুখপাত্র নির্বাচিত হন। একই বছর তিনি গ্যারি লিনেকারের সাথে মিলে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, যার স্লোগান হলো, ‘এক লক্ষ্য : সবার জন্য শিক্ষা’। এসব মাধ্যমে তার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য এবং একই সাথে গ্রহণযোগ্য। এর ফলে সমগ্র মুসলিম ও অন্যান্য দেশে তার এই মতামত বা কার্যক্রম ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে এবং মুসলিম নারী রূপেই শুধু নয় বরং একজন শক্তিশালী, আদর্শবাদী, উন্নয়শীল নারীরূপে তার পরিচিত সবার কাছে সমাদৃত। এরই স্বীকৃতিস্বরূপ তার আন্তর্জাতিক সম্মাননা অসংখ্য।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.