উন্নয়নের জন্য চাই নারীর ক্ষমতায়ন : শারমিন সেলিম তুলি

বদরুন নেসা নিপা

শারমিন সেলিম তুলি একজন সফল উদ্যোক্তাই নন, সমাজ সংস্কারকও। শুধু নিজের নয় সমাজে প্রতিটি নারীর উন্নয়নের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে চলছেন তিনি। তার বহুমাত্রিক কাজ নিয়ে লিখেছেন বদরুন নেসা নিপা
নারী হিসেবে নয়, নিজেকে মূল্যায়ন করি মানুষ হিসেবে। সমাজের উন্নতির জন্য চাই নারীর ক্ষমতায়ন। প্রত্যেকটা নারীকে কিছু না কিছু করতে হবে। আপনি কি পারবেন, সেটা আপনাকেই ঠিক করতে হবে। যেকোনো কিছুর সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখাটা জরুরি। সফলতা তখনই আসবে যখন নিজের লক্ষ্যে এগিয়ে যাবেন। অনেক কিছু থাকে একজন মানুষের ভেতর; সেই গুণাগুণ যদি দেখাতে না পারা যায় তাহলে লাভ হবে না। সেটার প্রকাশ ঘটাতে হবে।
আমি নিজেকে যেখানে দেখতে চাই, সেটা সম্পর্কে জানতে হবে। সব সময় নিজেকে ভালো একটি জায়গায় দেখার প্রত্যয় ছিল। কথাগুলো বললেন সফল নারী উদ্যোক্তা শারমিন সেলিম তুলি।
শারমিন সেলিমের ছোটবেলা থেকেই শখ ছিল নিজের প্রতিষ্ঠানের। সে মোতাবেক গড়ে তোলেন নিজের প্রতিষ্ঠান ‘স্রোতধারা ফ্যাশান হাউজ’। রাজধানীর গুলশান পিংক সিটিতে ‘স্রোতধারার’ শোরুম রয়েছে। ডিজাইনে নতুনত্বের ছোঁয়া, বৈচিত্র্যময় পোশাক, অভিনব নকশা, রুচিশীল ও চলতি ফ্যাশনের সমারোহে বেশ গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে ক্রেতাদের কাছে এ ফ্যাশান হাউজটি। ১৭ বছর ধরে সাফল্যের সাথে কাজ করে যাচ্ছেন এ তরুণ নারী উদ্যোক্তা। নানা রকম সৃজনশীল ও সৃষ্টিশীল কাজের প্রতি আকর্ষণ শারমিন সেলিম তুলির। তার দৃষ্টিতে পৃথিবীর প্রত্যেকটি মানুষ খুব সুন্দর। প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তিত্বের সাথে সৌন্দর্য অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। ফিটনেস একজন নারীকে ফ্যাশন সচেতন ও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। সেই ভাবনা থেকে শুধু মহিলাদের জন্য চালু করেন গুলশানে ‘বেয়ারবিজ বডি ওয়েক্স অ্যান্ড বিউটি সেলুন ও বেয়ার বিজ জিম, ইয়োগা, এরোবিক্স সেন্টার।
হারবাল জেল দিয়ে ওশেক্সিং প্রথম বাংলাদেশে তিনিই আনেন। উন্নত সেবা, ভালোমানের প্রসাধনসামগ্রী, দক্ষকর্মী, ডাইটেশিয়ান ও স্কিন ডাক্তারের পরামর্শ দিয়ে ভোক্তাদের প্রয়োজন মেটান। যার কারণে বিউটি সেলুন, জিম ও ফ্যাশন হাউজের প্রতি কাস্টমারদের একটা আস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এটাই তার সবচেয়ে বড় অর্জন বলে শারমনি সেলিম মনে করেন।
শারমিন সেলিমের জন্ম ঢাকার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। পৈতৃকসূত্রে গাজীপুরের পূবাইলের অধিবাসী তিনি। বাবা আবুল কাশেম সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। মা কুরসী বেগম এজন সুগৃহিণী ও আদর্শ মা ছিলেন। ৯ ভাইবোনের সবাই উচ্চশিক্ষিত ও স্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। কাজ করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার মানসিকতা ও উৎসাহ দিয়েছেন তার মা। শারমিন সেলিম ছাত্রজীবনে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে মাস্টার্স পাস করেন। এরপর বিসিক থেকে টেক্সটাইল, ফ্যাশন ডিজাইনিং কোর্স ও গৃহসুখন থেকে ডিজাইনিং কোর্স করেন। ভারত থেকেও টেক্সটাইলের ও ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ের লং কোর্স করেন।