কাবা শরিফের জুমার খুতবা

দৃঢ়তার ফলে দ্বীনের বিজয় এসেছে

ড. ফয়সাল বিন জামীল আল-গায্্যাবী


সকল প্রশংসা আল্লাহর। আমরা প্রশংসা করি আল্লাহর। সাহায্য চাই তাঁর কাছে। ক্ষমা চাই তাঁর কাছে। আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই সকল অনিষ্ট থেকে এবং সকল ধরনের মন্দ কাজ থেকে।
উত্তম অনুকরণীয় আদর্শ মুসলিম জীবনে একটি অতি প্রয়োজনীয় বিষয়। একজন মুসলিম তার জীবনে সেটি অনুসরণ করে, সেটিকে তার ঈমান ও আমলের জন্য মাইলফলক হিসেবে গ্রহণ করে। অনুকরণীয় মডেল তথা আদর্শ তার আত্মশুদ্ধিতে প্রেরণা জোগায়। তাকে উন্নতির উঁচু স্তরে ওঠার জন্য উৎসাহ দেয়।
ইসলামি উম্মাহর জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বড় ধরনের অনুগ্রহ হলোÑ তিনি তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ও সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাদের জন্য সর্বোত্তম অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় আদর্শ হিসেবে মনোনীত করেছেন, যেন তারা দীনকে মানা, ইসলামি মূল্যবোধের অনুশীলন ও উন্নত নৈতিকতার চর্চায় তাঁকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে।
এ দিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ আল্লাহর রাসূলের মধ্যে, তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহকে ও পরকাল দিবসের সফলতা চায় এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করে।’
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে উত্তম আদর্শের বিভিন্ন দিক রয়েছে। তাঁর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলোÑ দীনের ওপর তাঁর অটল ও অবিচল থাকা। আল্লাহ তাঁকে দীনের ওপর দৃঢ়তার সাথে অটল রেখেছেন। তাঁকে তিনি নিজ সাহায্যের মাধ্যমে অবিচলতা দিয়েছেন, সকল অবস্থায় তাঁকে সাহায্য করেছেন। জীবনের সকল ক্ষেত্রে ইসলামকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরার ক্ষেত্রে তিনি আমরণ অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন।
হে মুসলিম সমাজ! তাঁর বাস্তব জীবনে নানা আঙ্গিকে দৃঢ়তা ও অবিচলতার দৃষ্টান্ত রয়েছে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি বিষয় হলোÑ তাঁর ওপর নাজিলকৃত ওয়াহ্্ইকে তিনি আঁকড়ে ধরেছিলেন, যেমনটি আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমার ওপর যে ওয়াহ্্ই প্রেরণ করা হয়েছে, তা আঁকড়ে ধর, নিশ্চয়ই তুমি সীরাতে মুসতাকীম তথা সরল ও দৃঢ় পথের ওপর আছো।’
আল্লাহর ঘোষণা, ‘নিশ্চয়ই তুমি সরল ও দৃঢ় পথের ওপর আছো’Ñ এর মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রশংসা করে বলেছেন যে, তিনি এ পথের ওপর এতটা দৃঢ় যে, আল্লাহ তাঁকে যে আদর্শ ও দর্শন দিয়ে পাঠিয়েছেন, তা থেকে তিনি এক ইঞ্চিও বিচ্যুত হননি। আল্লাহর দেখানো পথÑ কুরআন ও কুরআনের বিধান থেকে দূরে সরানোর মুশরিকদের সকল চেষ্টা সত্ত্বেও তিনি তাঁর রবের হেদায়াতকে আঁকড়ে ধরেছিলেন।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ‘আমি তোমার প্রতি যে ওয়াহ্্ই প্রেরণ করেছি, তারা তা থেকে পদস্খলন ঘটানোর চেষ্টা করেছিল, যাতে তুমি আমার সম্পর্কে তার বিপরীতে মিথ্যা রচনা করো। এমনটি করলে তারা তোমাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবে। আমি তোমাকে অবিচল না রাখলে তুমি তাদের দিকে কিছুটা হলেও ঝুঁকে পড়তে।’ (বনু ইসরাঈল : ৭৩-৭৪)
