মেগাসিরিয়াল

মুহাম্মদ কামাল হোসেন

-খবরদার বলছি, ওখানেই দাঁড়া!
কলতলা থেকে উচ্চস্বরে চেঁচিয়ে ওঠে মরিয়ম বিবি।
-থমকে যায় মারিয়া। এক কদম আর এগোয় না। সাহস পায় না।
মাথা নিচু করে ডান পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে মাটিতে আঁকিবুঁকি করে। ভেজা কাপড় নিয়ে মরিয়ম বিবি উঠে আসে। সরাসরি মেয়ের মুখোমুখি দাঁড়ায়।
-এই চোখ একদম নিচের দিকে নয়। আমার দিকে তাকা?
মেয়ে আস্তে আস্তে চোখ ওপরে উঠায়। অনেক কষ্টে মায়ের চোখে চোখ রাখে।
-সকাল থেকে উল্টো দুপুরতক তোকে খুঁজে চলেছি।এতক্ষণ কোথায় ছিলি?
-স্বপ্নাদের বাড়ি! সিরিয়াল দেখতে গিয়েছিলাম!!
-কী?! এত বড় সাহস তোর? তোকে আমি পই পই করে বারন করার পরও তোর কোনো শিক্ষে হয় না বুঝি? তুই জানিস, তোর জন্যি আমাকে তোর বাবার কাছে প্রতিদিন কত শত মিথ্যে কথা বলতে হয়?
-তুমি বাবাকে বলো না, একটি টেলিভিশন নিয়ে আসতে। আমি আর কখনো কারো বাড়ি যাব না। কথা দিলাম...।

এ কথা বলে মেয়ে হন হন করে ঘরে ঢুকে পড়ে। মরিয়ম বিবি কিছুক্ষণ মেয়ের গমন পথের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকে। গত এক সপ্তাহব্যাপী একমাত্র কিশোরী মেয়েটার টিকিটি ছুঁতে পারছে না মরিয়ম বিবি। ইদানীং টো টো করে পাড়া বেড়ানোর স্বভাবটা বেড়ে গেছে। সারাক্ষণ স্বপ্নাদের বাড়ি। সিরিয়াল দেখতে যায়। স্টার জলসার সিরিয়ালের পোকা। বিশেষ করে ‘কুসুম দোলা’ ও ‘কে আপন কে পর’ বলতে মেয়েটি অজ্ঞান। মরিয়ম বিবি মেয়ের গতিবিধি সবই জানে। দিনকাল ভালো নয়। তাই জানতে হয়। তবুও স্বামীর কাছে মিথ্যে কথা বলে। মেয়েকে তার বাবার কাছে আড়াল করে। বৃদ্ধা রিকশা ড্রাইভার রমিজ মিয়া সারাদিন বাইরে বাইরে থাকে। সংসার নামক রোজকার জীবনের নির্মম বাস্তবতার মেগাসিরিয়ালের ঘানি টানতেই সে ব্যস্ত। মেয়ের সামান্য টেলিভিশন পর্দার সিরিয়াল দেখার ছুতোপুতো শোনার সময় কই? তবুও স্বামী রমিজ মিয়ার কাছে মরিয়ম বিবিকে একগাদা মিথ্যে কথা বলতে হয়। মিথ্যা বলা মহাপাপ এ কথা জেনেও।

।২।
রাতে মেয়েকে পাশে নিয়ে খেতে বসে বৃদ্ধা রমিজ মিয়া। একমাত্র মেয়েটাকে ভীষণ ভালোবাসে সে। মেয়েও বাবা বলতে রীতিমতো পাগলপারা। মেয়ের কোনো অভাব রমিজ মিয়া আজতক রাখেনি। নিজের শত কষ্টকে আড়াল করে হলেও মেয়ের চাহিদা মিটিয়ে গেছে। মারিয়া বাবাকে এটা সেটা এগিয়ে দেয়। খাবার পরিবেশন করে। বাপ-মেয়ের এই চমৎকার দৃশ্য মরিয়ম বিবির ভালো লাগে। চক্ষু শীতল হয়।
-কী ব্যাপার, আজ আমার মা’টা বুড়ো বাপটাকে এত খাতিরযত্ন করছে কেন?
-না, বাবা কিছু না। এমনি...।
-এমনি এমনি কি আর এত আদর মেলে রে মা? কিছু তো একটা আছেই। তোর কিছু লাগবে মা?
-লাগবে...রাগ করবে না তো?
-তওবা তওবা, বুড়ি মাটা আবার কী কয়? রাগ করব কেন? তোর কী চাই বল?
-বাবা, আমাদের ঘরে একটা টেলিভিশন কিনে আনো না? রোজ রোজ মানুষের বাড়িতে যেতে মন চায় না। যখন তখন যাই বলে ওরা কত আজেবাজে কথা বলে। বাঁকা চোখে তাকায়। খোঁটা দেয়।

