আইআইসিইউ মসজিদ, কুমিরা, চট্টগ্রাম
আইআইসিইউ মসজিদ, কুমিরা, চট্টগ্রাম
হালাল-হারাম প্রসঙ্গ

যা অবৈধ নয় তাই বৈধ

আল্লামা ইউসুফ আল-কারযাভী

শরিয়াতের বিধান প্রণয়নে ইসলামের সর্বপ্রথম মৌলনীতি হচ্ছে আল্লাহ্তা’আলা মানুষের জন্য যত জিনিসই সৃষ্টি করেছেন, তা সবই হালাল ও মুবাহ্। শরিয়াতের বিধান রচয়িতার অকাট্য, সুস্পষ্ট ও প্রমাণিত ঘোষণায় যদি কোনোটিকে ‘হারাম’ বলে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে তবে কেবল সেটিই হারাম। কিন্তু কোনো বিষয়ে যদি অকাট্য কোনো ঘোষণা প্রমাণিত না হয় কিংবা কোনো দলিল থেকে যদি অকাট্য কোনো ঘোষণা প্রমাণিত না হয় কিংবা কোনো দলিল থেকে যদি সুস্পষ্টভাবে কোনো জিনিসের হারাম হওয়ার কথা নিঃসন্দেহে জানা না যায়, তাহলে তার মৌল অবস্থা-মুবাহ্হওয়ার অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকবে। তাকে হারাম বলা যাবে না। কোনো যয়িফ হাদিস এেেত্র দলিল হিসেবে গ্রহণীয় হতে পারে না।
আল্লাহ্ সৃষ্ট সব জিনিসই যে মূলগতভাবে হালাল তা কোনো মনগড়া কথা নয়। তা কুরআন মজিদের বহু কয়টি আয়াতে সুস্পষ্ট ঘোষণা থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত। এ পর্যায়ের কয়েকটি আয়াত এখানে উদ্ধৃত করা যাচ্ছে :
‘সেই মহান আল্লাহ্ তোমাদের (ভোগ-ব্যবহারের) জন্য সৃষ্টি করেছেন সে সব কিছুই যা আছে এ পৃথিবীতে।’ (সূরা বাকারা : ২৯)
‘নভোমণ্ডল ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, তার সব কিছুই আল্লাহ্ তোমাদের জন্য কর্মে নিরত করে রেখেছেন।’ (সূরা জাছিয়াহ : ১৩)
‘তুমি কি ল্য করনি, নভোমণ্ডলে ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা সবই আল্লাহ্তা’আলা মানুষের কল্যাণের জন্য নিয়োজিত করে রেখেছেন এবং তোমাদের প্রতি বাহ্যিক ও গোপনীয়- দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান নিয়ামতসমূহ উদারভাবে ঢেলে দিয়েছেন?’ (সূরা লোকমান : ২০)
এসব ঘোষণা থেকে সুস্পষ্ট ও অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়, আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীস্থ সব কিছুই আল্লাহ্তা’আলা মানুষের জন্য মানুষের কল্যাণের ও রোগ-ব্যবহারের জন্যই সৃষ্টি করেছেন, কর্মে নিবদ্ধ করে রেখেছেন। এ কথা বলে আল্লাহ ্মানুষের প্রতি তাঁর অপরিসীম অনুগ্রহের কথাই জানিয়ে দিয়েছেন। তাহলে বিশ্বলোকের সব কিছুই মানুষের জন্য অবশ্যই হালাল হবে। তার কোনো একটির ভোগ-ব্যবহার মানুষের নিষিদ্ধ হতে পারে না, সব কিছুর পইে আল্লাহ ্অনুমতি নিরাজিত। এ সবই তো আল্লাহর দেয়া নিয়ামত। তা যদি নিষিদ্ধই হবে, তাহলে তা সব মানুষের জন্য সৃষ্টি করার কথা বলার কী তাৎপর্য থাকতে পারে?
