মিয়ানমারের পথে শ্রীলঙ্কা

আসিফ হাসান

উগ্র বৌদ্ধদের অসহিষ্ণুতায় মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য ছারখার হয়ে গেছে। রোহিঙ্গা মুসলিমদের বেশির ভাগই পালিয়ে আসতে হয়েছে বাংলাদেশে। তাদের উসকানিতে নিরাপত্তাবাহিনী এবং মগরা যে হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগসহ এমন সব জঘন্য কাজ করেছে যে জাতিসঙ্ঘ এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা একে জাতিগত নির্মূল অভিযান, গণহত্যা ইত্যাদি অপরাধ হিসেবে অভিহিত করেছে। এখন আরেক মিয়ানমার হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে শ্রীলঙ্কার।
একটি বিশেষ প্রেক্ষাপটে ২০১৫ সালে শ্রীলঙ্কায় মাহিন্দ রাজাপাকসে সরকারের পতন হয়েছিল। সন্দেহ নেই, তাতে চীনা প্রভাব কমাতে যুক্তরাষ্ট্র-ভারতের একটি পরিকল্পনা কাজ করেছিল। কিন্তু সেই সাথে দেশটির তামিল ও মুসলিমদের ভূমিকাও কম ছিল না। তারা তুলনামূলক উদার, অসাম্প্রদায়িক একটি দেশ গঠনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে একচেটিয়াভাবে মাইথ্রিপালা সিরিসেনাকে ভোট দিয়েছিল। তাদের ভোটের কারণেই তিনি প্রেসিডেন্ট হতে পেরেছিলেন।
সিরিসেনা যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তার অন্যতম ছিল অন্যান্য ধর্মের লোকদের বঞ্চনার অবসান ঘটানো। আর সেটার জন্য সংবিধান প্রণয়ন। তিনি এই কাজে বেশ কিছুটা এগিয়েও গিয়েছিলেন। কিন্তু উদ্যোগ পুরোপুরি থমকে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। কারণ শ্রীলঙ্কা বৌদ্ধদের শীর্ষ সংগঠন সুস্পষ্টভাবে নতুন সংবিধানের ব্যাপারে তাদের আপত্তির কথা জানিয়েছে। এমনকি তারা বিদ্যমান সংবিধানের কোনো ধরনের সংশোধন পর্যন্ত চায় না বলে জানিয়ে দিয়েছে। নতুন সংবিধান তামিল টাইগার বিদ্রোহীদের কাক্সিক্ষত বিচ্ছিন্নতাবাদের আদর্শ বাস্তবায়নে উৎসাহ জোগাবেÑ এমন ধুয়ো তুলে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা এই আপত্তি জানাচ্ছেন। তা ছাড়া তাদের শঙ্কা, নতুন সংবিধানে হিন্দু ও ইসলাম ধর্মের মতো সংখ্যালঘু ধর্মগুরুর জন্য অধিকার দেয়ার ব্যবস্থা থাকায় বৌদ্ধদের জন্য সাংবিধানিক সুরক্ষা হিসেবে থাকা ‘সর্বোচ্চ মর্যাদা’রও হানি ঘটাবে।
সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলা-বৌদ্ধদের (তারা জনসংখ্যার ৭০ ভাগ) মধ্যে ‘শ্রীলঙ্কার জাতীয়তাবাদ’-এর অর্থ হলো ‘সিংহলা-বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ’। এর মানে হলো সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা। অন্যরা নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকার ভোগ করলেও সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হবে কেবল বৌদ্ধধর্ম এবং এর শ্রেষ্ঠত্ব অক্ষুণœ রাখা। শ্রীলঙ্কা হবে মূলত ‘সিংহলা-বৌদ্ধ দেশ’। এখানে অন্যান্য সম্প্রদায় ও ধর্মীয় গ্রুপগুলো স্রেফ ‘অতিরিক্ত অংশ’ হিসেবে থাকতে পারে।