হে আল্লাহর বান্দাগণ! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দৃঢ়তার আরেকটি দিক হলোÑ তাঁর রবের ইবাদাতে অবিচলতা। আল্লাহর উদ্দেশ্যে আমলের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা। আল্লাহর আনুগত্যে ও ইবাদাতে তিনি অতিশয় ধৈর্যশীল ছিলেন। উত্তম কর্মের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে তিনি খুবই সচেষ্ট থাকতেন।
আ’য়িশা রাদিআল্লাহ আনহা থেকে বর্ণিত। রাসূল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে এত দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করতেন যে, তাঁর পা যেন ফেটে যেত। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এমনটি করছেন কেন? আল্লাহ তো আপনার আগের ও পরের গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। তিনি বললেন, ‘আমি কি আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হতে পছন্দ করবো না!’ (সহীহুল বুখারি, সহীহ মুসলিম)
চিন্তা করে দেখুন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতেন, আল্লাহ তাঁর গুনাহ ও অপরাধ ক্ষমা করে দিয়েছেন, তারপরও তিনি কত কষ্ট করে ইবাদাত করতেন।
শুধু তাই না, সময়মতো কোনো কাজ করতে না পারলে পরে তা সম্পন্ন করতেন। সহীহ মুসলিমে আ’য়িশা (রা:) থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনই কোনো আমল করতেন, তা দৃঢ়তার সাথে করতেন। তিনি নিদ্রা অথবা অসুস্থতার কারণে রাতে সালাত আদায় করতে না পারলে দিনে বার রাকাত সালাত আদায় করতেন।
উম্মু সালামা (রা:) থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসরের পর দু’রাকাত সালাত পড়লেন, আমি তাঁকে এ দু’রাকাত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, আবদুল কাইস গোত্রের কিছু লোক তাঁর কাছে এসেছিল, তিনি তাদের সাথে ব্যস্ত সময় কাটানোর কারণে জহুরের পরের দু’রাকাত সালাত পড়তে পারেননি। এ দু’রাকাত হলো সেই সালাত।’ (সহীহুল বুখারি ও সহীহ মুসলিম)
উপরের আলোচনা থেকে এ কথা বলার সুযোগ নেই যে, কেউ কোনো বিষয়ে অতিরিক্ত সাওয়াবের আশায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হেদায়াত বহির্ভূত কোনো কাজ করতে পারবে। এমনটি করলে তা হবে সুন্নাহ পরিপন্থী। সহীহ বুখারি ও সহীহ মুসলিমে আনাস (রা:)-এর সূত্রে একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, তিন ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আমলকে কম মনে করে নিজেরা একটি কর্মপরিকল্পনা করেছিল। একজন সিদ্ধান্ত নিলোÑ সারারাত জেগে সালাত আদায় করবে, দ্বিতীয় জন সিদ্ধান্ত নিলো বছরজুড়ে সিয়াম তথা রোজা রাখবে। অপরজন সিদ্ধান্ত নিলো সে বিবাহ করবে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাথে সাথে তাদের চিন্তার সংশোধন করে বললেন, ‘আল্লাহর শপথ! আমি তোমাদের মধ্যে আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভয় করি। আমি রাতে ঘুমাই, সালাতও আদায় করি। রোজা রাখি, আবার রাখিও না। আমি বিবাহ করেছি, এটিই আমার আদর্শ ও কর্মনীতি। যে আমার এ আদর্শ থেকে বিচ্যুত হবে সে আমার উম্মত নয়।’
হে মুসলিম! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দৃঢ়তার আরেকটি দিক ছিলÑ নৈতিকতা ও মূল্যবোধে দৃঢ়তা। উন্নত চরিত্র ও নৈতিকতার সকল বিষয়ে তাঁর অবস্থান ছিল শীর্ষে। তাঁর মধ্যে ছিল ভারসাম্যÑ অবস্থার পরিবর্তনে তাঁর অবস্থানের পরিবর্তন হতো না। সকল অবস্থায় তাঁর অবস্থান ছিল এক। বিপদে তিনি ছিলেন ধৈর্যশীল। ভালো অবস্থায় ছিলেন কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী। বিপদ সঙ্কটের আগে তিনি যেমন ছিলেন, বিপদ-সঙ্কটকালীন সময়েও তিনি তেমনি ছিলেন। তাঁর মধ্যে থাকত না কোনো অস্থিরতা ও দুঃখবোধ। সন্তুষ্টি ও ক্রোধ, কোনোটিই তাঁর মধ্যে পরিবর্তন আনত না। রাগ ও ক্রোধে তিনি কারো প্রতি জুল্মু-অবিচার করতেন না। মন্দ আচরণ করতেন না।
