আত্মহত্যায়ই যেন সমাধান

মাকসুদা রহমান

১. বগুড়ার দুপচাঁচিয়া রমোস্তফাপুর গ্রামের পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রী মিলি খাতুন। দুই বখাটের উত্ত্যক্ত সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে ৯ অক্টোবর, সোমবার। পরদিন অর্থাৎ ১০ অক্টোবর দুপচাঁচিয়া থানায় দুই বখাটের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন মিলির মা। আসামিরা হলোÑ দুপচাঁচিয়া উপজেলার মোস্তফাপুর গ্রামের জাহিদ হোসেনের ছেলে বুলু মণ্ডল ও একই গ্রামের আবুল ফকিরের ছেলে ছদরুল ফকির। এই দুই বখাটে মিলিকে শুধু উত্ত্যক্তই করত না, মারধরও করত।

২. রোজিনা আক্তার সাথী। দুপচাঁচিয়ার আরেক ছাত্রী। ক্লাসে সাথী প্রথম হতো, ভালো ড্রয়িং করত। পাঁচওয়াক্ত নামাজ পড়ত। এ বছর ‘স্টুডেন্ট অব দ্য ইয়ার’ হয়েছিল। কিন্তু সাথীও আত্মহননের পথ বেছে নেয় বখাটেদের অত্যাচারে। বখাটে যুবক তার হাত ও ওড়না ধরে টানাটানি করায় ক্ষোভে-দুঃখে আত্মহত্যা করে সাথী। নবম শ্রেণীর ছাত্রী সাথীর ইচ্ছা ছিল ডাক্তার হওয়ার।

৩. শামসুন্নাহার চাঁদনী। খুলনার সরকারি করপোরেশন বালিকা বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী। প্রতিবেশী বখাটে পাইপমিস্ত্রি শুভর উৎপাত ও অপমানে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে চাঁদনী।
চাঁদনীর প্রতিবেশী শুভ এলাকায় বখাটে হিসেবে পরিচিত। স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে শুভ চাঁদনীকে উত্ত্যক্ত করত। গত ১২ অক্টোবর শুক্রবার শুভ তার বাবাসহ ছয়-সাতজন নিয়ে চাঁদনীর বাসায় যায়। শুভর সাথে চাঁদনীর বিয়ের প্রস্তাব দেয়। চাঁদনীর বাবা বিয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে মারধর করে। এ সময় ঘটক স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেত্রী সাফিয়া চাঁদনীকে চড় মারে। চাঁদনী ক্ষুব্ধ হয়ে পাশের রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। বখাটেরা চাঁদনীকে তুলে নিয়ে যাওয়ার হুমকি দেয়। এরপর রাত ১০টার দিকে চাঁদনীকে রুমের ভেতর থেকে সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করে।
৪. জয়শ্রী সাতক্ষীরার শ্যামনগর বায়ার শিং গ্রামের মাখন চক্রবর্তীর মেয়ে। জয়শ্রী প্রতিদিন বাড়ি থেকে কলেজে হেঁটে যেত। ২৫ অক্টোবর দুপুরে কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার পথে বখাটে শেখর মণ্ডলসহ তিন যুবক জয়শ্রীর পথ আটকায়। প্রথমে জয়শ্রীর ওড়না কেড়ে নেয়। এতে জয়শ্রী প্রতিবাদ করলে তাকে চড়থাপ্পড় দিতে থাকে। এ সময় বখাটেরা কাঁচি দিয়ে জয়শ্রীর চুল কেটে দেয়। জয়শ্রীর চিৎকারে স্থানীয়রা ছুটে এলে বখাটেরা পালিয়ে যায়। এ ঘটনার পর জয়শ্রী বাড়ি ফিরে তাদের পারিবারিক ঠাকুরঘরে গিয়ে আড়ার সাথে ওড়না পেঁচিয়ে ফাঁস দেয়। টের পেয়ে পরিবারের লোকেরা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানেই তার মৃত্যু হয়।

