রোহিঙ্গা জীবন ও ঈমানি দায়িত্ব

হাফেজ মু: আবদুল কুদ্দুস

একই পৃথিবীর নিচে যে কত জগৎ আছে, একই আকাশের নিচে যে কত মানুষের বসবাসÑ তা কে জানে। কী হিন্দু, কী মুসলিমÑ সবাই তো মানুষ। এমনই এক জগতের বসবাসকারী হলো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। যাদের থাকার ঠিকানা পাহাড়ি অঞ্চল। আমি ঘুরতে যাইনি। গিয়েছি ত্রাণ সহায়তা দিতে। রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীদের ত্রাণ দিতে গিয়ে এমন এক বাস্তব অভিজ্ঞতা হলো। যাদের থাকার ঘর হলো ওপরে ত্রিপল, পলিথিন আর বাঁশের ছাউনি। চতুর্পাশে মোটা পলিথিনের বেড়া। কোনো খাটপালং বা লেপ কিংবা তোষক নেই। ওপরে শুধু বেড়া আর নিচে মাটি। বৃষ্টি হলেই ঘরগুলো পানিতে ভিজে যায়। তাদের সন্তানগুলো দিব্বি পানিতে ভিজছে, রোদে শুকাচ্ছে। কই! তাদের তো তেমন অসুখ করছে না। তাদের অসুখ না হওয়াটাই বুঝি মহান প্রভুর বিধান। একমুঠো খাবার কিংবা ত্রাণ পাওয়ার আশায় যারা হরদম পাহাড়ি দুর্গম পথ পাড়ি দিচ্ছে। দৌড়ে চলছে এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়। তাদের মধ্যে কোনো কান্তি দেখিনি, দেখিনি না পাওয়ার বেদনা। আমি যখন ত্রাণ সহায়তা দিতে গিয়েছিলাম। প্রশাসনের নিয়ম মানতে গিয়ে এক রাস্তা শেষে অন্য রাস্তায় প্রবেশ করছি, কিছুটা বৃষ্টিতে ভিজে গেছি। তখন কান্ত হয়ে নিজেকে প্রশ্ন করি, আমি কী তাদের থেকে অতি কষ্টে আছি? আমি কী তাদের চেয়ে বেশি কান্ত? তখন নিজের বিবেকের কাছেই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করি; আমি তো সুখেই আছি। আমি তো তাদের তুলনায় অনেক ভালো আছি। আমার মতো যাদের অন্তত এক বেলা খাবার হলেও দেয়ার ক্ষমতা আছে, তাদের সবার উচিত এগিয়ে আসা। শুধু রোহিঙ্গা বলে না, যেকোনো দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়ানোটা আমাদের ঈমানি দায়িত্ব। এটিকে দেশপ্রেম অথবা জাতীয়তাবোধও বলা যেতে পারে।
যাদের আমরা রোহিঙ্গা মুসলিম হিসেবে চিনি, তাদের অপরাধ কী? তাদের অপরাধ তারা মুসলমান। তারা এক আল্লাহর আনুগত্যে বিশ^াসী। লা শরিকা লাহু’রÑ চেতনা তাদের অন্তরে। এ জন্য তাদের ওপর আজ এত নির্যাতনের খড়গ। আপাত দৃষ্টিতে রোহিঙ্গা নারী মুসলিমদের দেখে তাদের পোশাকে অভিজাত্যের চাপ পরিলক্ষিত না হলেও ঈমানি চেতনায় তারা অনেক বলীয়ান। কেননা আজ আমাদের সমাজে আমরা নারীদের পর্দার নামে যে বোরকার ফ্যাশন দেখতে পাচ্ছি, আরাকানের নারী মুসলিমরা কিন্তু সে রকম নয়। তাদের বোরকা, তাদের পর্দার মধ্যে ইসলামি ভাব রয়েছে। তাদের চলনে ইসলামি রীতিনীতি রয়েছে। যখন রোহিঙ্গা মুসলমানদের ঘরগুলো দেখতে গিয়েছি, তাদের জন্য সেনিটেশন, টিউবওয়েল, মসজিদ কিংবা মক্তব করার জন্য পাহাড়ি এলাকাগুলো ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম, ছোট-বড় সবাই আমাদের ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলে সালাম দিচ্ছে। এতে বোঝা যায়, এটি তাদের সংস্কৃতির অংশ। এটি তাদের সামাজিক রীতি। সালামের এই প্রচলন তারা বাংলাদেশে এসে শিখেনি। আগে থেকেই তাদের সালামের অভ্যাস সৃষ্টি হয়েছে। রোহিঙ্গা পুরুষদের মধ্যে অনেকেই রয়েছে- যারা উচ্চ শিক্ষিত। আমাদের সাথে মতবিনিময়কালে ইংরেজি শেখার প্রতি তাদের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তারাও তো মানুষ, আমাদের মতো তাদের দু’টি হাত রয়েছে, দু’টি পা রয়েছে। তাদের কর্মক্ষমতা আছে। তারা চাইলে সমাজে কাজ করে খেতে পারে। মানুষ আর কতদিন তাদের সহায়তা দেবে। অন্যের সাহায্য নিয়ে তারা কতদিন চলবে। নবীজী আমাদের যে শিক্ষা দেখিয়ে গিয়েছেনÑ ‘নবীর শিক্ষা করো না ভিক্ষা, মেহনত করো সবে।’ কবি ফররুখ আহমদ নবীজীর সে কথার সাথে মিলিয়ে বলেছিলেন ‘তোরা চাসনে কিছু কারো কাছে খোদার মদদ ছাড়া। তোরা পরের উপর ভরসা ছেড়ে নিজের পায়ে দাঁড়া।’ এই শিক্ষায় আমাদের উদ্বুদ্ধ হয়ে অন্যদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এ রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীদের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দিতে হবে। আমাদের সমাজের বিত্তবানদের তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। এগিয়ে আসতে হবে সাবাইকে। তবেই দূরীভূত হবে তাদের দুঃখ-দুর্দশা। আর তখনই ফুটে উঠবে আমাদের ঈমানি চেতনা ও ভ্রাতৃত্ববোধ।
যারা রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীদের সহায়তা দিতে যেতে চান তাদের যাওয়ার আগে কিছু প্রস্তুতির কথা বলব:
১। একাধিক পোশাক নিয়ে যাবেন। বিশেষ করে বৃষ্টির জন্য ছাতা এবং বর্ষায় পরা যায় এমন জুতা।
২। প্রয়োজনীয় পোশাকের মধ্যে লুঙ্গি, গামছা, তাওয়াল, কেপ ও ট্রাউজার এগুলো রাখা ভালো।
৩। শুকনো খাবার যেমন : রুটি, কলা, বিস্কুট, পানি ইত্যাদি ব্যাগে রাখতে পারেন। (কারণ কক্সবাজার থেকে উখিয়া বা টেকনাফ প্রায় ৮০ কিলোমিটার। সেখানে হাটবাজার থাকলেও রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রয়োজনীয় জিনিস পত্রের দাম বেশি।)
৪। রাতে থাকার জন্য নিরাপদ জায়গা কক্সবাজার শহর। এখনো যেহেতু পর্যটক ভিড়টা কম, তাই কম খরচে কক্সবাজারেই হোটেল পাওয়া যাবে।
৫। মনে রাখতে হবে বিকেল ৫টার পরে রোহিঙ্গাদের সাথে বা সে এলাকায় অবস্থান করা নিষেধ। সেনাবাহিনী প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১৪৪ ধারার একটি ঘোষণা রয়েছে।
৬। আর হ্যাঁ। এই ধরনের সফরে সব সময় জাতীয় ভোটার আইডি সাথে রাখা বাধ্যতামূলক। বিজিবি আপনাকে যেকোনো সময় চেক করতে পারে।
৭। ত্রাণ বিতরণ, অন্য কোনো ডকুমেন্ট সংরক্ষণে রাখতে চাইলে সাথে একটি উন্নত মোবাইল বা ক্যামেরা রাখা ভালো।
লেখক: পিএইচডি গবেষক, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.