নিজের কারণে তিনি কারো সাথে রাগ করতেন না। প্রতিশোধ নিতেন না। তবে আল্লাহর মর্যাদা ও সম্মান লঙ্ঘিত হলে তিনি রাগ করতেন।
কী যুদ্ধ, কী স্বাভাবিক পরিস্থিতিÑ সকল অবস্থায়ই তাঁর অবস্থান ছিল অভিন্ন। তিনি কখনো অবিশ্বস্ততার আশ্রয় নেননি। চুক্তি ও প্রতিশ্রুতিবিরোধী কাজ করেননি। মৃত লাশের অমর্যাদা করেননি। শিশু, নারী, বয়োবৃদ্ধদের হত্যার আদেশ দেননি। তিনি দয়া ও অনুগ্রহ করতেন, তবে এটি তাঁর দুর্বলতা ছিল না। তিনি বিনয়ী ছিলেন, তবে আত্মমর্যাদা বিলীন করতেন না।
হে মুসলিম সমাজ! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর দিকে দাওয়াতের ক্ষেত্রেও ছিলেন অটল ও অবিচল। মক্কায় অবস্থানকালে তিনি লোকদের ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর’ দিকে ডেকেছেন। ডেকেছেন ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই’-এর ভিত্তিতে এককভাবে আল্লাহর গোলামি দাসত্বের দিকে। গোপনে ও প্রকাশ্যে এবং দিনে ও রাতে, মানুষকে সতর্ক করেছেন র্শ্কি থেকে।
মুশরিকরা তাঁর চাচা আবু তালিবের মাধ্যমে বলেছিল, তাঁকে এ কাজ থেকে বিরত থাকতে। তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেছিলেন, ‘আমার হাতে জ্বলন্ত অঙ্গার রাখা হলেও আমি এ কাজ ছাড়ব না।’
তিনি মুশরিকদের নানা ধরনের অত্যাচার সহ্য করেছেন। তাদের পক্ষ থেকে ক্ষমতা, সম্পদ ও পদ-পদবির প্রস্তাব দৃঢ়তার সাথে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তারা তাঁকে উপহাস করেছে, জাদুকর বলেছে, প্রহার করে অজ্ঞান করেছে। গলায় চাদর পেঁচিয়ে শ্বাসরুদ্ধ করেছে, সিজদারত অবস্থায় উটের নাড়িভুঁড়ি পিঠে রেখেছেÑ তিনি এতসব সহ্য করেছেন; কিন্তু নিজের অবস্থান থেকে একটুও সরেননি।
তিনি দৃঢ়তার সাথে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দিয়েছেন। সত্য ও ন্যায়ের আদেশ করেছেন। অসত্য ও অন্যায় থেকে নিষেধ করেছেন, তাঁর এ দৃঢ়তার ফলস্বরূপ দ্বীনের বিজয় সাধিত হয়েছে। দলে দলে লোক ইসলামে প্রবেশ করেছে। নিজ রবের পক্ষ থেকে অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে মৃত্যুবরণ করেছেন।
প্রত্যেক মুসলিমকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শিক্ষা নিতে হবে আকিদাহর ওপর দৃঢ়ভাবে টিকে থাকার, ইসলামি মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটানোর, বাস্তব জীবনে ইসলামকে আঁকড়ে ধরার, পরীক্ষা ও বিপদ সঙ্কটে দুর্বলতার পরিচয় না দেয়ার, দীন ও দীনের দাওয়াতবিরোধী যেকোনো কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে সতর্ক থাকার জন্য।
প্রিয় ভাইগণ! বিপর্যয়, বিপদ ও সঙ্কটে দৃঢ় থাকা হোদায়াতপ্রাপ্ত আল্লাহর বান্দাগণের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এটি তার ঈমানের বলিষ্ঠতার পরিচয় বহন করে। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাসের প্রমাণ পেশ করে।
হে আল্লাহর বান্দাগণ! আপনাদের দীনের ওপর দৃঢ়ভাবে অবস্থান করুন। আপনাদের রবের শরিয়াহকে আঁকড়ে ধরুন। এর মাধ্যমে কল্যাণ ও সফলতা অর্জন করবেন।
এমনটি করলে আল্লাহ তাকে মৃত্যুর সময়ও দীনের ওপর অবিচল রাখবেন। কবরে তাকে অটল ও অবিচল থাকার তাওফিক দেবেন।

অনুবাদ : আ ন ম রশিদ আহমদ
আদদাওয়া টিভির সৌজন্যে

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.