বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবসে মুখ গহ্বরের যতেœ সচেতনতা

ডা: মো: আসাফুজ্জোহা রাজ

সারা বিশ্বে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা ভয়াবহ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ডায়াবেটিস টাইপ২-এর কারণ হিসেবে জীবনযাত্রার মান ও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনকে দায়ী করছেন চিকিৎসা গবেষকেরা। ১৪ নভেম্বর বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস, ডায়াবেটিক রোগীদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে দিনটির তাৎপর্য গুরুত্বপূর্ণ, ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিস ফেডারেশন এবার দিনটিতে মহিলাদের সচেতনতার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন, তাদের সূত্র মতে প্রতি দশজন মহিলার একজন আর প্রতি সাতজনে একজন গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, দুঃখজনক হচ্ছে এদের অনেকেই এই রোগ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখেন না। গ্লোবালি বছরে প্রায় ২.১ মিলিয়ন মানুষ ডায়াবেটিক জটিলতায় মারা যায় অর্থাৎ প্রতি ছয় সেকেন্ডে একজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ছোটবেলা থেকে পর্যাপ্ত সাবধানতা ডায়াবেটিস টাইপ২ কে প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত রোধ করতে পারে। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য 'ACT TODAY TO CHANGE TOMORROW' ডায়াবেটিক রোগীরা তাদের চোখ, পা, কিডনি, নার্ভ বা হার্ট নিয়ে যতটা সচেতন, মুখ বা দাঁত নিয়ে তেমনটা দেখা যায় না। স্পষ্ট জ্ঞানের অভাবেই হয়তো এমনটা হয়ে থাকে। পর্যাপ্ত প্রচারের অভাবে হয়তো আমরা জানি না বা জানলেও মানি না যে, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস শরীরের যেকোনো অঙ্গকে ক্ষতি করতে পারে।
ডায়াবেটিক রোগীদের মুখে সাধারণত যে পরিবর্তনগুলো হতে পারে :
শুষ্ক মুখ গহ্বর
লালা নিঃসরণ কম হওয়ায় মুখ শুষ্ক থাকে, ফলে লালার স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হয়। স্বাভাবিক লালার মধ্যে প্রচুর পানি থাকে বলে মুখের ধৌতকাজে সহায়ক হয়, পাশাপাশি অনেক জীবাণু ধ্বংসকারী উপাদানও থাকে, ফলে দাঁতে গর্ত ও মাড়ি রোগ তৈরিতে প্রতিকুল পরিবেশের সৃষ্টি হয়। শুধু তাই নয়, শুষ্ক মুখগহ্বরে খাদ্য কে ভাঙতে, গলাধঃকরণ করতে, স্বাদ গ্রহণে নানা অসুবিধা করে। শুষ্ক মুখে জিহ্বা, মাড়ি, তালু, চোয়ালের ভেতরের অংশে নানা ধরনের ঘা হতে পারে, বিশেষ করে ছত্রাকজনিত আলসার। মুখের মধ্যে ব্যথা বা পুড়ে যাওয়া অনুভূতি হতে পারে, মুখে দুর্গন্ধের সৃষ্টি করতে পারে।
মাড়ি সরে গিয়ে দাঁতের শিকড় উন্মুক্ত হয়ে শিনশিন অনুভূতি হতে পারে।
করণীয় কিডনির কার্যকারিতা ঠিক থাকলে পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে, চিনিমুক্ত চুইংগাম লালা নিঃসরণ বাড়াতে পারে, ডেন্টাল চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
লালাতে অধিক সুগার : অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসে রক্তের পাশাপাশি নিঃসৃত লালাতেও অধিক শর্করা থাকে, যেটা মুখের অভ্যন্তরে রোগ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে, বিশেষ করে দাঁতে গর্ত ও মাড়ি রোগ।
স্বাভাবিক মানুষের চেয়ে ডায়াবেটিক রোগীর মাড়ি ও দাঁত আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা সর্বাধিক।