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত থেকে হেয়ার, স্কিন ও মেকআপের ওপর কোর্স সম্পন্ন করেন। বিসিক আয়োজিত উদ্যোক্তা মেলাগুলোতে সবসময় অংশগ্রহণ করেন। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ও ইউরোপে উদ্যোক্তা হিসেবে ভ্রমণ করেছেন। মহিলা চেম্বার অব কমার্স ও লায়নসের মেম্বার তিনি। সে সূত্রে বিভিন্ন সেমিনারেও অংশ নেন। তিনি এক ছেলে ও এক মেয়ের মা। স্বামী ইঞ্জিনিয়ার মো: সেলিম মিয়া ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা। পড়ালেখা করা অবস্থায় বিয়ে হয়; কিন্তু স্বামী ও পরিবারের উৎসাহ, সহযোগিতা পেয়েছেন সবসময়। ফলে সব কিছু সামলে কাজ করতে সমস্যা হয়নি তার। শারমিন সেলিম মনে করেন, একটি জায়গায় পৌঁছান পর্যন্ত মেয়েদের জন্য পারিবারিক সহযোগিতা খুবই দরকার। শারমিন সেলিমের পরিচয় বহুমাত্রিকÑ তিনি একজন নারী উদ্যোক্তা, সফল ব্যবসায়ী, সমাজসেবক ও লেখক।
সমাজসেবা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রতি বছর গ্রামে বিনাচিকিৎসা বা অপচিকিৎসায় অসংখ্য মানুষ অকালে প্রাণ হারাচ্ছে। এটা একজন সচেতন মানুষ হিসেবে মেনে নিতে আমার কষ্ট হয়। আমার স্বপ্ন হলো স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে প্রতিটি মানুষকে সুস্থ করে তুলব। সেই উদ্দেশ্যেই আমি নিজেকে যুক্ত করি একটি হাসপাতালের সাথে। যেটি নবাবগঞ্জ উপজেলার পাড়াগ্রামে অবস্থিত ‘মডার্ন লাইফ হাসপাতাল’। তিনি এটির চেয়ারপারসন। আধুনিক ও উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। মানুষের জন্য সেবামূলক কাজ করতে পেরে আত্মতৃপ্তি আর নিজেকে গর্বিত অনুভব করছেন। নারীর কর্মপরিধি নিয়ে শারমিন সেলিম বলেন, এখন কাজের দ্বার অনেক উন্মুক্ত। অনেকেই ভাবে পারব কি, পারব না। এটা আত্মবিশ্বাসের অভাব। আমার কথা হলোÑ কেন পারব না। আমি কোথায় উপযুক্ত সেটা নির্ধারণ করতে হবে। প্রচুর বাধা আসবে। সেটা পার করার মানসিকতা থাকতে হবে। যেকোনো পেশায় সাফল্য পেতে হলে দক্ষতা অর্জন করতে হবে। আমি সব সময় উচ্চাকাক্সক্ষী। প্রত্যেক নারীর অনুসরণীয় হতে চেয়েছি। আমি মনে করিÑ কঠোর পরিশ্রমের বিকল্প কিছু হতে পারে না। সফল হতে হলে কোন কাজটি করতে চাই, সেটা বুঝতে হবে। নিজের সাথে এই বোঝাপড়াটা ভালো থাকতে হবে। মেধা, ধৈর্য, সততা, পরিশ্রম ও সঠিক সময়ের সঠিক সিদ্ধান্ত আপনাকে এগিয়ে নেবে। স্বপ্নজয়ী ও প্রত্যয়দীপ্ত আত্মমানবতার সেবায় প্রজ্ঞাময়ী শারমিন সেলিম তুলি নিজের পরিচয়ে অনগ্রসর এ সমাজকে এগিয়ে নিতে চান বহুদূর। শারমিন সেলিম অবসর পেলেই ছুটে যান গ্রামে, মানুষের সুখ-দুঃখের খোঁজখবর নেন। তাদের পাশে থাকেন। ভালোবাসেন নিজে রান্না করে সবাইকে খাওয়াতে, আত্মীয়-পরিজনদের ও বন্ধুদের সাথে সময় কাটাতে। ভবিষ্যৎ স্বপ্ন প্রসঙ্গে শারমিন সেলিম বলেন, বয়স্কদের জন্য বৃদ্ধাশ্রম করতে চাই যেখানে সব শ্রেণীর বৃদ্ধ মানুষের জন্য একই রকম উন্নত সেবা ও সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা থাকবে। সুবিধাবঞ্চিত নারীদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। শিশুদের ও প্রতিবন্ধীদের জন্য কাজ করতে চাই। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দেশের মানুষের কল্যাণে, দেশের কল্যাণে অবদান রাখতে চাই।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.