উগ্র বৌদ্ধদের এই আপত্তি একেবারে নতুন নয়। প্রায় তিন মাস আগে শ্রীলঙ্কার শীর্ষতম পুরোহিত ঘোষণা করেছিলেন দেশের জন্য নতুন কোনো সংবিধানের প্রয়োজন নেই। এরপর বুড্ডিস্ট মহাসঙ্ঘের মালাবাত্তি ও আসগিরিয়া শাখা আবারো সংবিধানে আংশিক বা পুরোপুরিÑ যেকোনো ধরনের পরিবর্তনে আবারো বিরোধিতার কথা প্রকাশ করে। ধারণা করা হচ্ছিল, নতুন সংবিধান প্রশ্নে গণভোটের আয়োজন করা হবে। জনগণই সিদ্ধান্ত নেবে এ ব্যাপারে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, শ্রীলঙ্কার বৌদ্ধ পুরোহিতরাই সংবিধান ভালো বা মন্দ সে সিদ্ধান্ত নেয়ার একমাত্র ক্ষমতার অধিকারী। এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা ক্রমাগতভাবে স্বীকার করছেন, বৌদ্ধ পুরোহিতরাই হবে একমাত্র রক্ষক। তারাই সিদ্ধান্ত নেবে সংবিধান সংশোধন করা হবে না নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা হবে।
পুরোহিতরা প্রদেশগুলোকে বেশি ক্ষমতা দেয়ার তীব্র বিরোধী। তাদের মতে, এতে করে তামিলরা স্বাধীনতার পথ ধরতে পারে। বিশেষ করে নর্দার্ন ও ইস্টার্ন প্রভিন্স নিয়ে তাদের চিন্তা। সিরিসেনা কেন্দ্রীয় ক্ষমতা কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন; কিন্তু এখন সম্ভবত সেটাও হচ্ছে না।
গত কয়েক মাসে প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা কয়েকবারই বলেছেন, বৌদ্ধ পুরোহিতরা অনুমোদন না করলে তিনি সংবিধানে হাত দেবেন না। গত জুলাই বৌদ্ধ পুরোহিতদের মহাসঙ্ঘ প্রথমবারের মতো সংবিধান পরিবর্তনের ব্যাপারে তীব্র আপত্তি জানায়। তখন সিরিসেনা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যেকোনো নতুন সংবিধান প্রণয়নের আগে তিনি বৌদ্ধ নেতাদের সাথে আলোচনা করবেন।
এতে করে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা আরো শক্তি পেয়ে যায়। এর জের ধরে সম্প্রতি ঐতিহাসিক নগরী ক্যান্ডিতে বুড্ডিস্ট মহাসঙ্ঘের মালাবাত্তি ও আসগিরিয়া শাখা সভা করে পুরনো সংবিধানের প্রতি তাদের দ্বিধাহীন আস্থার কথা জানিয়ে বলে, নতুন কোনো সংবিধানের দরকার নেই বা আগেরটির কোনো পরিবর্তনেরও প্রয়োজন নেই। সন্ন্যাসীরা সংবিধান প্রণয়নপ্রক্রিয়া অবিলম্বে বাতিল করার জন্যও আহ্বান জানান।
সভার পর সন্ন্যাসীরা মিডিয়াকে জানান, প্রস্তাবিত সংবিধান স্থানীয় সংস্থাগুলোকে ক্ষমতা দেবে। এতে করে ক্ষমতার বিভাজন হবে। তারা জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান সংবিধান যথেষ্ট ভালো।
সন্ন্যাসীদের এই বক্তব্য সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দ রাজাপাকসের বক্তব্যই প্রতিধ্বনিত করেছে। তিনিও জোরালোভাবে বলেছেন, নতুন সংবিধানের প্রয়োজন নেই। উল্লেখ্য, সন্ন্যাসীদের সাথে তার নিয়মিত বৈঠক এবং বিভিন্ন মঠে তার নিয়মিত যাতায়াতের বিষয়টি সবারই জানা।
তবে বৌদ্ধ পুরোহিত এবং রাজাপাকসে উভয়েই নির্বাচনী সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন। তারা কিছু ক্ষেত্রে বেশি ভোটপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে জয়ী ঘোষণা করার ব্যবস্থা প্রবর্তনের পক্ষে।
