মাঠে মাঠে নুয়ে আছে প্রাণ

আজাদুর রহমান

বিরল থেকে পিচপথে মাইল আষ্টেকের পর ডানহাতি মেঠোপথ। পায়ে পায়ে কুয়াশার খবর। গ্রামাঞ্চল, টেনে নিচ্ছে আগাম ওম। পিচ ছেড়ে মেঠো পথ, নেমে যেতে যেতে আমরা টের পাই ঘন তুতগাছে ছাওয়া সুড়ঙ্গপথ। ছায়াবন, একেবেঁকে ঘাসগলি। বাতা বয়ে মনমাতানো ধানপাথার, উথালিপাথালি ঢেউ অন্যগ্রামে গিয়ে ঠেকেছে। সবুজমাঠ আর আবাদি অলি বেয়ে আমরা ছুটতে থাকি। হঠাৎ উড়ে আসা হরিণেরা যেন দু-একটি করে সাইকেলসমেত বালিকার দেখা মেলে। হদ্দগ্রামে আশ্চর্য্য হই। নীল ফ্রকের ইউনিফর্মে বালিকারা অবলীলায় প্যাডেল চালিয়ে বাড়ি ফিরছে। জেলাশহরের চোখ পোক্ত হওয়ার আগেই ফুটে গেছে সাদামাটা গ্রাম্যচোখ, গাওয়ালিদের চোখসওয়া সাইকেলবালিকাদের ছবিগুলো ভাসতে ভাসতে আমাদের চোখেও স্বস্তি নামে। সাইকেলের লাইন চলে গেলে পাউডারমাখা এক রমণী আঁচল টেনে পেডেল মেরে আমাদেরকে অতিক্রম করে চলে যান। সেদিকে চোখ রাখতে গিয়ে খানাখন্দকের কবলে পড়তে হলো। অতঃপর গর্ত বাঁচিয়ে তালমাতালে এগিয়ে গিয়ে দ্বিতীয় তুত বনের সবুজনলে ঢুকে যাই। সাইকেল বালিকাদের নীলাভ ছবিগুলো ততক্ষণে মাথার ভেতর এলোমেলো আর রেখাময় হতে হতে এক সময় ঢেউয়ে ঢেউয়ে মিলিয়ে যায়। টানা তুতনলে চোখে ঘোর লাগে। চার দিকের কিছুই দেখা যায় না আর। পথের কিনার ছুঁয়ে ধানিজমি গেরুয়া থেকে বাদামি, সুদূরে গিয়ে ঘন হয়ে আছে ফসলের মচ্ছব।

ঢোলের আওয়াজ পাই। পথ কমে এলে ক্রমেই দমক বাড়ে, দমাদম শব্দে দেখা মেলে মানুষের জটলা। পাথারি ছনকালী প্রাইমারি স্কুল। স্কুল লাগোয়া দুটো ঝাপতোলা দোকান নিয়ে ঝুপড়িবাজার। বিরলের নিরাকমাখা গ্রাম রাজারামপুর। খোলামাঠ, আবাদি জমি মিলে মিশে উৎসব। আদিবাসী নারী-পুরুষেরা দুই লাইনে ঢোল করতল হারমনি নিয়ে গান ধরেছেন-
আটোল পাতে গিলেই হামার লাতি
টেংরা মাছের ঝোল লেলায় রাতি।
রবিন মাড্ডি, স্বপন হেমরম গলায় ঢোল ঝুলিয়ে মাদলের সুরে দমাদম আওয়াজ তুলছেন। বাজনা বুঝে নারীরা পায়ে পায়ে নাচন তোলেন। জনা পঞ্চাশেক আদিবাসীর সাথে পুরো গ্রামবাসী তখন গানে গানে দুলে ওঠে। ভিড় মুখে টুডু মুরমু মহানন্দে হারমনি বাজিয়ে চলেন। নাচুনে মহিলাদের সাঁজগোজ দেখার মতো। পরনে লালশাড়ি, খোপায় গোঁজা টকটকে জবা। পুরুষরাও কম নয়। তাঁদের সার্টও মেয়েদের মতা লাল, মাথায় প্যাঁচানো গামছায় জবা-স্থলে পাখির পালক, কোনাকুনি। গ্রাম্য নারী পুরুষ ঢেউয়ে ঢেউয়ে মহাযোগে হৈ দিয়ে উঠছে। গানবাজনা করতে করতেই তাঁরা ধানক্ষেতের দিকে এগিয়ে গেলে কুন্ড কিস্কু আলাদা উড়াল তোলেন-
কুলি জাগো, আঁখড়া জাগো
জাগো রাজবংশী রাজ হো
চিরিবিটি চিরিবিটি পারবতী লো
কুলি জাগো আঁখড়া জাগো হো।