রমিজ মিয়া ভাতের লোকমাটা তুলতে গিয়ে তুলতে পারে না। মেয়ের শেষ কয়েকটি কথা তীরের মতো বিঁধে। একমাত্র মেয়ের অপমানে কষ্ট পায়। মুখের ভেতরে ভাতের লোকমাটা গলায় আটকে যায়। দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার জোগাড়। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলতে গিয়ে ফেলে না। আড়াল করে ফেলে। গরিব অসহায় বাবাকে অনেক কিছু আড়াল করতে হয়। পাছে মেয়ে যদি দেখে ফেলে। মুখে কৃত্রিমতা এনে স্মিত হাসে।
-আচ্ছা মা কিনে দিবো।
-সত্যি বাবা! উঁহু কী মজা! এখন থেকে ঘরে বসে আমি সিরিয়াল দেখতে পাবো। খুশিতে মারিয়া তার বাবাকে জড়িয়ে ধরে।
।৩।
দু’দিন ধরে রমিজ মিয়ার রিকশার চাকা চলছে না। সংসারের চাকাও বন্ধ হওয়ার জোগাড়। বৃদ্ধ রমিজ মিয়ার পুরনো পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্যাধিটা ক্রমশ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। থেকে থেকে কাশির সাথে রক্তবমি হচ্ছে। লক্ষণ মোটেও ভালো নয়। মারিয়া বাবার শিয়রে বসে যত্নআত্তি করছে। অবহেলা করে করে রমিজ মিয়া রোগটাকে অনেক বড় করে তুলেছে। ঘানিটানা সংসারের নিত্যনৈমিত্তিক চাহিদা মেটাতে গিয়ে নিজের দিকে তাকানোর ফুরসতটুকু পায়নি। রমিজ মিয়া মেয়ের কচিপানা মুখখানার দিকে চেয়ে চেয়ে চোখ ভেজায়।

-বাবা, তুমি কাঁদছ কেন? কেঁদো না।
-মা তুই এই বুড়াটার সাথে রাগ করেছিস? আমাকে ক্ষমা করে দিস মা? এই প্রথম তোর চাওয়াটা আমি পূরণ করতে পারিনি।
-বাবা, তুমি এত কথা বলছ কেন? আমি মোটেও রাগ করিনি। আমার টেলিভিশন লাগবে না। তুমি সুস্থ হয়ে গেলে আমি খুশি। তুমিই আমার সব।

এই ক’দিনে মেয়েটি অনেক বুঝদার হয়ে গেছে। সারাক্ষণ বাবা বাবা বলে মুখে ফেনা তুলছে। সিরিয়াল দেখার জন্য একবারও ওই বাড়ির চৌহদ্দি মাড়ায়নি। সময় ও পরিস্থিতি মানুষকে অনেক বদলে দেয়। জাগতিক জীবনের রূঢ় বাস্তবতার মেগাসিরিয়ালের কাছে পর্দার সামান্য সিরিয়াল নস্যি। প্রতি পদে পদে প্রয়োজনটাই এখানে সত্য হয়ে দাঁড়ায়। দিবালোকের মতো সত্যতার প্রয়োজনটুকু অজান্তেই হারিয়ে যায়। যাপিত জীবনের টানাপড়েনে নির্মম বাস্তবতার মেগাসিরিয়ালই এখানে মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়।

ছোট শরীফপুর, কুমিল্লা

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.