শান্তিবাদী নেত্রী এবং বৌদ্ধভিক্ষুদের ‘অহিংস’ নীতি
শান্তিবাদী নেত্রী এবং বৌদ্ধভিক্ষুদের ‘অহিংস’ নীতি

শান্তিবাদী নেত্রী এবং বৌদ্ধভিক্ষুদের ‘অহিংস’ নীতি

সাইয়্যেদা সুরাইয়া

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলছে গণহত্যা। সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের সাথে যে বর্বর পৈশাচিক আচরণ নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অং সান সু চির সরকার করছে, তার তুলনা করা যায় এমন নরপশু কতক এখানো আছে- যারা মনুষত্বের নামাবলি গায়ে জড়ালেও মূলত তারা পশুর মতো নিম্নস্তরের জীব। মিয়ানমার নেত্রীর নীরবতা প্রমাণ করে তিনি জঘন্য মানসিকতাসম্পন্ন নারী। নারীত্বের নমনীয়তা, কোমলতা আর মমত্ববোধ মনে হয় তাকে কোনো সময়ই স্পর্শ করেনি! সামরিক জান্তার কথা এখন না হয় বাদই থাক। সু চির গৃহবন্দীর সময় জান্তা মুসলিম নিধনে এতটা তৎপর ছিল না, যতটা গণতন্ত্রের মানসকন্যার তার দেশের জনগণের অধিকার আদায় করার ছদ্ম আবরণে মুসলিম নিধনের সঙ্ঘাতকে উসকে দিয়েছে। চেঙ্গিস-হালকু খানের জামানার বর্বরতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে অহিংস পরমধর্মে বিশ্বাসী বৌদ্ধভিক্ষু আর সামরিক বাহিনীর স্বৈরশিখণ্ডীরা। আমরা হতবাক হচ্ছি যে, মায়ের জাতির মন এতটা অমানবিক হয় কেমন করে? ভাবতে কষ্ট হয়, অং সান সু চি এমন একজন নারী, যার হৃদয় বলতে নেই! যেখানে তার জাতি মায়ের কোল থেকে তার শিশুকে কেড়ে নিয়ে শিশুদের পেট চিরে নাড়িভুঁড়ি বের করছে, পানিতে নিক্ষেপ করছে, আগুনে পোড়ানো হচ্ছে, সেখানে এই নারীর কাছে এমন মানসিকতা আশা করা যায় না!

গত ৯ সেপ্টেম্বর দৈনিক নয়া দিগন্তে মগের মুল্লুকের মগদস্যুদের তুলাতলির গণহত্যার বিবরণ দিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকা অবলম্বনে। লিখেছেন অলিভার হলমেস, ভাষান্তর আহমদ বায়েজীদ। পত্রিকাটি নিশ্চয়ই মিথ্যা কাদা ছিটায়নি! কলমের সাধ্য নেই এসব বিবরণ ভাষায় প্রকাশ করে। এরা সভ্য পৃথিবীর মানুষখেকো অসভ্য প্রাণী। ওদের আচরণ তো তাই প্রমাণ করে। হায় আল্লাহ, এরা কি তোমারই সৃষ্ট জীব? এরা মানুষ নামের প্রজাতির মধ্যে পড়তে পারে কি? পশুদের কাতারের ওদের রাখা হলে, বনের পশুদেরও অপমান করা হবে। পশুরাও ওদের মতো এতটা হিংস্র আর মমত্ববোধহীন নয়। সু চির বন্যতন্ত্র এতটাই অমানবিক যে, প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা যেন তাদের জন্মভূমিতে আর ফেরত যেতে না পারে তার জন্য সু চির দেশের বর্বর সামরিক বাহিনী বর্ডারে ব্যবহার করছে স্থলমাইন। এই স্থলমাইনের বিস্ফোরণে ৯ সেপ্টেম্বর তিনজন রোহিঙ্গা মুসলিম মৃত্যুবরণ করেছে। আমাদের জানা মতে, এমনি ধরনের হিংস্রতার শিকার হয়েছেন বহু রোহিঙ্গা নর-নারী। প্রতিদিনের পত্রিকার পাতা আর টেলিভিশনের পর্দায় এমন অনেক খবরই মুহূর্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে বিশ্ববাসী প্রতিনিয়ত এ গণহত্যার খবর পাচ্ছে। আমরা অবাক হচ্ছি- জাতিসঙ্ঘ আশ্রয়হীন, জীবনের নিরাপত্তাহীন, লাখ লাখ রোহিঙ্গা মুসলমানদের জন্য এখনো কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না। মানবাধিকারের মানবিকতা কি মুসলমানদের বেলায় শুধু মৌখিক ও লৌকিকতার আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ?

