মায়া মমতায় ঘিরে আছে অনাবিল

মুস্তাফা জামান আব্বাসী

রিডো নদীর ধারে কখনো যাইনি। অথচ আজ সকালে সেই নদীর তীরে যাওয়ার সুযোগ গ্রহণ করলাম। নদীটি কোথায় তাও জানতাম না, অথচ আমার এত কাছে তা কখনো জানতে পারিনি। রূপসী বাংলায় যে নদীর কথা বলা আছে সেখানে গিয়ে অনেক প্রহর বসে, যেখানে অন্ধকারে জেগে উঠে ডুমুরের গাছে ছাতার মতোন বড় পাতাটি। দোয়েল দেখিনি, তবু চারিদিকে ঘুরে বেড়িয়েছে ভোরের দোয়েল। কবিতাটি বহুবার পড়ার পর যেন বাংলার মুখ আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠল। ইন্দ্রের সভায় গিয়েও কবির মন কাঁদছিল বাংলার নদীমাঠ ভাঁটফুলের জন্য, ঠিক তেমনি আজো আমার বাড়িতে বসল আনন্দের হাট, যেখানে আরেক রূপসী বাংলা। আমরা জানতেই পারি না কোথায় আমাদের জীবন পরিপূর্ণ রসে অবগাহিত হয়ে অপেক্ষমাণ আমাদের জীবনে একটু আনন্দের পরশ বুলিয়ে দিতে। ইভুর বইটিও তাই।

আমার বহুদিনের অভ্যাস আমি প্রথমে গ্রন্থের শেষ ভাগে চলে যাই, যেখানে অপেক্ষা করছিল পাল তোলা নৌকা, শালপিয়ালের বন, কোকিলের কুহুতান, তারপরেই শান্ত নদীটি পটে আঁকা ছবিটির মতো। আমার মতো করে কেউ বই পড়ে না কারণ প্রতি পাতাতেই আমার দীর্ঘ অবস্থান। আমি বুঝতে চেষ্টা করি লেখক তার মনের কোন অবস্থায় কেমন করে তার মনে পড়ে যায় নজরুলের কথা, রবীন্দ্রনাথের কথা, আব্বাসউদ্দিনের কথা, সেই সঙ্গে তার দাদীর মিষ্টি হাসি আর কাঁচা আমের ভর্তা কাসুন্দি দিয়ে মাখা। আম এসেছে ঝুড়িভর্তি। সামনে গোল বাটির পানির মধ্যে হাত ডুবিয়ে দাদির পাশে বসে আম খাওয়া। তার কোমরে শাড়ির উপরে ঝুলছে এক গোছা চাবি। তার পাশেই একটি ছুরি। ছুরির নাম ‘কাটাইর’। কোমর থেকে ‘কাটাইর’ বের করে দাদি আমগুলোর মুখ কাটত। নাতনীরা তার বসবার ঘরে তাকে গোল করে ঘিরে বসত। একটা করে আমের মুখ কাটত, আর দাদী ছিলকাটা মুখে দিয়ে দেখত মিষ্টি কিনা। তার পরে একেকজনের হাতে। দাদির হাতে আমের মিষ্টত্ব যেন আরো ঘনীভূত, আরো রসাপ্লুত। কারো কাছে দাদীর সাথে এমন আম খাওয়ার গল্প আর কোন বইতে খুঁজে পাব তা মনে হয় না। যে নাতনিটি আম খাচ্ছে সে গিয়েছে রিডো নদীর ধারে, রিডো হ্রদ তার ভালো লাগে, ভালো লাগে অটোয়ার শরৎকাল।
সবকিছু মিলিয়ে তার মায়া মমতা ঘিরে আছে এমনি অনাবিলভাবে যে তার লেখায় যেন ফুটে উঠছে একটি পরিপূর্ণ মানবের কল্পকথা। লেখিকার মনে পড়ছে তার দাদুর ছোট ভাই আবদুল করিমের লেখা ভাওয়াইয়া গান: ‘গাংচিল সে গাং ছাড়িয়া উঠানে বসিয়া রাঙা বউয়ের কাণ্ড দেখে বসিয়া বসিয়া’। মাত্র একটি পাতাতে লেখিকার রসবোধ ও চারিদিকের বিস্তার, যা আমাকে অবাক করল অথচ বইটি আমার র‌্যাকে ছিল বহু দিন। কোনো দিন খুলেও পড়িনি। আজ ছিল সেই দিন যে দিন আমি তার সঙ্গে বেড়াতে গিয়েছি রিডো নদীর ধারে। এমন একটি বই শুধু আমার র‌্যাকে নয়, আছে আরো নানাজনের নানা বইয়ের মধ্যে লুকিয়ে। প্রতিটি পাতায় প্রতিটি বাক্যে আমি একজন মানুষের সত্যিকার ভালোবাসার রূপ প্রত্যক্ষ করলাম। আমি লেখিকার চাচা। শুধু আমাকেই এটি স্পর্শ করবে তা নয়; যারা পড়বে তারা পাবে এমন একজন মানবহৃদয়,যে সমস্ত পৃথিবীর, সমস্ত মানুষের।