তবে আল্লাহ নিজেই যদি সৃষ্ট সব কিছুর মধ্য থেকে কিছু কিছু জিনিস হারাম করে দিয়ে থাকেন, তাহলে সে কথা স্বতন্ত্র। এরূপ কোনো কোনো জিনিস বিশেষ কারণে ও বিশেষ কল্যাণ-উদ্দেশ্যে হারাম করে দিয়ে থাকলে তা অবশ্যই মানতে হবে। তা সাধারণভাবে হালাল করে দেয়ার েেত্র ব্যতিক্রম মাত্র এবং সে ব্যতিক্রমের মূলে নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে বলে মনে করতে হবে।
এ পরিপ্রেেিত বলা যায়, ইসলামি শরিয়াতে হারামের পরিধি খুব বেশি সঙ্কীর্ণ। হালালের ত্রে বিপুলভাবে বিস্তীর্ণ ও প্রশস্ত। কেননা সুস্পষ্ট অকাট্য ভাষায় হারাম ঘোষণাকারী আয়াত খুবই অল্প এবং তা কয়েকটি মাত্র। ইতিবাচকভাবে যেসব বিষয়ে নতুন করে কিছু বলা হয়নিÑ না হালাল, না হারাম, তা তো সে মৌলনীতির ভিত্তিতেই বিবেচিত হবে। আল্লাহ্র মার সীমার মধ্যে গণ্য হবে।
এই পর্যায়ে রাসূলে কারিম সা:-এর ঘোষণাও উল্লেখ্য। তিনি ইরশাদ করেছেন :
‘আল্লাহ তাঁর কিতাবে যা হালাল করেছেন তা হালাল, যা হারাম করেছেন তা হারাম। আর যে বিষয়ে তিনি নীরবতা অবলম্বন করেছেন, তাতে মা রয়েছে। অতএব, তোমরা আল্লাহ্র কাছ থেকে তাঁর মা গ্রহণ কর। কেননা আল্লাহ্ তো কোনো কিছু ভুলে যান না (ভুলবশত বলেননি এমন তো হতে পারে না)। এ কথার প্রমাণ হিসেবে তিনি পাঠ করলেন : ‘তোমাদের প্রভু ভুলে যান না’। (কুরআনের একটি আয়াতের অংশ)।
নবী কারিম সা: বলেছেন :
‘আল্লাহতা’আলা কতগুলো কাজকে ফরজ করে দিয়েছেন। অতএব তোমরা তা নষ্ট করে ফেল না। তিনি কতগুলো সীমা নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, তোমরা সে সীমা লঙ্ঘন করো না। কিছু কিছু জিনিসকে তিনি হারাম করেছেন, তোমরা তার বিরোধিতা করো না। আর তোমাদের প্রতি অনুগ্রহবশত না ভুলে গিয়ে অনেক বিষয়ে তিনি পূর্ণ নীরবতা অবলম্বন করেছেন। অতএব, সে বিষয়ে তোমরা বিতর্কে লিপ্ত হয়ো না।’ (তিরমিযি, ইবনে মাযাহ)
এ পর্যায়ে আমি একটি বিষয়ে সতর্কবাণী উচ্চারণ করতে চাই। ‘মৌলিকভাবে সব কিছুই মুবাহ্’ কথাটি কতগুলো দ্রব্যসামগ্রীর ব্যাপারেই প্রযোজ্য নয়। যাবতীয় কাজকর্ম, হস্তপে, পদপে গ্রহণ ইত্যাদিÑ যা ইবাদতের ব্যাপারসমূহে গণ্য নয় সে েেত্রও এ মৌলনীতিটি প্রযোজ্য। এগুলো আমরা বলি আদত-অভ্যাস, পারস্পরিক কার্যাদি। এসবের মূল কথা হলো, আসলে তা সবই অ-হারাম- শর্তহীনভাবেই তা হালাল। তবে শরিয়াতদাতা যদি কোনো কাজকে হারাম ঘোষণা করে থাকেন এবং কোনো বিষয়ে কোনো শর্ত আরোপ করে থাকেন, তবে তা অবশ্যই হারাম হবে এবং সে শর্তকে অবশ্যই মানতে হবে। এ পর্যায়ে আল্লাহ্ ঘোষণা হচ্ছে :
‘তোমাদের প্রতি যা যা হারাম করা হয়েছে, তার সব কিছুই সুস্পষ্ট করে তিনি তোমাদের বলে দিয়েছেন।’