একসময় ধানকাটা শুরু করেন তাঁরা। দুটো দল, মাথায় মাথাল পরে নেন তারা। ভাগের ভাগ পেয়ে গেলে কাঁচি হাতে স্বদলে মাঠে নামেন এবং গোগ্রাসে ধান কাটতে থাকেন। নারী পুরুষ ভিড় করে মজমা দেখে, গানে গানে ধানকাটা প্রতিযোগিতা।
নবান্নের আনন্দদৃশ্য দেখতে দেখতে মন চলে যায় সাতক্ষীরার পরানদহে। গত পয়লা অগ্রহায়ণে ছিলাম সেখানে। রঙিন একটা দিন ছিল। সকাল থেকেই গ্রামের কিষাণ-কিষাণিরা জড়ো হচ্ছিলেন পূবপাঁথারে। সেখানে ধানক্ষেতে খানিক জায়গা ফাঁকা করে সামিয়ানা খাঁটানো হয়েছে। খুঁটিতে মাইকের চোঙ টাঙিয়ে সামিয়ানার নিচে কাঠের চেয়ার টেবিল পেতে গান চলছে। আখতারুজ্জামান বয়াতি মাউথপিস হাতে নেচে নেচে গাইছেন-
ও বাংলার কিষাণ ভাই
চলো আমরা ধান কাটিতে যাই।
নতুন ধানের চিঁড়া মুড়ি
ভালোবাসে বুড়াবুড়ি।।
নিজের বাঁধানো গানে আখতার সুর তুলে হেলেদুলে গান করেন। তিনিই দলের ওস্তাদ। গানের কলি ধরে তিনি খানিক এগিয়ে নিয়ে যান তারপর লম্বা একটা টান দিয়ে ছেড়ে দেন। সহগায়েনরা তখন সেই কলির দ্যোতনা তুলে কোরাসে গলা মেলান। কোরাসের জনেরা গলামেলানোর পাশাপাশি সামিয়নার তলে টেবিলে রাখা তবলা, হারমনি, বাঁশি একটানা বাঁজিয়ে চলেন। তাদের মুখের কাছে স্ট্যান্ডে করে মাইক্রোফোন লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। হাত দিয়ে তালযন্ত্র বাজানোর পাশাপাশি এরা জায়গামতো একযোগে সুর তোলে। একজন আবার শেষ অন্তরায় নাঁকি সুরে দ্যোতনা দেন। এইসব বাজ-বাজনার মধ্যে রহিমুদ্দি গলায় ঢোল ঝুলিয়ে দমাদম আওয়াজ তোলেন। তারপর নাড়ার মাঠে ঘুরে ঘুরে তালে তাল রেখে পা মেলায়। নৃত্য করে। তাঁর কাণ্ডকীর্তিগুলো দেখার মতো। নাচতে নাচতেই সে দপ করে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে, তারপর বিশেষ ভঙ্গিমা দিয়ে দর্শকদের কুর্নিশ করে তড়াং করে উঠে দাঁড়ায়। পরানদহের কৃষকরা হৈ তুলে কুর্নিশের জবাব দেয়। হৈ শুনে কিষাণ কিষাণিদের গাঁদাগাঁদি থেকে পোলাপানেরা দ্বিগুণ উৎসাহে চিৎকার করে ওঠে। সেসব আমুদে হৈ চিৎকারের উৎসাহ পেয়ে রহিমুদ্দি দ্বিগুণ আহ্লাদে লাফাতে থাকে। যেসব মহিলারা এতক্ষণ দূরের জমির আঁইলে দাঁড়ানো ছিল তারাও এগিয়ে এসে মজমা জমায়। আখতার বয়াতির গান শেষ হয় না। রোদ গাঢ় হতে থাকে। মানুষের আগ্রহ কমে না। বহুদিন পর সহজাত আনন্দবোধে জেগে ওঠে পরানদহের পুরো পাথার। গানের ফাঁকে একদল কৃষক কাঁচি হাতে পাশের জমিতে নেমে ধান কাটতে আরম্ভ করে। গানে গানে তাদের ধান কাটা চলে। তারপর গানের সুরের সাথে গেরুয়া আবাদের মৌ মৌ গন্ধে একাকার হয়ে যায় পরানদহের পাথার...।
