মুখোশ হয় নানা রঙের নানা ডিজাইনের
মুখোশ হয় নানা রঙের নানা ডিজাইনের

মুখোশচিত্র ভিন্নধারার চিত্রকলা

হাসান মাহমুদ রিপন

মুখোশচিত্র, বাংলার লোককারুশিল্পের ঐতিহ্যের এক অনন্য শৈল্পিক অংশ। বাংলার সামাজিক ইতিহাসের একটি মূল্যবান সম্পদও বটে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘দেশের লোকসংস্কৃতির মধ্যে অতীত যুগের সংস্কৃতির বহু নিদর্শন আজ সংযুক্ত আছে, মুখোশচিত্র শিল্প সেগুলোর অন্যতম। এটি আমাদের জাতির পূর্ণাঙ্গ লোকসংস্কৃতির মূল্যবান উপকরণ।’ মানবসমাজের মুখোশচিত্র সম্পর্কিত শিক্ষার তথ্য ও তত্ত্বসংবলিত বিষয়কে সাধারণ অর্থে মুখোশচিত্রের ইতিহাস বলা হয়। মুখোশচিত্র গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের সৃষ্টি। চরিত্রের সাথে সম্পর্কিত মুখোশ মুখে লাগিয়ে মঞ্চে অভিনয় ও পূজা-পার্বণে নৃত্য পরিবেশিত হয়। যেকোনো অনুষ্ঠানে নৃত্য-অভিনয়ের সাথে মুখোশের আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে নানাভাবে মুখোশের আবির্ভাব ঘটে। বাংলাদেশের গ্রামের বিভিন্ন মেলায় বা যাত্রানুষ্ঠানে, চৈত্রসংক্রান্তিতে নৃত্যের আয়োজন হতো, সেই মেলায় পসরা সাজানো হতো নানা ধরনের মুখোশ দিয়ে। অনেক ধরনের মুখোশ আছে যেগুলোকে খেলনা জাতীয় মুখোশ বলা যেতে পারে। আবার অনেক মুখোশ আছে যা নৃত্য, অভিনয় এবং পূজা-পার্বণে ব্যবহার করা হয়। মুখোশচিত্রের প্রতিটি শিল্পীই তাদের তৈরী মুখোশকে সামান্য রদবদল করে বিভিন্ন চরিত্র সৃষ্টি করেন। যেমনÑ বাঘ, ভালুক, বানর, দেবদেবী ইত্যাদি। আর এ সবই শিল্পীর হাতের সৃষ্ট কলাকৌশল।
অদৃশ্য ও কল্পিত বিষয়কে মুখোশে প্রকাশ করা হয়, যা মঙ্গল বা অমঙ্গল বাচক ঐন্দ্রিজালিকতা সৃষ্টির জন্য মুখোশচিত্রকে সাতটি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে। পৌরাণিক মুখোশ, লোকায়ত মুখোশ, গ্রামীণ মুখোশ, প্রাণী মুখোশ, সামাজিক মুখোশ, মিশ্র মুখোশ এবং অন্যান্য মুখোশ। লোকজ আচার অনুষ্ঠানে লোকনৃত্য মুখোশের ব্যবহারের মূলে রয়েছে আবহমান গ্রামবাংলার নর-নারীর নানা অভিব্যক্তি যেমনÑ বীরত্বব্যঞ্জক, কাম ভাব বা সম্মোহন ভাবের প্রকাশ। এ ছাড়া নানা কুপ্রভাব দূরীকরণে লোকসমাজের যুগ-যুগান্তরের সংস্কার ও বিশ্বাস অনুযায়ী আচার-অনুষ্ঠানে বিভিন্ন লোকজ নৃত্য প্রভৃতি ছাড়াও বিভিন্ন উদ্দেশ্যে মুখোশচিত্র তৈরি হয়েছে।
মুখোশ সামাজিক বা ধর্মীয় ঐতিহ্যগত মূল্যবোধ ও শক্তিসাধনায় স্বরূপের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। তা ছাড়া লৌকিক ও পৌরাণিক গল্পগুলো হাসি তামাশা বিদ্রƒপ ভয়ভীতির জন্যও মুখোশ মুখে লাগিয়ে নৃত্য এবং অঙ্গভঙ্গির সাহায্যে ফুটিয়ে তোলা হয় বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠান। সভ্যতার আদি স্তরে শক্তিকে বশ করার প্রয়োজনে ও পরে সামাজিক ধর্মীয় অনুষ্ঠানে শিশুদের খেলনা হিসেবেও মুখোশচিত্র ব্যবহৃত হয়েছে। এখন প্রশ্ন আসে মুখোশচিত্রের উৎপত্তি হলো কিভাবে। মানুষের আদি যুগের বর্বর দশা থেকেই তার লোক কারুশিল্পে মুখোশ তৈরির কৌশল শিক্ষার সূত্রপাত। নৃতত্ত্ববিদ, পুরাতত্ত্ববিদ ও ইতিহাসবিদদের প্রচেষ্টায় আদিযুগের মানুষেরা প্রতিকূল পরিবেশকে জয় করার অদম্য ইচ্ছায় বুদ্ধির সাহায্যে নানা উপায় ও কৌশল আবিষ্কার করেছিল এবং এই কৌশলগুলো তারা তাদের উত্তর পুরুষদের শিখিয়ে দিত। সম্ভবত লোক কারুশিল্পে এভাবেই বংশানুক্রমে মুখোশচিত্রের উৎপত্তি হয়েছিল।