উপরের সব ঘটনাই পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। ঘটনাগুলো ঘটেছে মাত্র এক মাসের মধ্যে। এই এক মাসে বখাটেদের অত্যাচারে আত্মহত্যা করেছে এ চারজন মেয়ে। তাদের একটাই অপরাধ, তারা মেয়ে। ঘটনা শুধু এ চারটি নয়। পত্রিকা খুললে প্রতিদিন এরকম ঘটনা চোখে পড়ে। বখাটেদের অত্যাচার দিন দিন বাড়ছে। আর অসহায় মেয়েরাও এ থেকে বাঁচতে বেছে নিচ্ছে আত্মহননের পথ।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ক্রমানুসারে ৮০১, ৬৪৫, ৪৭০, ৪৪৪ ও ৩২৮ জন নারী এবং শিশু উত্ত্যক্তের শিকার। এ ছাড়া পাঁচ বছরে উত্ত্যক্তের কারণে আত্মহত্যা করেছে ১৩৭ জন নারী ও শিশু। পুলিশ সদর দফতরের তথ্য মতে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে নারী শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে এক হাজার ১৬০টি; ফেব্রুয়ারি মাসে এক হাজার ১৭১টি; মার্চ মাসে এক হাজার ৪৭৭টি; এপ্রিল মাসে এক হাজার ৩৮৬টি; মে মাসে এক হাজার ৭১৯টি এবং জুন মাসে নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ৪২১টি।

এ পরিসংখ্যান ভয়াবহ। এ পরিসংখ্যান বলছে, বখাটেদের অত্যাচার দিন দিন বাড়ছেই। কিন্তু প্রতিকার নেই কোনো। ছোট ছোট স্কুলগামী মেয়ে কিংবা কলেজপড়–য়া মেয়ে বখাটের উত্ত্যক্তের শিকার হচ্ছে। এসব বখাটের বেশির ভাগেরই কোনো বিচার হয় না। কারণ এরা প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় থাকে। তাই আইন তাদের স্পর্শ করে না। আর এই বখাটেদের অত্যাচারে শুধু মেয়ে নয়, পুরো পরিবারই ভোগে নিরাপত্তাহীনতায়।

তাই অনেক মেয়েই সমাধান খোঁজে আত্মহননে। কিন্তু আত্মহত্যাই কোনো সমাধান নয়। ছোট ছোট মেয়েদের রক্ষা করা দরকার বখাটেদের হাত থেকে, আত্মহত্যার পথ থেকে। আর এ জন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে।

সবার আগে মেয়ের পরিবারকে সচেতন হতে হবে। মা-বাবাকে জানতে হবে, তার মেয়ে কোনো সমস্যা মোকাবেলা করছে কিনা। তবে গ্রাম-গঞ্জের হতদরিদ্র পরিবারের মেয়েরা উত্ত্যক্তের শিকার হয় বেশি। সে ক্ষেত্রে মেয়ের অসহায় বাবা এর প্রতিকার করতে পারেন না। স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা যদি সচেতন হন, তবে হয়তো ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনার কথা বলা যায়। এটি সত্তর দশকের কথা। তখনো ঢাকা শহরে মায়েরা ছেলেমেয়েকে স্কুলে নিয়ে যেত না। মেয়েরা দলবেঁধে হেঁটে স্কুলে যাতায়াত করত। আমরা সবাই সেভাবেই স্কুলে যেতাম। পথে কোনো বিপদ হতে পারে, আমরা কখনো সে শঙ্কা করতাম না। আমরা যখন ক্লাস নাইনে পড়ি, তখন আমাদের এক সহপাঠী স্কুলের পথে হয়রানির শিকার হলো। পরিবারের লোকজন বিষয়টি স্কুলে জানালে স্কুল কর্তৃপক্ষ সাথে সাথে শক্ত পদক্ষেপ নিয়েছিল। সেই ছেলে এবং তার পরিবারকে ডেকে বিষয়টি মীমাংসা করে দিয়েছিল। শুধু তাই নয়, এরপর থেকে শিক্ষকেরা মেয়েটির প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখতেন।

এ অন্যায়ের প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে হবে সমাজকেই, যাতে বখাটের অত্যাচার বাড়তে না পারে। পরিবারে ও স্কুলে মেয়েদের বোঝান দরকার, আত্মহত্যা কোনো সমাধান নয়, বরং এসব বখাটের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। অবশ্য এ জন্য আইনের যথাযথ প্রয়োগ প্রয়োজন। বেশির ভাগ সময়ই বখাটেরা পার পেয়ে যায় সমাজের প্রভাবশালীদের ছায়ায় থেকে। ফলে এদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয় না। কিন্তু প্রশাসনকে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। এসব বখাটে যেন দৃষ্টান্তমূলক সাজা পায়। যাতে পরবর্তীতে কেউ সাহস না পায় এ জাতীয় কাজ করতে।

আসলে গোটা সমাজকে সচেতন হতে হবে। বখাটেদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। তা না হলে এমন দুঃখজনক আত্মহত্যা বারবার ঘটতেই থাকবে। যা কারোরই কাম্য নয়।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.