ইভু লিখেছে তার ছোটবেলার কক্সবাজারে সমুদ্র সৈকতে যাওয়ার কথা। লিখেছে সে দিনই সে ভালোবেসে ফেলেছে নিজের দেশকে। লিখেছে, বাবা-মার সঙ্গে তো অনেক দেশেই গেলাম কিন্তু এখানে এসে দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়াবার অঙ্গীকার করেছি। সবাই যদি বিদেশে থেকে যাই, তা হলে দেশে থাকবে কে? তার দাদু আব্বাসউদ্দিন, যিনি তার অমর কণ্ঠে গান গেয়ে ঘুমন্ত মুসলমান সমাজের ঘুম ভাঙিয়েছেন। তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁর সমাজকে দিয়ে যাওয়া উপহারগুলো কালজয়ী সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে বহন করছি আমরা। ইভু ভাবছে তার ফেলে আসা দিনগুলো কথা রিডো নদীর পারে বসে। এবার এলাম বইয়ের প্রথম দিকে। ২০০৯ ফেব্রুয়ারি মাসের ২৮ তারিখে ইভু বইটি আমাকে উপহার দেয়।
ইনডিপেনডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের মরহুম উপাচার্য ড. বজলুল মোবিন চৌধুরী লিখেছেন: ‘ডক্টর নাশিদ কামাল এদেশে এক পরিচিত নাম। জ্ঞানতাপস বাবা আর গুণী মায়ের সুযোগ্য সন্তান। পারিবারিক সংস্কৃতির পরিমণ্ডলেই তাঁর প্রতিভার বিকাশ, যা অত্যন্ত অল্প বয়স থেকেই রেডিও ও টেলিভিশনের পর্দায় ধরা পড়েছে। দিনে দিনে নিজস্ব মেধা, সাধনা আর সৃজনশীলতায় উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ হতে দেখেছি। শিশুদের অনুষ্ঠানে ছোট্ট গোলাপ কুঁড়ি থেকে আজ সফল অধ্যাপক ও সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে প্রস্ফুটিত ফুলের মতোই সৌরভ ছড়িয়েছে তাঁর পেশাগত ও শিল্পীজীবন। এই সফল মানুষটির বেড়ে ওঠার পেছনে যে নিষ্ঠা, সাধনা ও নিয়মানুবর্তিতা, তার কিছু কথা তিনি বাণীবদ্ধ করেছেন ‘রিডো নদীর ধারে’ এই আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থে। স্বাধীনতা উত্তর একটি বিখ্যাত সাংস্কৃতিক পরিবারে বেড়ে ওঠার অমূল্য কিছু অভিজ্ঞতাকে সুন্দর কাব্যিক ও স্বপ্নিল ভাষায় রূপান্তরিত করেছেন জীবনালেখ্যে। সঙ্গে রেখেছেন তাঁর চোখে দেখা প্রবাস জীবনের কাহিনী।
নাশিদ কামাল আমার একজন সহকর্মী। পাশাপাশি, আমি তাঁর গানের একজন অনুরাগী শ্রোতা। তাঁর এই সুচিন্তিত সময়ের দলিল ‘রিডো নদীর ধারে’র মুখবন্ধ লিখতে পেরে আমি অত্যন্ত সম্মানিত বোধ করছি। আমি আশা করছি, নাশিদ কামাল যেভাবে একজন খ্যাতনামা শিল্পী এবং শিক্ষাবিদ-গবেষক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তেমনিভাবে, তাঁর সৃষ্টিশীল লেখনী দিয়ে তিনি আমাদের গদ্যশিল্পকেও সমৃদ্ধ করবেন। ইতঃপূর্বে তাঁর লেখা ‘জুঁই ফুলের বারান্দা’ এবং ‘আজীবন বসন্ত’ পাঠকদের কাছে সুখপাঠ্য হয়েছে।
