গাইড বই কি কিনতেই হবে?
গাইড বই কি কিনতেই হবে?

গাইড বই কি কিনতেই হবে?

আলী রেজা

আমাদের সময় আমরা ওপরের ক্লাসের বড় ভাইদের পুরনো বই বিশেষ কমিশনে কিনে মোটা সুতায় গেঁথে কভার লাগিয়ে নিজের নাম লিখে নিজের করে নিতাম। সেকেন্ড হ্যান্ড বই পড়ে পাস করত আমাদের সময় ৯০ থেকে ৯৫ ভাগ শিক্ষার্থী। অনেকে একসাথে সব বই কিনতেও পারত না। 

সময় বদলে গেছে। বছরের প্রথম দিন আমাদের সন্তানেরা পেয়ে যাচ্ছে বিনামূল্যে নতুন বই। বড় অঙ্কের টাকা ব্যয় করে সরকার জনগণের জন্য এ প্রধান শিক্ষা উপকরণটি দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের লক্ষ্য হলোÑ বিপুলসংখ্যক প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সন্তানদের শিক্ষাব্যয় কমানো। সন্তানদের শিক্ষার প্রধান উপকরণ পাঠ্যবই কিনতে অভিভাবকদের যাতে কোনো চিন্তা করতে না হয় এবং শিক্ষার্থীরাও যাতে নতুন বই পেয়ে আনন্দের সাথে লেখাপড়া শুরু করতে পারে, সেই মহৎ উদ্দেশ্যকে সামনে নিয়েই সরকারের এই বিনামূল্যে বই বিতরণ কর্মসূচি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সরকারের এই মহৎ উদ্দেশ্য বাস্তবে কতটা সফল হচ্ছে? সরকারের দেয়া বিনামূল্যের বই শিক্ষার্থীরা কতটা পড়ছে বা কতটা পড়তে পারছে?

বিনামূল্যে বই বিতরণের পরদিন থেকেই বাজারে চলে আসে উচ্চমূল্যের গাইড বই। সুতরাং গাইড বই প্রকাশ নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে সরকারের নেয়া পদক্ষেপ খুব একটা কঠোর মনে হয় না। এ দিকে শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষকদের ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে আছেন।

গাইড বই পড়ালে জেলে যাওয়ার হুমকি দিচ্ছেন। গাইড বইয়ের প্রকাশক বিক্রয় প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে দিচ্ছে নিম্নমানের এবং ভুলে ভরা গাইড বই। এক দিকে শিক্ষার্থীদের গাইড বই-বিমুখ করার জন্য সচেতনতামূলক বক্তৃতা-বিবৃতি দিচ্ছেন শিক্ষাসংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থরা। অন্য দিকে বছরের শুরু থেকেই প্রকাশকেরা তাদের প্রকাশিত গাইড বইয়ের প্রচার চালাচ্ছেন দেশজুড়ে। শিক্ষকদের কাছে ধরনা দিচ্ছেন হাজার হাজার বিক্রয় প্রতিনিধির মাধ্যমে। বিভিন্ন উপহার, উপঢৌকন এমনকি নগদ টাকা প্রদান করে শিক্ষকদের প্ররোচিত করছেন তাদের প্রকাশিত গাইড বই পড়ানোর জন্য। জেলা-উপজেলা পর্যায়ের শিক্ষক সমিতিকে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে এসব প্রকাশক নিজেদের প্রকাশিত গাইড বই পাঠ্যতালিকার অন্তর্ভুক্ত করান।

শিক্ষক সমিতিগুলো আভ্যন্তরীণ পরীক্ষার সিলেবাস এবং প্রশ্ন প্রণয়ন করেন এসব গাইড বইয়ের আলোকে। নিরুপায় অভিভাবকেরা মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে এসব গাইড বই কিনতে বাধ্য হন। ফলে হাজার কোটি টাকা খরচ করে কোটি কোটি বই বিনামূল্যে বিতরণ করা সত্ত্বেও অভিভাবকদের কিনতে হচ্ছে উচ্চমূল্যের গাইড বই। পুস্তক ব্যবসায়ী সমিতি এসব গাইড বইয়ের এতই উচ্চমূল্য নির্ধারণ করে যে, শিক্ষক সমিতিকে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়েও এবং দেশব্যাপী বেতনভুক্ত বিক্রয় প্রতিনিধি নিয়োগ দিয়েও একজন প্রকাশক বিপুল অঙ্কের মুনাফা করে থাকেন।

প্রকাশক থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ী এবং অসাধু শিক্ষকদের অনৈতিক মুনাফার জোগান দিতে হয় অসহায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের। সৃজনশীল পদ্ধতিতে যদি শিক্ষার্থীরা গাইডনির্ভর হয়ে পড়ে, তবে সৃজনশীল পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়ে যায়।