পরানদাহ গ্রামটা চ্যাপ্টা ধরনের। গ্রামের মাঝ দিয়ে খাল বয়ে গিয়ে একসময় ইছামতিতে পড়েছে। লোকে একে গ্রামের নাম ধরে ডাকে-পরানদাহ খাল। খালকে অনুসরণ করতে গিয়ে গ্রামটা আর গোলগাল হয়ে থাকেনি বরং খালের দুই পাড়কে ধরতে গিয়ে খানিকটা থ্যাবরা হয়ে গেছে। খালের ওপর সিমেন্টের পাকা ব্রিজ। ব্রিজ পার হলেই খালের বাতা বয়ে উত্তর দক্ষিণে ছিমছাম বাজার। কয়েকটা ঝুপড়ি দোকান, চায়ের স্টল আর মাটিতে পাত পাতানো কাঁচা সবজির দোকান নিয়ে গেঁয়োবাজার। শহুরে বাজারের থেকে তফাৎ হলো- এখানে ভালো কলা এবং মানকঁচু পাওয়া যায়। চায়ের দোকানে ভিড় বেশি। দিনের বেলাতেই স্টলে বিদ্যুৎবাতি জ্বলছে। ওদিকে পুরো রাস্তা ধরে গোধূলির নরম আলোতে বেঁচাকেনা করা মানুষের আনাগোনা। একটা ঝাপতোলা মনোহারী মুদি দোকানের পায়ার সাথে কাঠের পুরণো টেবিলে কাপ পিরিচ রেখে একটা চ্যাংরা মতোন ছোকরা কেরোসিনের স্টোভ বসিয়ে চা বানাচ্ছে। ক্যাশবাক্সের লাগোয়া জলচৌকির উপর সাদাকালো টেলিভিশনে ছবি চলছে। পর পর পাতানো চার পাঁচটা বেঞ্চে বসে কয়েকসারি গ্রাম্যলোক গভীর মনোযোগে দোকানে বাংলাছবি দেখছে। পরানদাহের এপাশটার সাথে পূর্বদিকের অংশকে মেলানো যায় না। শহরের হাওয়া এসে লেগেছে এখানে এবং উন্নতির এক পর্যায়ে এসে গ্রাম-শহরের মাঝামাঝি এটা আধখ্যাঁচড়া জনপদে পরিণত হয়েছে। মনে পড়ে গ্রামটাকে সবিস্তারে দেখা হলে দক্ষিণ দিকে গিয়েছিলাম। কাঁচাপথের কিনার ধরে রেনট্রি গাছের সারি। মাঝে মাঝে ছোট বড়ো খেঁজুরগাছ। ছোট গাছগুলো পাতা ছড়িয়ে পথেই ঝুলে গেছে। কাঁটা বাঁচিয়ে সাবধানে মোটর সাইকেল চালাতে হচ্ছে। ধূ-ধূ পাথারের দিগন্ত জুড়ে গেরুয়া আবাদ সোনার মতো হলুদ হয়ে আছে। এযে হেমন্তের সোনালি রূপ কোথাও কোথাও খাঁজকাটা নিচু জমিতে বক পড়েছে। পাথারের মধ্যেও পুকুর আছে। মকসেদ সরদার পুরনোদিনের কথা তোলেন। তারপর পাশের দাঁড়ানো ছবদেলকে সাক্ষী মেনে বলা শুরু করেন- ‘আগে গ্রামে অনেক ধরনের আনন্দ ছিল। আমরা সাগরভাসা যাত্রা করতাম। ধানকাটা হলে ফের জারি ও জরিনার পালাগান হতো’। সবদেল আরো খানিক যোগ করেন- ‘আগের মতো সেসব মান্যগণ্যও আর নেই। বেশির ভাগ পোলাপানরাই এখন ঝাঁউলি টাইপের। মুরিব্বিদের কোনো মানাগুনা নেই; খালি টিভি ভিসিপি ওগা (ওসব) দেইখ্যা বেড়ায়। তাছাড়া এই যে গ্রাম দেখছেন, এইডা তো এখন আর গ্রাম নেই- গাঁজা হিরো থেকে সবটি নেশাপানি পাবেন এহানে’। বৃদ্ধদের এরকম খোলামেলা মন্তব্য শুনে মনটা ক্রমেই কালো হয়ে যায়। এ কি হচ্ছে গ্রামে! সত্যিই কি আমাদের স্বপ্নময় সহজ গ্রামগুলো বদলে গেছে।