সাহিত্যের মাননির্ধারণী পরীক্ষায় ‘রিডো নদীর ধারে’ কতখানি সফল হয়েছেÑ তা নির্ণয়ের ভার পাঠকের হাতে ছেড়ে দিলাম।
আমি নাশিদ কামালের সদামঙ্গলময় জীবন কামনা করছি।

এ গ্রন্থ সম্পর্কে লিখতে পারব অনেক কথা। এত কথা যা নিয়ে একটি বই হয়ে যেতে পারে। যেমন অটোয়ার সম্বন্ধে ইভু লিখেছে এত সুন্দর বর্ণনা যা আর কোনো বাঙালি সাহিত্যিক লিখেছেন বলে আমার জানা নেই। শুধু ভুপেন হাজারিকার গানে অটোয়া শব্দটি একবার পেয়েছিলাম। আর কোথাও কিছু পাইনি। এক অনুষ্ঠানে গান গাইছেন ভুপেন হাজারিকা ও তারপরেই নাশিদ কামাল। হাজারিকা গাইলেন: ‘বিস্তীর্ণ দু’পারে অসংখ্য মানুষের হাহাকার শুনে ও গঙ্গা তুমি বইছ কেন’। পরের শিল্পীর নাম ঘোষণা করলেন তিনি নিজেই। নাশিদ শার্ট-প্যান্ট-জিন্স পরা অপ্রস্তুত। হতভম্বের মতো মাইক্রোফোনের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। গান শুরু করল নজরুলের এমন একটি গান দিয়ে, যা হাজারিকার ঐ গানটির প্রতিদ্বন্দ্বী: ‘পদ্মার ঢেউরে’।
নাশিদ লিখছে: আমার দাদু আব্বাসউদ্দিন আহমদ কখনো নেশা করতেন না। কত মিষ্টি মধুর স্বভাবের মানুষ ছিলেন। অনেক ওস্তাদরা পান করতেন বলে তিনি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের দিকে কখনো যাননি। নেক মানুষ ছিলেন। শিল্পী ছিলেন, শৈল্পিক গুণাবলিও তাঁর ছিল। বুদ্ধি ছিল, বোদ্ধা ছিলেন। সামর্থ্য ছিল না, যোদ্ধা ছিলেন। যেখানে মাইক ছিল না, সেখানে অ-মাইক ছিলেন। মনে প্রেম ছিল, বিশ্বকে কিছু দিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ছিল। তাঁর বাগানের হাসনু হেনার মতোই সুগন্ধে ভরা ছিলেন, কোনো মলিনতা, কোনো কৃত্রিমতা ছিল না তাঁর মধ্যে। তেমনি আমার বাবা, তেমনি আমার চাচা। কেউ যদি অটোয়ার কথাই পড়েন, তা হলেই তার দিনটি ভরবে আনন্দে।
কয়েকটি সুন্দর সুন্দর ছবি আছে এই বইতে, যেখানে উপস্থিত ষোড়শী নাশিদ, বিশের কোটায় নাশিদ, জুঁই ফুলের বারান্দায় নাশিদ, ১৯৭৩, ছোটবেলার মুস্তাফা মনোয়ার ও মুস্তাফা কামাল, লন্ডন ছিল তাঁর জন্মস্থান, সেখানে নাশিদের মনে হয়েছে রবীন্দ্রনাথের কথা। প্রায়ই লিখেছে অলস দুপুরে তাঁর গান মনে পড়ার কথা:
‘মেঘ বলেছে যাব যাব/ রাত বলেছে যাই/ সাগর বলে কুল মিলেছে/ আমি তো আর নাই’। কাগজের নৌকা তাকে আকৃষ্ট করে। লিখেছে: ‘পাতার ভেলা, ভাসাই নীড়ে/ পেছন পানে, চাইনে ফিরে’। বারবার পড়ার মতো বই।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.