কবির ভাষায় প্রশ্ন রাখছি মানবাধিকারবাদীদের কাছে- ‘তোমার হাতে মণ্ডামিঠাই আমার হাতে কী? সেই কথাটি বলতে হবে জানতে এসেছি।’ আজ আমরাও জানতে চাই বিশ্ব মুসলিমদের প্রতি জাতিসঙ্ঘের এমনি ধরনের অবিচারের হেতু কী? কল্পনা করা যাক, আজ যদি মিয়ানমারে বর্বর অহিংসবাদীদের বৌদ্ধদের স্থানে রোহিঙ্গা মুসলমানেরা হতো তাহলে দৃশ্যপটে কাদের দেখা যেত? তাৎক্ষণিকভাবে মানবাধিকারের দাবিনামা নিয়ে হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বিশ্বমোড়লেরা উড়ে আসত টনকে টন বোমা নিয়ে।

তার আগেই কিন্তু বাণিজ্যিক অবরোধ আরোপ করা হতো? যুদ্ধাপরাধের লাল তকমাটাও তৈরি হয়ে যেত ঘটনা ঘটার সাথে সাথে। বিশ্বরাজনীতির রঙ্গমঞ্চে বারবার এমন দৃশ্যই অভিনীত হয়েছে আর এমনটিই আমরা হতে দেখেছি। লোকসভার স্পিকার সুমিত্রা মহাজনের নেতৃত্বে ইন্দোনিশিয়ার ‘ওয়ার্ল্ড পার্লামেন্টারি অন সাসটেইন্যাবল ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নিয়েছে ভারত। ওই সম্মেলনে বালি ঘোষণাপত্র গৃহীত হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার বালি ঘোষণাপত্রে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। তবে এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে ভারত। রাখাইনে দ্বিতীয়বারের মতো যে সহিংস ঘটনা ঘটছে তা যথার্থ নয় বলে ভারত ওই ঘোষণাপত্র থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে। (দৈনিক নয়া দিগন্ত ৯ সেপ্টেম্বর) ভারত কেন এ পদক্ষেপ নিয়েছে বিষয়টি খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা নিশ্চয় নেই। কারণ, এরা নিজেরাই তো মিয়ানমারের বৌদ্ধভিক্ষুদের অহিংস নীতির ধারক এবং একই সাথে উৎপীড়ক। গুজরাট এবং চলমান সময়ের সহিংস আচরণের অন্যতম মডেল রক্তের ভূস্বর্গ কাশ্মির। ভারতের কাছে এর চেয়ে ভালো কোন ধরনের মানবিকতা আশা করা যেতে পারে? চলমান বিশ্বে ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি সময়ের প্রেক্ষাপটে বেড়েছে সহিংসতা-হিংস্রতা। আর এ জন্য দায়ী মুসলিম জাতির লোকেরাই। কারণ পবিত্র আল কুরআন বলছে, যে জাতি নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করে না, আল্লাহ সে জাতিকে সাহায্য করেন না। বর্তমানে ইসলামি বিশ্বের আনাচেকানাচে বারুদের গন্ধ। ইথারে ভেসে আসে মানবতার হাহাকার। এ জাতি নিজেরাই নিজেদের পেছন থেকে ছুরি মেরে রক্তের নহর বয়ে দিচ্ছে। ক্ষমতার তখততাউস থেকে এক ইঞ্চি পিছু হটতেও নেতারা নারাজ। তাহলে ধ্বংস কাদের জন্য অপেক্ষা করবে? আক্ষেপ শত আক্ষেপ আমাদের জন্য যে, রাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্তে সাধারণ মানুষ হচ্ছেন নেতাদের স্বার্থের বলি। আবার কেউ কেউ মুসলিম নাম ব্যবহার করে জাতির খয়ের খা সেজে; বোমা মেরে নিরীহ মানুষ হত্যা করছে, যাতে মুসলিম জাতির ঘারে সন্ত্রাসের অপবাদ আরোপ করা যায়। শান্তির ধর্ম ইসলাম আজ পণবন্দী হয়ে মক্কা-মদিনায় আশ্রয় খুঁজে নিচ্ছে। কিন্তু সেই ইসলামের আঁচলেও আজ আগুন লেগেছে।
বিশ্বধর্মের মর্যাদা এ জাতির লোকেরাই স্বীয় স্বার্থে বিসর্জন দিচ্ছে। গৌরবময় ঐতিহ্যবাহী একটি জাতি নিজেদের ভাগ্যের ফায়সালা আজ তাদের হাতে ন্যস্ত করছে, যারা এ জাতিকে আদতেই মাথা তুলে দাঁড়াতে দিতে চায় না। জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ক্ষমতা নিয়ে চীন মিয়ানমারকে সাহস আর ইন্ধন দিয়ে যাচ্ছে। বৌদ্ধধর্মের অহিংস নীতির ছায়াতলে থেকে সহিংস আচরণের মাধ্যমে রোহিঙ্গা মুসলমানদের জাতিগত নির্মূল অভিযানের প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। এরই নাম সমাজতন্ত্র। সমাজতান্ত্রিক রাশিয়াও চীনের মিত্র এবং সমর্থক।