টেক্সট বইয়ের আলোকে অংশগ্রহণমূলক শিক্ষাদান পদ্ধতির পরিবর্তে সরাসরি গাইড বই অনুসরণ বা অনুকরণ করার একটি অসৃজনশীল পথে শিক্ষা প্রদান করছেন শিক্ষকেরা ও শিক্ষা গ্রহণ করছে শিক্ষার্থীরা। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রথমেই গাইড বই নিষিদ্ধ করা উচিত বলে মনে করি। মূল বইয়ের সাথে সহায়ক বই পাঠ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমতি নেয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সহায়ক গ্রন্থটিও জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত হতে হবে। অননুমোদিত বই প্রকাশের জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। গাইড বইয়ের প্রকাশ বন্ধ করতে পারলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী কেউ গাইড বই অনুসরণ করার সুযোগ পাবে না।

আইন অমান্য করে গাইড বই যারা প্রকাশ করবে তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনতে পারলে শিক্ষক সমিতি ও খুচরা পুস্তক ব্যবসায়ীরা আর গাইড বিপণনের সুযোগ পাবে না। তখন শিক্ষকেরাও গাইড বই কিনতে শিক্ষার্থীদের প্ররোচিত করবেন না। তাই গাইড বই পড়ানোর দায়ে শিক্ষকদের শাস্তির আওতায় আনার চেয়ে গাইড বইয়ের প্রকাশককে শাস্তির আওতায় আনলে বেশি সুফল পাওয়া যাবে বলে বিশ্বাস করি। গাছের গোড়া কেটে ফেলতে পারলে ডালপালা এমনিতেই মরে যাবে। তখন সরকারের জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি হিসেবে প্রতি বছর বিতরণকৃত কোটি কোটি পাঠ্যপুস্তকের সুফল ভোগ করবে সাধারণ জনগণ। জনস্বার্থে এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষা খাতে ব্যয় সঙ্কোচ করার মহৎ উদ্দেশ্যও বাস্তবায়ন হবে।

অভিভাবকেরা কখনোই উচ্চমূল্যের গাইড বই কিনতে আগ্রহী নন, বরং প্রতি বিষয়ে একাধিক গাইড বই কেনার অর্থ জোগান দিতে তারা হিমশিম খান। শিক্ষকেরাও হাতের কাছে গাইড বই পেয়ে সহজ পথ অবলম্বন করেন। তাই শিক্ষামন্ত্রী যদি গাইড বই নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে বাজার থেকে গাইড বই উঠিয়ে দিতে পারেন, তবে বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণের সুবিধা ভোগ করতে পারবে জনগণ। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড শিক্ষার যে স্তর পর্যন্ত পাঠ্যবই প্রণয়ন করে, সে স্তর পর্যন্ত অন্য কোনো প্রকাশক কোনো বই প্রকাশ করতে পারবে না মর্মে আইন প্রণয়ন করা উচিত। সে স্তর পর্যন্ত বই প্রকাশের দায়িত্ব থাকবে শুধু এনসিটিবির ওপর। শিক্ষক নিজেই যেহেতু গাইড। তাই শিক্ষকের জন্য গাইড বইয়ের কোনো প্রয়োজন নেই। একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়ে গড়ে তোলার সামর্থ্য রাখেন। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে শিক্ষকের ভূমিকাই প্রধান। আবার প্রকৃত শিক্ষক হয়ে ওঠার জন্য যে অনুকূল পরিবেশ দরকার সে পরিবেশ তৈরির দায়িত্ব সমাজের সবার। বর্তমান সমাজে একজন ব্যক্তি বা পেশাজীবীর সামাজিক মর্যাদা অনেকাংশেই নির্ধারিত হয় আর্থিক সামর্থ্যরে বিবেচনায়।

সুতরাং একজন শিক্ষকের আর্থিক সামর্থ্যও বাড়ানো দরকার। মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আনতে আকর্ষণীয় বেতন প্রদান করার প্রয়োজন আছে। পাঠ্যবইয়ে বিষয়বস্তুর অপর্যাপ্ততা কিংবা কোনো বিষয় উপস্থাপনে ঘাটতি থাকলে পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জন করা যেতে পারে। পাঠ্যপুস্তক এমনভাবে প্রণয়ন করতে হবে, যাতে বিষয়বস্তুর সব প্রয়োজনীয় তথ্য পাঠ্যপুস্তকেই পাওয়া যায়। তাহলে পাঠ্যপুস্তকের বাইরে শিক্ষক কিংবা শিক্ষার্থী কাউকেই গাইড বই অনুসরণ করতে হবে না। আর অভিভাবকেরাও রেহাই পাবেন উচ্চমূল্যের গাইড বই কেনার আর্থিক কষ্ট থেকে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, শহীদ জিয়া মহিলা কলেজ, ভূঞাপুর, টাঙ্গাইল

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.