বৈরুতে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে রোহিঙ্গাদের প্রতি সংহতি

এ কে এম বদরুদ্দোজা

ষাটের দশকে শুনতাম বৈরুত হানাহানি রক্তপাতের শহর। জর্ডান থেকে আসা ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তুরা ঠাঁই নেয় লেবাননের রাজধানী বৈরুত ও অন্যান্য এলাকায়। সে সময় শাতিলা শাওবরা উদ্বাস্তু শিবিরে বিমান হামলার জন্য ইসরাইল নিন্দিত হয়। নব্বইয়ের দশকে ইসরাইলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের একটা বড় অংশ দখল করে নেয়। তার বিরুদ্ধে গড়ে উঠে তীব্র প্রতিরোধ। লেবাননি যুবকদের সংগ্রামী কাফেলা হিজবুল্লাহ জায়নবাদী আগ্রাসনকে পরাস্ত করে। ১৯৮৫ সালে ইসরাইল দক্ষিণ লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়। তদানীন্তন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী স্বীকার করেন, এটি তাদের ইতিহাসে পিছু হটার প্রথম নজির এবং একই সাথে নিঃশর্ত সেনা প্রত্যাহার। ইসরাইলি বাহিনী প্রতিরোধের স্পৃহায় ২০০৬ সালে আবারো ঢুকে পড়ে দক্ষিণ লেবাননে। এবারো প্রচণ্ড প্রতিরোধ গড়ে তোলে হিজবুল্লাহ। তাদের নেতা হাসান নসরুল্লাহ বিশ্ব মিডিয়ার নজর কেড়ে নেন। পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে আবার পিছু হটে ইসরাইল। মুক্ত হয় দক্ষিণ লেবানন। ১৯৬৭ ও ১৯৭৩ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধে জয়ী হয়েছিল ইসরাইল। পরাজয়ের কোনো গ্লানি তাদের ছিল না। তারা নিজেদের জন্য ‘অজেয়’ অভিধা অর্জন করেছিল। দক্ষিণ লেবাননে পশ্চাদপসারণে তাদের সেই দর্প চূর্ণ হয়। পরে গাজায় হামাসের হাতেও পরাজয়ের স্বাদ পেয়েছে ইসরাইল। দক্ষিণ লেবাননের সেই সব রণাঙ্গন দেখার একটা সুযোগ ঘটে এবার ৩ নভেম্বর। লেবাননের রাজধানী বৈরুতে আয়োজিত প্রতিরোধ সম্মেলনে যোগ দিতে ৩১ অক্টোবর বৈরুতে যাই। আয়োজক সংস্থা ‘ইউনিয়ন অব রেজিস্ট্যান্স স্কলার্স’। এর সেক্রেটারি জেনারেল শেখ মাহের মোহাম্মদ, যিনি আরব বিশ্বে স্বনামধন্য একজন পণ্ডিত এবং দক্ষ সংগঠক। এবারের সম্মেলনটি ছিল প্রতিবাদী পণ্ডিতদের দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলন। ১-২ নভেম্বর অনুষ্ঠিত সম্মেলনে এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা ও আরব বিশ্বের প্রায় ৫০টি মুসলিম দেশের দুই শতাধিক শিক্ষাবিদ, লেখক, আলেম ও গবেষক অংশ নেন। সবাই মিলে ৩ নভেম্বর দক্ষিণ লেবাননে প্রতিরোধযুদ্ধের বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন ঘুরে দেখেন। সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘বেলফোর ঘোষণা’র শতবর্ষ পূর্তির প্রেক্ষাপটে ইসরাইলবিরোধী প্রতিরোধ আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করা। উল্লেখ্য, ২ নভেম্বর ২০১৭ সালে তদানীন্তন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেলফোর মধ্যপ্রাচ্যে একটি ইহুদি অধ্যুষিত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। সেই ঘোষণার জের ধরে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ইহুদিদের নিয়ে এসে ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনিদের নিজ ভূমিতে ‘মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোঁড়া’ ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ইহুদিরা ইসরাইলের ভূমিপুত্র নয়। তারা উড়ে এসে জুড়ে বসে ফিলিস্তিনিদের বাসভূমিতে। ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে ইসরাইল দখল করে নেয় মুসলমানদের আবেগের শহর জেরুসালেম। এই শহরে তাদের প্রথম কেবলা পবিত্র আল-কুদস তথা বায়তুল মোকাদ্দাস অবস্থিত। আজ সেখানে মুসলমানদের যাতায়াত নিয়ন্ত্রিত। বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা ইসরাইলবিরোধী প্রতিরোধ আন্দোলন আরো বেগবান এবং আল-কুদস মুক্ত করার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তারা মাজহাবি বিরোধ ভুলে গিয়ে ফিলিস্তিন ও আল-কুদসের মুক্তির প্রশ্নে মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান এবং ইহুদি নিয়ন্ত্রিত বিশ্ব মিডিয়ার অপপ্রচারের বিরুদ্ধে মুসলিম বিশ্বে শক্তিশালী মিডিয়া প্রতিষ্ঠার ওপরও জোর দেন। তা ছাড়া মুসলিম শিশুদের কারিকুলামে ফিলিস্তিন ও আল-কুদসের মুক্তির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন। 