করণীয় : সর্বদা রক্তে সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সর্বাধিক সচেষ্ট হতে হবে।
রক্তনালী মোটা ও স্থিতিস্থাপকতা কমে যাওয়া
ডায়াবেটিস রোগীদের খত বা ঘা সহজে ভালো না হওয়ার অন্যতম কারণ রক্তবাহিকার মাধ্যমে রক্তনালী থেকে পর্যাপ্ত পুষ্টি, অক্সিজেন ও রোগ প্রতিরোধক শরীরের নিজস্ব গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলো স্বাভাবিকভাবে আক্রান্ত স্থানে পৌঁছাতে পারে না। ফলে অন্যান্য ঘায়ের পাশাপাশি মাড়ির রোগও ভালো হওয়ার পরিবর্তে বাড়তে শুরু করে।
করণীয় : কোথাও কেটে গেলে বা রক্ত বের হলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট বিষয়ের চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
৪. দীর্ঘমেয়াদি মাড়ি রোগের জটিলতা
চিকিৎসা গবেষকেরা বিভিন্ন গবেষণায় মাড়ি রোগ থেকে শরীরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের রোগের যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন, বিশেষ করে হার্ট ও স্ট্রোকের। ব্যাখ্যা দিচ্ছেন ব্রাশের সময় বা যেকোনো কারণে মাড়ি দিয়ে রক্তপাত হলে জীবাণু বা সংক্রমণ সহজেই রক্তবাহিকাতে মিশে শরীরের যেকোনো স্থানে পৌঁছে যেতে পারে। মাড়ি রোগ দাঁতের ধারক কলাকে নষ্ট করে দাঁত নড়িয়ে দিতে পারে।
গবেষণায় আরো বলা হচ্ছে, মাড়ি রোগ ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমিয়ে রক্তে সুগারের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে।
সুতরাং ডায়াবেটিসে মুখের যতেœ সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।
করণীয় : মাড়ি রোগ বা দাঁতে ব্যথা নিয়ে অবহেলার কোনো সুযোগ নেই, রোগের কারণ নিশ্চিত না হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হতে পারে। কোনো ধরনের অস্বাভাবিকতা অনুভব হলে, ঘা হলে বা দাঁতের ভাঙা অংশে মুখে ঘষা লাগলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
অতি জরুরি : রক্তে সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে যথারীতি সুগারের মাত্রা পর্যবেক্ষণ। ডাক্তারের পরামর্শ মতো ওষুধ সেবন, নিয়মিত দৈহিক ব্যায়াম, খাদ্যতালিকা অনুসরণ, ওজন নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান বর্জনসহ উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ ও কিডনির স্বাস্থ্য রক্ষায় সচেতন হতে হবে।
২. নিয়মিত ও নিয়মানুযায়ী দাঁতের সব পৃষ্ঠ মানসম্মত নরম টুথ ব্রাশ ও পেস্ট দিয়ে পরিষ্কার, দুই দাঁতের মধ্যবর্তী স্থানে বাজারজাত ডেন্টাল ফ্লস ব্যবহার, জিহ্বা পরিষ্কার, মাড়ি ম্যাসাজ ও প্রয়োজন পড়লে জীবাণুনাশক মাউথওয়াশ ব্যবহার।
৪. ডায়াবেটিসজনিত জটিলতা এড়াতে শুধু সমস্যা অনুভব হলে নয়, এমনিতেই ছয় মাস পর পর রক্তের ঐনঅ১ঈ সহ সকালে খালিপেটে ও নাস্তার দুই ঘণ্টা পর সুগারের মাত্রা জেনে রেজিস্টার্ড ডেন্টাল চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে সমগ্র বিশ্ব জোরালো তাগিদ দেয়। এতে করে মুখের প্রায় সব ধরনের জটিলতা এড়ানো সম্ভব।
মনে রাখতে হবে ডায়াবেটিস একটি জটিল রোগ। তবে এই রোগকে নিয়ন্ত্রণে রেখে সুস্থ থাকা সম্ভব সঠিক জ্ঞান ও তার অনুশীলন আর সুশৃঙ্খল জীবনযাপনের মাধ্যমে।

লেখক : রাজ ডেন্টাল সেন্টার ও রাজ ডেন্টাল ওয়ার্ল্ড

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.