ট্রাম্পের এশিয়া সফরের হিসাব-নিকাশ

আহমেদ বায়েজীদ

এশিয়া সফরে রয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ১২ দিনের সফরকালে পূর্ব এশিয়ার পাঁচটি দেশে যাবেন তিনি। জাপান থেকে শুরু হওয়া সফর পর্যায়ক্রমে দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন দিয়ে শেষ হবে। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের সফরটিকে বিবেচনা করা হচ্ছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে। কয়েকটি কারণে সফরটি গুরুত্ব বহন করছে তার মধ্যে রয়েছে উত্তর কোরিয়া নিয়ে সাম্প্রতিক উত্তেজনা, চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং পূর্ব এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন এই সফর দিয়েই বোঝা যাবে উত্তর কোরিয়ার সাথে হুমকি পাল্টা-হুমকির যে খেলা বর্তমানে চলছে তার পরিণতি কী হতে পারে এবং পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো চীনের আধিপত্য মোকাবেলায়া যুক্তরাষ্ট্রকে কতটা কাছে পাবে। আবার কেউ কেউ বলছেন, এই সফরটি ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্যও চ্যালেঞ্জিং। এই সফরে যেমন তার কূটনৈতিক দক্ষতার বড় পরীক্ষা হবে তেমনি বোঝা যাবে বাণিজ্যযুদ্ধে চীনকে মোকাবেলা করতে আসলে তিনি কতটা শক্তিশালী হতে পারবেন। আর সর্বোপরি এশিয়া অঞ্চলে জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি কী হবে তা বোঝা যাবে ট্রাম্পের এই সফরের মধ্য দিয়েই।
নিজ প্রশাসনে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা রেখেই দীর্ঘ সফরে বের হয়েছেন ট্রাম্প। রুশ সংযোগ নিয়ে চলছে তদন্ত, টেক্সাসের গির্জায় হয়েছে বন্দুক হামলা আর ট্যাক্স কমানোর বিষয়টি নিয়ে চলছে জোর বিতর্ক। ট্রাম্পের সমর্থকেরা বলছেন, সফরের কয়টা দিন ট্রাম্পকে অন্তত এই ঝামেলাগুলো নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে না। তবে তার সমালোচকদের ভাবনা অন্য রকম। নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রশাসনের বাইরের একজন উপদেষ্টা তো বলেই দিয়েছেন, ‘এশিয়া সফর তার ট্যাক্স হ্রাস পরিকল্পনা বাস্তাবায়ন কিংবা পরবর্তী নির্বাচনে জিততে সহায়তা করবে না।’ তবে এসব সমালোচনা সত্ত্বেও ট্রাম্প কিংবা তার প্রশাসনের কাছে এই সফর যে কতটা গুরুত্ব বহন করে তা বোঝার জন্য একটি উদাহরণই যথেষ্টÑ সফর শুরু হওয়ার এক দিন পর ১১ দিনের সফরের সময়সীমা বেড়ে ১২ দিন হয়েছে। কারণটা কূটনৈতিক। ফিলিপাইনে পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো একটি সম্মেলনে যোগ দিতেই ট্রাম্পের সফরসূচিতে এই পরিবর্তন। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মিত্র দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি ও বাণিজ্য যুদ্ধে চীনকে মোকাবেলার জন্য সাবেক প্রেসিডন্ট বারাক ওবামা করেছিলেন ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ চুক্তি(টিপিপি)। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর এই চুক্তি থেকে বের হয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র। এর ফলে এই অঞ্চলের দেশগুলো তাদের বাণিজ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সহযোগিতার বিষয়ে হতাশ হয়ে পড়েছে। ফিলিপাইনের সম্মেলনে যোগদানের বিষয়টিকে ট্রাম্প প্রশাসন বিশেষ গুরুত্ব দেয়ায় ধারণা করা হচ্ছে ট্রাম্প হয়তো এ বিষয়ে নতুন কোনো পন্থা অবলম্বন করবেন। আবার অনেক মার্কিন বিশ্লেষক মনে করছেন, এই সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র উপস্থিত না থাকলে অঞ্চলটিতে তাদের প্রভাব খর্ব হতে পারে সে কারণেই ট্রাম্প সিদ্ধান্ত পাল্টেছেন। নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ট্রাম্প সম্মেলনটি বর্জন করলে এশিয়া অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ প্রশ্নবিদ্ধ হতো। তা ছাড়া অনেক