বাংলাদেশের সব অঞ্চলেই লোককারুশিল্পের মুখোশের প্রচলন ছিল। ঢাকা, কিশোরগঞ্জ, কুমিল্লা, রাজশাহী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, যশোর, বগুড়া, রংপুর প্রভৃতি অঞ্চলে আজো কিছু কিছু মুখোশের প্রচলন কোনো রকম টিকে আছে। এসব অঞ্চলের মধ্যে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ লোককারুশিল্প ফাউন্ডেশনে লোককারুশিল্প মেলা ও লোকজ উৎসবগুলোসহ অন্যান্য মেলা পার্বণে মুখোশ পরিলক্ষিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের ছাত্রছাত্রীরা বৈশাখের উৎসবে বিভিন্ন মুখোশচিত্র তৈরী করে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রাসহকারে বাংলা বর্ষবরণ উদযাপন করে থাকে। পাশাপাশি উচ্চবিত্ত পরিবারের বাসাবাড়ির দেয়ালে শোভা পায় এ মুখোশচিত্র।
মুখোশ কাঠ, কাগজ, মাটি, বেত, শোলা ইত্যাদি উপকরণ দিয়ে তৈরি করা হয়ে থাকে। মুখোশ তৈরিতে লাল, নীল, হলুদ এবং কালো রঙ প্রধান। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে মালাকার, পাল, কুমার, আচার্য অবং অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী শিল্পী মুখোশ তৈরি করে থাকেন। মুখোশ তৈরি করতে গ্রামবাংলার দেবদেবীর মুখাকৃতি এবং বিভিন্ন ধরনের পশুপ্রাণীর মুখের মতো তৈরি করে, যা ডাইস বা ছাপ হিসেবে পরিচিত তার ওপর মুখোশের কাঠ ও বেত পোটা তৈরি করে নিতে হয়। পরে এগুলো শিল্পীরা হাতে টিপে টিপে দেবদেবীর কিংবা পশু আকৃতির মুখোশ তৈরি করেন। যেমনÑ মুণ্ড মূর্তির মুখোশ, ওলাই চণ্ডির মুখোশ, বড়াম চণ্ডির মুখোশ, বড়খা গাজীর মুখোশ, ধর্মঠাকুরের মুখোশ, সত্য নারায়ণ সত্য পীরের মুখোশ, পীর গোড়া চাঁদের মুখোশ, ওলা বিবির মুখোশ, ভৈরবের মুখোশ, ঘাটু দেবতার মুখোশ, মানিক পীরের মুখোশ ইত্যাদি।
কথা হলো মুখোশ তৈরি কয়েকজন শিল্পীর সাথে। শঙ্কর মালাকার। মাগুরা জেলার শালিখা থানার শতপাড়া গ্রামে তার বাড়ি। তিনি মুখোশ তৈরির মূল কারিগর। ছেলেমেয়ের মধ্যে দুই ছেলে মুখোশ তৈরি পেশায় কাজ করে। বড় ছেলে নিখিল মালাকার। তিনি বলেন, বংশগতভাবে এ পেশায় আসা, তার চৌদ্দপুরুষ এ পেশায় কাজ করে আসছে।
রাজশাহী জেলার পবা উপজেলার বসন্তপুর গ্রামের সুশান্ত পাল। তিনি ১২ বছর বয়স থেকে এ পেশায় জড়িত। নওগাঁ আত্রাইয়ের ভবানীপুর গ্রামের নয়ন মালাকার, তপন মালাকার, বিশ্বনাথ মালাকার। তারা তিন ভাই এ মুখোশ তৈরি পেশায় ছোট থেকেই জড়িত। তারা চার ভাই, দুই বোন। তাদের মধ্যে তিন ভাই এ কাজ করেন। বাকিরা পড়ালেখা করছে। নয়ন, তপন ও বিশ্বনাথ মালাকার বলেন, আমরা জন্মের পর দেখেছি আমাদের দাদা-দাদীরা এ পেশায় কাজ করে আসছেন। আমাদের এ পেশায় বংশপর্যায়ে চলে আসতে হয়েছে।
মুখোশচিত্র শিল্পীরা আরো বলেন, তারা মুখোশচিত্র ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে ব্যবহারের প্রয়োজনে তৈরি করেন। বংশানুক্রমে পারিবারিক শিল্পের নিজস্ব ঐতিহ্য রয়েছে এ শিল্পে। তারা এই মুখোশচিত্র তৈরি করতে মাটি কাগজ ও শোলার দ্বারা বংশানুক্রমে মুখোশচিত্র তৈরি করার কৌশল শিখেছেন। তারা বলেন, ‘আজ কোনো রকমে আমরা টিকে আছি। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় এই শিল্পটি আজ হারিয়ে যেতে বসেছে।’
আসলেই মুখোশচিত্র এখন লুপ্তপ্রায়। অন্যান্য শিল্পের সাথে প্রতিযোগিতায় মুখোশচিত্র শিল্প আস্তে আস্তে তাদের প্রাধান্য হারিয়ে ফেলেছে। ফলে ঐতিহ্যবাহী মুখোশ শিল্পটি লুপ্ত হতে চলেছে। মুখোশচিত্রের শিল্পীরা এখন কালের বিবর্তনের সাথে মুখোশচিত্রের পাশাপাশি তৈরি করেছেন শোলার আধুনিক কাজ এবং শখের হাঁড়িসহ অন্যান্য কাজ। তার কারণ বাঙালির চিরায়ত বিভিন্ন উৎসব ছাড়া মুখোশচিত্রের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায় না। তাই মুখোশচিত্র শিল্পীরা অন্যান্য শিল্পের সাথে এই মুখোশচিত্রটিকে ধরে রেখেছে। আমাদের লোক কারুশিল্পে মুখোশচিত্রের সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং প্রদর্শন শুধু জাদুঘরে কিংবা বিভিন্ন মেলা উৎসবে সীমাবদ্ধ না রেখে এ কাজে জড়িত শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে এ শিল্পের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.