বাংলাদেশের কৃষক সমাজের নিজস্ব একটি সংস্কৃতি আছে। কৃষিযুগের শুরু থেকে কৃষিকর্মের পরতে পরতে মিশে কৃষকদের জীবনাচারে যুক্ত হয়ে আছে এই সংস্কৃতি। প্রথম বীজ বপনের দিন এর উদ্বোধন হয়েছে। কৃষকদের চলন-বলন, জীবনযাপন পদ্ধতি, বেঁচে থাকার সংগ্রাম, আনন্দ-বেদনার প্রকাশনা, কথোপকথন, ভাষা, ভাব বিনিময়, মন মর্জি ইত্যাদি স্বতন্ত্রভাবে তিলে তিলে যোগ হয়ে যুগের পরিক্রমায় তৈরি হয়েছে নতুন এক কৃষিসংস্কৃতি। চাষিদের লোকজ এ সংস্কৃতির সাথে ভদ্রলোকদের সংস্কৃতি কিংবা অন্য কোনো পেশাগত সংস্কৃতিকে এনে মেলানো যায় না।
যে মানুষের কাছে আনন্দ বলতে পালাগান বড়োজোর যাত্রাপালা সেই মানুষ হঠাৎ করেই আকর্ষণীয় এবং হালের ভিডিওর মুখোমুখি হচ্ছে। কিছুদিন পর হয়তো এটি খুব সাধারণ একটি বিষয় হয়ে যাবে গ্রামীণ জীবনে। আধুনিকতার সাথে গ্রামজীবনে যেমন নেমে আসছে নানান অপসংস্কৃতি তেমন গ্রামের মানুষেরা নিজেদের অজান্তেই হারাতে বসেছে লোক ঐতিহ্যের আদি সম্পদগুলো।
ভাবতে ভাবতে ঝাপসা হয়ে আসে পুরনো পরানদাহ। রাজারামপুরে সূর্য ডোবে। উৎসবের তেজ কমে গেলে আদিবাসীর দূরবর্তী হয়। তখন ঢিলে হাওয়ায় ভেসে আসে ঝুমের গান-
ভালাকে মাঁজে বাসাকে পিছে
ভালাকের বাসা নাহি মানায়
রাজা গারিব গৈই না
হায় হায়রে বাসাবাসি
নাহি মানায় হারিয়ে ডোমরে
কার্তিকের সবুজধান মাসান্তে সোনালি, মাঠে মাঠে নুয়ে আছে তাদের প্রাণ। গেরুয়া আবাদ ভিড় করে দাঁড়িয়ে পড়েছে পাথার থেকে পাথারে। এ অঞ্চলের আদিবাসীরা ধানকাটা’র দিনকে নবান্ন বলে না, বলে নবান। আকাশ সংস্কৃতির সুলভ বিনোদনের সুবাদে নবান্নের মতো লোকজ উৎসবও তেমন আর আমল পায় না। শহুরেরা স্টেজ বানিয়ে নগুরে কায়দায় নবান্ন উৎসব করে বটে কিন্তু তাতে প্রাণ থাকে না। অথচ এক যুগ আগেও গাঁওগ্রামে ধানকাটার মৌসুম এলে নবান্নের হিড়িক ছুটে যেত। নতুন ধানের উদ্বোধনে ধুম লাগত লোকজীবনে। আত্মীয়স্বজনের পারস্পরিক নিমন্ত্রণে কদর পেত পিঠা, পায়েস, চিঁড়া, মুড়ি। গাঁয়ের ছেলেমেয়েরা সদ্য ধানকাটা জমিতে চড়–ঁইভাতি করত। দৃশ্যগুলো দ্রুত বদলে গেল। কালের হাওয়ায় গ্রামজীবনেও এখন পাল্টা স্রোত বইতে শুরু করেছে। অজপাড়াগাঁতে পিঠাপুলির স্বাদ যেন ক্রমেই পানসে হয়ে আসছে। এখন শরবতের পরিবর্তে কোকাকোলা দেয়া হয়। চা, বিস্কুট ও চানাচুরের সাথে কোনো কোনো বাড়িতে সম্ভব হলে ফাস্টফুডের ব্যবস্থা হয়ে থাকে। পরিবর্তনের শেষপাতে এসে একমাত্র আদিবাসীরাই জিইয়ে রেখেছে নবান্নের উৎসব। নবান্ন তাদের জীবনে এখনো আনন্দের এক অনবদ্য আয়োজন।
ফেরার পথে কয়েকটা টেলিভিশনওয়ালা দোকান দেখি। কিন্তু সেসবে আর মন লাগে না। শহরের রাস্তা পেতে পেতে এখনো ছয় কিলোমিটার। কুয়াশার সাথে জোছনা নেমেছে। পাথারের ভেতর খাঁজকাটা পুকুরেও আলো পড়েছে। বিলের কিনার ধরে যাওয়ার সময় শেষবার রাজারামপুরের পাথার আমাকে স্পর্শ করে নেয়। সুদূরে চেয়ে মনে মনে বলি, আমরা তো গ্রামে ফেরার জন্যই অপেক্ষা করি।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.