দিন ধরেই টিপিপির দেশগুলো চাইছে এই চুক্তির বিকল্প কোনো বাণিজ্যচুক্তি বা সমঝোতা। এবার ট্রাম্প এ বিষয়ে কোনো নতুন ঘোষণা দেন কি না সেটি দেখার বিষয়। পূর্ব এশিয়ার যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সমর্থন বৃদ্ধির বিষয়টিও জড়িত আছে এই সফরের সাথে। উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে বিশ্ববাসীকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ দিনের। এই সফরে কিম জং উনের দেশের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করার একটি প্রয়াশ চালাবেন ট্রাম্প। ওয়াশিংটন পোস্টের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, এই সফরে ট্রাম্পের উপদেষ্টারা তিনটি গাইডলাইন তৈরি করেছেন। প্রথমত, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক হুমকির বিষয়ে কঠোর অবস্থান, দ্বিতীয়ত উন্মুক্ত ও মুক্ত প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রতিশ্রুতি এবং তৃতীয়ত এশিয়ার অংশীদারদের সাথে সম্পর্ক জোরদার করা।
চীনে সাথে ট্রাম্পের বোঝাপড়াটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ট্রাম্পের চীন সফরের বিষয়টিকে ভাবা হচ্ছে ‘রাষ্ট্রীয় সফরের চেয়েও বেশি কিছু’ হিসেবে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিংÑ বর্তমান বিশ্বের এই দুই শক্তিধর নেতা এমন দু’টি দেশের প্রেসিডেন্ট যার একটি অনেক দিন ধরেই একক পরাশক্তি, আর অন্যটি দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি ও সামরিক শক্তির দেশ। কাজেই দুই নেতার বৈঠকে কে কী আদায় করে নিতে পারবেন সেটি নিয়ে সবার আগ্রহ রয়েছে। ট্রাম্পের প্রচেষ্টা থাকবে উত্তর কোরিয়ার ওপর আরো বেশি চাপ প্রয়োগে শি জিনপিংকে রাজি করানো। এই বিষয়টি শি জিনপিংয়ের সাথে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আলোচনার মূল অ্যাজেন্ডা হতে পারে বলে মনে করেন চীনের গবেষণা প্রতিষ্ঠান চায়না বেইজবুকের প্রধান নির্বাহী লেল্যান্ড মিলার। তার মতে ‘ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা মনে করে উত্তর কোরিয়া নিয়ে সঙ্কট সমাধান করতে চীন সহায়তা করবে।’ এ ক্ষেত্রে দর কষাকষিতে ট্রাম্প কিছুটা এগিয়ে থাকবেন, কারণ চীন কখনোই চাইবে না কোরীয় উপদ্বীপে আরেকটি যুদ্ধ হোক। সেটি তাদের সীমান্তে উদ্বাস্তুর ঢল নামাতে পারে। আবার বাড়ির কাছে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর পদচারণা হোক সেটিও চাইবে না বেইজিং। আরেকটি দিকে এগিয়ে থাকবেন শি। ট্রাম্প যেমন তার নিজের প্রশাসনে বিভিন্ন বিষয়ে বিরোধিতার মুখোমুখি হচ্ছেন, শির ক্ষেত্রে সেটি নেই বললেই চলে। এর বাইরে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে ট্রাম্প চীনের বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক আগ্রাসন, তার দেশের বাজার নষ্ট করা, মুদ্রাবাজারে কারসাজিসহ যেসব অভিযোগ করে আসছেন সেগুলো নিয়ে দরকষাকষি হতে পারে।
তবে সব কিছু ছাপিয়ে এই সফরে ঘুরেফিরে উত্তর কোরিয়ার প্রসঙ্গটিই সামনে আসবে। সেটা জাপান হোক কিংবা ফিলিপাইন। ইতোমধ্যে জাপানে দেয়া এক বক্তৃতায় উত্তর কোরিয়াকে পরোক্ষভাবে হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। দক্ষিণ কোরিয়া, চীন সর্বত্রই তার কর্মসূচির উপরের দিকে এই ইস্যুটি থাকবে।
শেষ পর্যন্ত কোরিয়াকে যুক্তরাষ্ট্র কিভাবে মোকাবেলা করবে সেটি স্পষ্ট নয়, তবে বিষয়টি যে ইতোমধ্যে বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে তাদের জন্য তা বোঝা কঠিন নয়। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে কোনো ছাড় না দিয়ে বিষয়টি সমাধান করতে। কিন্তু সামরিক পদক্ষেপ ছাড়া সেই রাস্তা খোলা নেই। কূটনৈতিক উপায়ে উত্তর কোরিয়াকে বশে আনার শেষ চেষ্টা হয়তো হতে পারে ট্রাম্পের এই সফর।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.