সম্মেলনে আমি ছিলাম বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিনিধি; যদিও বেশির ভাগ দেশেরই কমপক্ষে তিনজন করে প্রতিনিধি অংশ নেন। দ্বিতীয় দিনের প্রথম অধিবেশনে রাখাইনে রোহিঙ্গা নিধন, পূর্বাপর ১০ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিমের শরণার্থী হিসেবে বাংলাদেশে অবস্থান, চীন, ভারত ও রাশিয়ার মিয়ানমারকে সমর্থন এবং মুসলিম বিশ্ব থেকে কেবল মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ ও তুরস্কের রোহিঙ্গা মুসলিমদের পক্ষে জোরালো অবস্থান গ্রহণের কথা জানাই। প্রতিনিধিরা আমার কাছে জানতে চান, এর সমাধান কী? জবাবে বলেছি, মুসলিম বিশ্বের ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদই মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। প্রতি বছর মিয়ানমারের বহু নাগরিক নানা কাজ নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মুসলিম দেশে যাচ্ছে ও তাদের কর্মসংস্থান হচ্ছে। এরা মূলত বৌদ্ধধর্মাবলম্বী। এসব মুসলিম দেশ যদি নতুন কোনো মিয়ানমার নাগরিককে চাকরি দেবে না বলে ঘোষণা দেয়, তা হলে মিয়ানমার সরকার নতজানু হয়ে সমস্যাটি সমাধানের চেষ্টা করবে। সম্মেলনে আগত আফ্রিকার দেশগুলোর প্রতিনিধিরা এ বিষয়ে জোরালো প্রতিবাদ জানান। তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার প্রতিনিধিরাও ছিলেন উচ্চকণ্ঠ। সম্মেলনের চূড়ান্ত ঘোষণায় রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও বৌদ্ধ ভিক্ষুদের নেতৃত্বে হামলা, হত্যা, ধর্ষণ, তাদের বাড়িঘর লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ, সম্প্রতি ছয় লাখ রোহিঙ্গা মুসলিমকে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য এবং তাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করার তীব্র নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে তাদের সসম্মানে নিজ ভূমিতে ফিরিয়ে নেয়ার আহ্বান জানানো হয়। চূড়ান্ত ঘোষণাপত্র উপস্থাপনের সময় ইরানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা: আলী আকবর বেলায়েতি বিষয়টির ওপর সজাগ দৃষ্টি রেখে সোচ্চার প্রতিবাদের আহ্বান জানান। সমাপনী ভাষণে সেক্রেটারি জেনারেল শেখ মাহের মোহাম্মদও মজলুম রোহিঙ্গা মুসলিম ভাইদের পাশে দাঁড়ানোর উদাত্ত আহ্বান জানান।