মজার ব্যাপার হলো, সংবিধান নিয়ে বৌদ্ধ পুরোহিতদের সর্বশেষ এই বিরোধিতা এলো উত্তর জাফনায় তামিলদের কাছ থেকে প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা বিরূপ আচরণ পাওয়ার প্রেক্ষাপটে। তামিলরা সিরিসেনার অনুষ্ঠান বয়কট করে। এমনকি তাকে সমর্থন না করলে দৈত্য ফিরে আসবে বলে তিনি যে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন, তাতে তামিলরা সাড়া দেয়নি।
জাতীয় তামিল ভাষাদিবস উপলক্ষে আয়োজিত জাফনার সমাবেশে সিরিসেনা বলেছিলেন, আপনারা আমার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করলে আমি দুর্বল হবো, দৈত্য সুযোগ পেয়ে যাবে। তবে তামিলরা তার এই মন্তব্যকে এক দৈত্যের বদলে আরেক দৈত্যের আবির্ভাব হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছে। অর্থাৎ এক দৈত্যকে বিদায় করে সিরিসেনা নিজেই দৈত্যে পরিণত হয়েছেন।
এ দিকে উত্তরাঞ্চলীয় লোকজনের কাছে, বিশেষ করে তামিলদের দৃষ্টিতে, সিরিসেনা ও রাজাপাকসের মধ্যে পার্থক্য কমে আসছে। তামিল ও মুসলিমদের ভোটেই ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে সিরিসেনার কাছে রাজাপাকসের পরাজয় নিশ্চিত হয়েছিল। সিরিসেনা ক্রমবর্ধমান হারে সিংহলা জাতীয়তাবাদী ভাবাবেগ ধারণ করায় এসব ভোটারের মোহভঙ্গ ঘটছে। শ্রীলঙ্কায় বৌদ্ধধর্মের অভিভাবক হিসেবে আবির্ভূত হতে সিরিসেনা দৃশ্যত এখন রাজাপাকসের সাথে প্রতিযোগিতায় নেমেছেন।
আগামী প্রেসিডেন্ট ও সাধারণ নির্বাচন হবে ২০২০ সালে। তখনই বর্তমান সরকারের পরিবর্তন হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে পর্যবেক্ষকেরা মনে করছে, দেশটিতে নির্বাচনী সংস্কার হবে, কিন্তু সংবিধানে কোনো পরিবর্তন আসবে না। শ্রীলঙ্কার প্রভাবশালী বৌদ্ধ পুরোহিত এবং জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলোর আবেগ ও দাবির কাছে বর্তমান সরকার নতজানু হওয়ার প্রেক্ষাপটে প্রদেশগুলোর কাছে কিছু ক্ষমতা দিয়ে ফেডারেল না হলেও এককেন্দ্রিক সরকারব্যবস্থার কিছু পরিবর্তন-সংবলিত সংবিধান সংস্কারের সম্ভাবনা বলতে গেলে নেই।
আর এর রেশ ধরে শ্রীলঙ্কার সংখ্যালঘুদের থাকতে হবে মারাত্মক চাপে। হয়তো কোনো উসিলায় সেখানেও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়বে। মিয়ানমারে যেমন উগ্রপন্থী বিরাথু আছেন, শ্রীলঙ্কাতেও আছেন বাড়–বালা সেনার গলাগোড়া গনানাসারা। এই উগ্র বৌদ্ধও মুসলিমদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের উসকানিমূলক তৎপরতা চালাচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে মুসলিমদের বেশ কিছু ধর্মীয় ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এমনকি শ্রীলঙ্কায় আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের ওপরও হামলা চালানো হয়েছে। অর্থাৎ ভয়াবহ উত্তপ্ত অবস্থাতেই আছে শ্রীলঙ্কা।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.