বউ

জোবায়ের রাজু

স্টাডি শেষ করার পর আমি যখন বেকার যুবক হয়ে টইটই করে মাঠেঘাটে বেদম ঘুরে বেড়াচ্ছি, আব্বা তখন এক কঠোর সিদ্ধান্ত নিলেন। আমাকে আর এভাবে অবাধ স্বাধীন সন্তান হিসেবে লাগামছাড়া করে রাখা যায় না। ব্যবসাপাতি ধরিয়ে কর্মঠ ছেলে করে তুলবেন। আব্বা এক কথার মানুষ, ফলে অল্প দিনে গঞ্জের হাটে আমাকে বিশাল ব্যবসায় নিয়ে বসিয়ে দিলেন।
কসমেটিকস দোকান নিয়ে আমি দিন দিন হয়ে উঠি সুপরিচিত ব্যবসায়ী। প্রচুর মালামালসমৃদ্ধ ব্যবসা আমার ক্রমান্বয়ে তুঙ্গে। লাভবান থেকে লাভবান হতে সময় লাগেনি। সৎ ব্যবসায়ী হিসেবে চার দিকে আমার নামডাক ছড়িয়ে পড়ে। আনকমন সব কসমেটিকস সামগ্রীতে দোকান টইটম্বর বলে তরুণীমহল রোজ ভিড় জমায় আমার দোকানে। তার ওপর আমি দেখতে হিরো নাম্বার ওয়ান। ফলে দুল, টিপ, ফিতা, কিপের ছলে কিছু কিছু মেয়ে আড়চোখে আমাকেও দেখে।
এক দিন বাসায় ফিরলে আম্মা বললেন ‘তোর দোকানে নাকি প্রচুর মেয়ে আসে। পাত্রী হিসেবে একটা মেয়ে পছন্দ করে তার নাম ঠিকানা নিয়ে রাখিস। জামিলকে বিয়ে করাতে হবে।’
জামিল আমার বড় ভাই। ইদানীং ওর জন্য পাত্রী খোঁজার কথাবার্তা হচ্ছে। ওর বিয়ের জন্য আমার লাইন কিয়ার হচ্ছে না। কাজেই মা যখন পাত্রী খোঁজার দায়িত্ব খানিকটা আমাকেও দিয়েছেন, এই দায়িত্ব পালনে আমি গড়িমসি করব না। দ্রুত বড় ভাইয়ের বিয়ে দিয়ে আমার রাস্তা কিয়ার করব। বড় ভাইয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়া মানে তার পরই আমার বিয়ের সানাই বাজা।
২.
ওয়াও! এই ভরদুপুরে যে মেয়েটি তার বাবার সাথে আমার দোকানে ক্রেতা হয়ে ঢুকল, মেয়েটি এক কথায় অপূর্ব। মুখের আদল প্রীতি জিনতার মতো দেখাচ্ছে। চোখ দুটো যেন ঐশ্বরিয়ার চাহনি। হাঁটা-চলার ভঙ্গিমা ক্যাটরিনার মতো। প্রিয়াংকা চোপড়া স্টাইলে বলল ‘আপনার এখানে উন্নত মানের কিপ আছে?’
স্মার্ট গলায় বললাম ‘সব আছে’।
মাধুরী দীক্ষিতের মতো হেসে বলল ‘বের করুন তো’!
কতগুলো কিপ বের করে দেয়ার পর মেয়েটি নেড়ে চেড়ে সবগুলো দেখছে। আমি ছলে বলে কৌশলে তার রূপ দেখছি। আহা, কি ডানাকাটা পরী! যেন স্বর্গ থেকে নেমে এসেছে। তুুমিই হবে আমার ভাইয়ের স্ত্রী। আমার ভাবী। আমাদের সংসারের একজন। না, বড় ভাইয়ের জন্য এই মেয়েকে হাতছাড়া করা যায় না। এর নাম-ঠিকানা জোগাড় করতে হবে। ভদ্রলোক (মেয়েটির বাবা) দরজার মুখে ঠায় দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছেন। প্রাপ্ত বয়স্কা মেয়ের সামনে সিগারেট টানতে তার নার্ভাস লাগছে না।
দূর! এত্ত সব ভাবব কেন! ভদ্রলোকের সাথে আলাপ করা যেতে পারে। আলাপে আলাপে জেনে নেয়া যাবে তাদের বাড়ির ঠিকানা আর নাম পরিচয়। প্রয়োজনে ফোন নম্বরও সংগ্রহ করে নেবো সুযোগ বুঝে। এই আশায় ভদ্রলোকের পাশে গেলাম।
Ñআরে বসুন বসুন আঙ্কেল।
Ñনো, থ্যাংকস।
Ñআপনাদের বাড়ি?
Ñপালপাড়া।
Ñচিনি তো। পালপাড়ার খান বাড়ি চেনেন?
Ñহ্যাঁ। আমাদের পাশেই খান বাড়ি।
Ñও আচ্ছা। তা মেয়ের বিয়েশাদি কী এখন ধরবেন না পরে?
Ñকোন মেয়ে?
Ñওই যে উনি।
Ñইয়ে মানে...।
আমতা আমতা করতে লাগলেন ভদ্রলোক। খানিকটা দ্বিধা-সংশয়েও ভুগলেন। তার নার্ভাসনেস দূর করতে সাহস জুুগিয়ে বললাম ‘কিয়ার করে বলি আঙ্কেল। আপনার মেয়েকে পাত্রী হিসেবে আমার বড় ভাইয়ের জন্য আমার পছন্দ হয়েছে। বড় ভাই ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। ভালো মাইনে। আমাদের ফ্যামেলিতে আপনার মেয়ে সুখে থাকবে। দয়া করে আপনার নম্বরটা দেন। আব্বা-আম্মাকে আপনাদের বাড়ি পাঠাব।’
আমার কথা শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পর ভদ্রলোক নিচু গলায় বললেন ‘আপনি অনুমানে ভুল করেছেন। আমরা বাপ-মেয়ে নই। ও হচ্ছে স্বপ্না। আমার বউ। আমার প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পর স্বপ্নার সাথে আমার সেকেন্ড ম্যারেজ এটি। বয়সে আমাদের বেশ তফাৎ অবশ্য।’
ওএমজি (ও মাই গড)! এই রূপবতী এই ভদ্রলোকের স্ত্রী!
আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.