এ ঘোষণা দ্রব্যাদি ও কার্যাদি উভয় ব্যাপারেই প্রযোজ্য। কিন্তু ইবাদতের ব্যাপার এ থেকে স্বতন্ত্র ও ভিন্নতর। কেননা তা-ই হচ্ছে আসল দ্বীন। দ্বীনের মৌল ব্যাপার আর তা কেবলমাত্র ওহির সূত্রেই লাভ করা যেতে পারে। ওহির মাধ্যমে যা ইবাদত বলে জানা যায়নি, তা কখনই এবং কোনোক্রমেই ইবাদতের মধ্যে গণ্য হতে পারে না। এ সম্পর্কে রাসূলে কারিম সা:-এর ঘোষণা হচ্ছে :
‘আমাদের এ দ্বীনের মধ্যে শামিল নয় এমন কোনো জিনিস যদি কেউ দ্বীনের মধ্যে নতুন করে উদ্ভাবন করে তবে তা অবশ্যই প্রত্যাখ্যাত হবে।’ (বুখারি, মুসলিম)
কেননা প্রকৃত দ্বীন দুটো কাজের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়। একটি হচ্ছে এই যে, বন্দেগি করা হবে কেবলমাত্র এক আল্লাহ্রÑ এক আল্লাহ্ ছাড়া আর কারো বন্দেগি করা হবে না। এবং দ্বিতীয়টি এই যে, কেবলমাত্র আল্লাহ্ বন্দেগি করা হবে কেবলমাত্র আল্লাহ্ দেয়া বিধান অনুযায়ী, অন্য কোনোভাবে নয়। কাজেই কেউ যদি নিজের প থেকে ইবাদতের কোনো পন্থা বা অনুষ্ঠান উদ্ভাবন করেÑ সে যে-ই হোক না কেন তা গুমরাহী ছাড়া আর কিছুই নয়।
তবে সাধারণ অভ্যাস-আদত কিংবা পারস্পরিক লেনদেন সম্পর্ক বিনিময় প্রভৃতি পন্থা ও পদ্ধতির উদ্ভাবক মানুষ নিজে, শরিয়তদাতা নন। শরিয়াতদাতা এ পর্যায়ে শুধু বলে দেবেন কোন পন্থাÑ পদ্ধতি বা নিয়ম ঠিকÑ যথার্থ এবং কোন্টি যথার্থ নয়। যে ধরনের কাজ বিপর্যয় ও তিমুক্ত সেগুলোকে তিনি বহাল রাখারই পপাতী।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেছেন : বান্দাদের কথাবার্তা ও কাজকর্মসংক্রান্ত তৎপরতা দুই ধরনের। কতগুলো আছে ইবাদত, যদ্দারা লোকদের দ্বীনি অবস্থার সংশোধন সাধিত হয়। আর কতগুলো আছে আদত-অভ্যাস, দুনিয়ায় বসবাস করার জন্য তা মানুষের জীবনে জরুরি। এ পর্যায়ে শরিয়তের দৃষ্টিকোণ হলো আল্লাহ যেসব ইবাদত ফরজ করে দিয়েছেন কিংবা যা তিনি পছন্দ করেন, তা শরিয়তের বিধান ব্যতীত অন্য কোনোভাবে প্রমাণিত হতে পারে না।
মানুষের সাধারণ আদত-অভ্যাসের ব্যাপারটি ভিন্নতর। আসলে তা সবই মুবাহ-দোষমুক্ত, অনির্দিষ্ট। তার মধ্য থেকে যে যেটিকে আল্লাহ হারাম ঘোষণা করেছেন, কেবল সে সেটিই হারাম হবে, অন্য কিছু নয়। এ কথাকে সত্য না মানলে আমাদের প্রতি এ আয়াতটি প্রযোজ্য হবে।
‘আল্লাহ্ তোমাদের জন্য যে রিজিক নাযিল করেছেন, তন্মধ্য থেকে কিছু তোমরা হারাম বানিয়েছ আর কিছু হালাল?’ এটা কি রকম কাজ তা কি তোমরা ভেবে দেখেছ?’ (সূরা ইউনুস : ৫৯)