শুধু মুসলমান হওয়ার কারণেই এই জঘন্য গণহত্যাকারীদের বিরুদ্ধে চীন-রাশিয়ার কোনো বিকার নেই। যেহেতু নির্যাতিতরা মুসলিম আর নির্যাতকেরা বৌদ্ধ, তাই ওরা মুসলিম গণহত্যার বৈধতা পেতে পারে। কী চমৎকার অহিংস নীতির ধারকদের তত্ত্বীয় এবং নীতিগত আচরণের অনন্য উদাহরণ! পিকিংপন্থী আর মস্কোপন্থী কমিউনিজমের উদারনৈতিক সমর্থক মুসলমানেরা ‘ইসলামের’ প্রতি দৃষ্টির সঙ্কীর্ণতা এবং আচ্ছন্নতা এবার দূর করুন। পরিচ্ছন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিশ্বের দিকে তাকান। আত্মমর্যাদা আর আত্মসম্মানবোধ যদি মুসলমানদের থেকে থাকে তাহলে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ভুলে যান। মুসলিম জাতির সর্বনাশের পথ যে রক্তপিচ্ছিল পথ ধরে জনতার মিছিল, স্পেন ট্র্যাজেডি, পলাশী আর মহীশূর ট্র্যাজেডিতে রক্তে লাল হয়েছিল সেটি হচ্ছে- ক্ষমতার লোভ আর অনৈক্য। ঐক্যবদ্ধ মুসলিম জাতি একদা উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বিশ্বের বুকে সর্বপ্রথম এনেছিল মনুষত্বের বিজয়। এই বীরের জাতির এমন করুণ পরিণতি কিভাবে কেমন করে মেনে নেয়া যায়?

দেরিতে হলেও রোহিঙ্গা ইস্যুতে বোধোদয় হয়েছে ভারতের। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নাকি মুখ খুলেছেন। আমরা আশাবাদী নিজ দেশের নিপীড়িত কাশ্মিরি জনগণের অধিকারের প্রতিও নরেন্দ্র মোদি লক্ষ আরোপ করবেন। আজ মিয়ানমার নেত্রী অং সান সু চি কাশ্মিরের সাথে ভারতের দমনপীড়ন অভিযানকে তাদের দেশের বৌদ্ধভিক্ষু আর সামরিক বাহিনীর রোহিঙ্গা মুসলমানদের জাতিগত নির্মূল অভিযানকে একই অভিধায় অভিহিত করছেন। এ পৃথিবীতে প্রতিটি জাতিরই রয়েছে জন্মগত রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অধিকার।

জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার সনদে এ স্বীকৃতি রয়েছে। আমরা আশা করছি, নির্যাতিত-নিপীড়িত রোহিঙ্গা মুসলমানেরা তাদের নিরাপত্তার প্রয়োজনে একটি আলাদা আবাসভূমি পাবে। বিশ্বনেতারা এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিশ্চয়ই নেবেন। ওরা যে দেশটির বৈধ নাগরিক সে দেশটিতেই নিরাপদ আবাসভূমি পাবে বলে আশা রাখি। 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.