সুদূর রুয়ান্ডা থেকে আগত একজন প্রতিনিধি আমার সাথে ব্যক্তিগতভাবে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে বিশদ কথা বলেন। তিনি সম্ভব হলে তার দেশ সফরেরও আমন্ত্রণ জানান। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, দক্ষিণ আফ্রিকা, সুদান ও ফিলিস্তিনের প্রতিনিধিদের সাথেও কথা হয়। তারা রাখাইনে ব্যাপক মুসলিম নিধন, ধর্ষণ এবং তাদের বাস্তুচ্যুত করায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তারা পূর্বাপর ১০ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিমকে আশ্রয় দেয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকার ও জনগণকে ধন্যবাদ জানান। তাদের সাথে কথা বলতে গিয়ে নানা প্রশ্নেরও সম্মুখীন হয়েছি। জবাবে বলেছি, বাংলাদেশের রাজনীতিতে নানা রকম মেরুকরণ আছে। কিন্তু ফিলিস্তিন ও রোহিঙ্গা মুসলিম ইস্যুতে গোটা জাতি ঐক্যবদ্ধ। মুসলিম বিশ্বও এই দুই ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মিয়ানমারের ওপর প্রকৃত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সাথে কথা বলে অনুধাবন করেছি, রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমাদের কূটনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মুসলিমবিশ্ব; বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো। তারা মিয়ানমারের বিপুল নাগরিকের কর্মসংস্থান করেছে ও করছে। এসব দেশ চাপ দিলে মিয়ানমার বিপাকে পড়বে। পাশাপাশি রোহিঙ্গা মুসলিম নিধন, ধর্ষণ ও বাস্তুচ্যুতির বিরুদ্ধে বিশ্বের সর্বত্র প্রতিবাদ উচ্চকিত করা বাঞ্ছনীয়। সে জন্য কূটনৈতিক পর্যায়ে প্রতিটি মুসলিম দেশকে সমস্যাটি সম্পর্কে অবহিত করা প্রয়োজন। মুসলিম উম্মাহ মিয়ানমারের প্রকৃত স্বরূপ জানতে পারলে অবশ্যই রোহিঙ্গা মুসলিমদের পাশে দাঁড়াবে। রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠী নেতৃত্বহীন। তাদের স্বার্থ সমুন্নত করার জন্য নিজেদের কোনো সংগঠনও নেই। এ অবস্থায় সমস্যার প্রত্যক্ষ শিকার বাংলাদেশকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। বাংলাদেশের সরকার ও জনগণ কার্যত সেই দায়িত্ব পালন করছে। দলমত নির্বিশেষে সবাই তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু নিছক আশ্রয় ও খাবারের সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। অতীতে মিয়ানমার চুক্তি করেও তা পালন করেনি। ইদানীং যৌথ ওয়ার্কিং গ্র“প গঠনের নামে কালক্ষেপণ করছে। ওদিকে সীমান্তে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ঢল থামেনি। প্রতিদিনই কয়েক হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। মিয়ানমার বিশ্ব জনমতকে তোয়াক্কা করছে না। অক্সফোর্ড থেকে প্রতিকৃতি সরানোর পরও অং সান সু চির বোধোদয় হয়নি। তিনি ক্ষমতার জন্য মানবতাকে পদদলিত করছেন। তাই মিয়ানমারকে প্রকৃত ও কার্যকর চাপ দিয়ে সমস্যার সমাধানে বাধ্য করতে হবে। মুসলিম বিশ্ব জেগে উঠলে, বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো কঠোর অবস্থান নিলে মিয়ানমার সমস্যা সমাধানের পথে অগ্রসর হতে বাধ্য হবে।

লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.