এ হচ্ছে অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও অধিক কল্যাণবহ মৌলনীতি বিশেষ। এ মৌলনীতির ভিত্তিতে আমরা বলব, ক্রয়-বিক্রয়, হেবা, ইজারা ইত্যাদি মানুষের সামাজিক জীবনের আদত-অভ্যাস বা প্রচলনের ব্যাপার। এ দুনিয়ায় জীবনযাপনের জন্য এগুলো মানুষকে মেনে চলতে হয়Ñ যেমন পানাহার ও পোশাক পরিধান মানুষের অপরিহার্য হয়ে থাকে। এসব েেত্র শরিয়ত উত্তম ও সুষ্ঠু নিয়মাদি শিা দিয়েছে। তাই যে যে েেত্র কোনোরূপ বিপর্যয় পরিলতি হয়েছে শরিয়ত তা নিষিদ্ধ করে দিয়েছে এবং যা একান্তই জরুরি তা অপরিহার্য কর্তব্য বলে ঘোষণা করেছে। অতঃপর যা যা অবাঞ্ছনীয় দেখা গেছে, সে সবকে ‘মাকরূহ’ বলেছে আর যে যে কাজে সার্বিক কল্যাণ ল্য করা গেছে, সেগুলোকে বলেছেন মুস্তাহাব। ফলে এেেত্রর কাজগুলোকে আমূল উৎপাটিত করার বা নতুন করে ঢালাই করার প্রয়োজন হয়নি।
এ সত্য প্রতিভাত হওয়ার পর বলা যায়, লোকেরা নিজেদের ইচ্ছেমতো লেনদেন, ব্যবসায় বাণিজ্য ও মজুরি বিনিময়ে কাজ করার জন্য সম্পূর্ণ স্বাধীন, যতণ না শরিয়ত তার কোনো কাজকের হারাম বলে ঘোষণা করছে। লোকদের পানাহারের ব্যাপারটির দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে। এ েেত্র যা যা হারাম, তা পরিহার করে চললেই হলো। এ ছাড়া এ েেত্র আর কোনো বিধিনিষেধের নিয়ন্ত্রণ মেনে চলতে বাধ্য করা হয়নি। ফলে তা সবই মৌলিকভাবে মুবাহ-অনিষিদ্ধ।
এ মৌলনীতির ভিত্তিতে ইবনে তাইমিয়ার ছাত্র ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম এবং হাম্বলি মাযহাবের সব ফিকাহবিদই বলেছেন :
‘চুক্তি ও শর্তাদি মূলত সবই মুবাহ। যে চুক্তি সম্পর্কে শরিয়ত কোনো আপত্তি করেনি এবং যা হারাম ঘোষিত হয়নি, তা সবই হালাল।’
সহিহ্ হাদিস থেকেও এ মৌলনীতির সমর্থন পাওয়া যায়। হজরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ্ বলেছেন :
‘আমরা আযল করছিলাম, তখন কুরআন নাযিল হচ্ছিল। নিষেধ করার মতো কিছু থাকলে কুরআন তা অবশ্যই নিষেধ করে দিত।১
এ থেকে শুধু এতটুকুই প্রমাণ করতে চাচ্ছি যে, যে বিষয়ে ওহিসূত্রে কোনো নিষেধ আসেনি তা অনিষিদ্ধ, তা হারাম নয়। নিষেধকারী কোনো ঘোষণা নাযিল না হওয়া পর্যন্ত তা সম্পূর্ণ জায়েয। শরিয়ত সম্পর্কে এ ছিল সাহাবিদের বিশ্বাস এবং তাঁরা যে শরিয়তের মূলতত্ত্ব যথার্থ বুঝতে পেরেছিলেন, তা এ কথা থেকেই অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়।
মোটকথা এসব দৃষ্টান্ত ও দলিল থেকে এ কথাই প্রমাণিত হয় যে, সে ইবাদত ও সে নিয়মের ইবাদতই শরিয়তসম্মত, যা স্বয়ং আল্লাহ তা’আলা বিধিবদ্ধ করে দিয়েছেন। আর মানুষের আদত-অভ্যাসের মধ্য থেকে হারাম শুধু তা-ই যা স্বয়ং আল্লাহ তা’আলা হারাম ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ্যা হারাম করেননি, তা কখনই হারাম হতে পারে না।

অনুবাদ : মোহাম্মদ আবদুর রহিম

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.