মসজিদে নববীর জুমার খুতবা

ইসলাম চুক্তি ও প্রতিশ্রুতি রক্ষার আদেশ দেয়

শেখ সালাহ আল-বুদাইর

সকল প্রশংসা আল্লাহর। তিনি তাঁর বান্দাহদের মধ্যে তাঁর অনুগ্রহ, দান ও জীবিকা বিতরণ করেছেন। চুরিকে হারাম করেছেন, চুরির অপরাধের শাস্তিতে হাত কাটার বিধান দিয়েছেন।
হে মুসলিমগণ! অর্থ-সম্পদ নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার বিষয়। সম্পদের ক্রয়-বিক্রয় হয়। সম্পদের প্রতি মোহ ও লোভ হয়। সম্পদ অর্জনে মানুষ কষ্ট ও পরিশ্রম করে। সম্পদের প্রতি থাকে চোর ও অসাধুদের লোভাতুর দৃষ্টি। তারা সতর্কতার সাথে সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। কখন মালিক বা সম্পদ রক্ষায় নিয়োজিত প্রহরী অসতর্ক থাকে, তখনি তারা এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ হাতিয়ে নেয়। যারা সুরক্ষিত ঘরে গোপনে প্রবেশ করে, বন্ধ তালা ভেঙে সম্পদ চুরি করে, তারা নিকৃষ্ট ও ঘৃণিত ব্যক্তি। তারা চোর, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে তারা অভিশপ্ত।
আবু হুরাইরা রা: থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, চোরকে আল্লাহ অভিশাপ দেন, একটি ডিম চুরি করলেও তার হাত কেটে দিতে হবে। (সহিহুল বুখারি, সহিহ মুসলিম)
জাবির বিন আবদুল্লাহ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার সূর্যগ্রহণকালীন সালাত আদায় করে বললেন, যেসব বিষয়ে তোমাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে, আমি এই সালাতে তা প্রত্যক্ষ করেছি।
আমার সামনে জাহান্নামকে পেশ করা হয়েছে, তার লেলিহান শিখা আমাকে আচ্ছন্ন করার ভয়ে আমি পেছনে সরে এসেছি যা তোমরা দেখতে পেয়েছিলে। (সহিহুল বুখারি)
চোরের হাত হলো জবরদখলকারী সীমালঙ্ঘনের হাত। শরিয়াহ এই হাত কেটে দেয়ার বিধান দিয়েছে। আর এ শাস্তি চুরির অপরাধীকে ঠেকিয়ে মানুষের অর্থ-সম্পদ সুরক্ষার জন্য।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘চোর পুুুরুষ ও চোর নারীর হাত কেটে দাও, তাদের কৃতকর্মের পরিণামস্বরূপ। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি। তিনি পরাক্রমশালী ও বিজ্ঞানময়।’
আবদুল্লাহ বিন উমার রাদিআল্লাহু আনহুমা বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন দিরহাম মূল্যের বর্ম চুরির অপরাধে হাত কেটে ছিলেন। (সহিহুল বুখারি, সহিহ মুসলিম)
চোরের হাত কাটা প্রসঙ্গে ইসলামি বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, হাত যখন বিশ্বস্ত থাকে তখন এটি হয় মহামূল্যবান। আর যখন তা অবিশ্বস্ত হয়ে যায়, তখন সেটি হয় সাঙ্ঘাতিক অপমানকর। কেউ কেউ বলেছেন, বিশ্বস্ততার সম্মান চূড়ান্তে আর অবিশ্বস্ততা হলো সবচেয়ে অসম্মানের কারণ। হে আল্লাহর বান্দা! সীমা লঙ্ঘন নিয়ন্ত্রণ করো না। শয়তানের গোলাম হয়ো না।
তোমার ভাইয়ের জীবনের মর্যাদা ও গুরুত্ব তোমার নিজ জীবনের মতো। তার সম্পদের মর্যাদা ও গুরুত্ব তোমার সম্পদের মতো। তার ঘর ও পরিবারের সদস্যদের গুরুত্ব ও মর্যাদা তোমার ঘর ও পরিবারের মতো। তুমি কি চাইবেÑ তোমার সম্পদ, ঘর ও পরিবারের প্রতি অন্যায়ভাবে কেউ হাত বাড়াক, যেভাবে তুমি অন্যদের প্রতি হাত বাড়াও? যদি তুমি এটা পছন্দ না করো, অন্যরাও তা পছন্দ করবে না।
হে আল্লাহর বান্দা! আখিরাতের কঠিন দিনে মহান আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়ার বিষয় স্মরণ করো। স্মরণ করো এমন দিনকে যেদিন অর্থ-সম্পদ তোমার কোনো উপকার করতে পারবে না। স্মরণ করো সেই দিনকে যেদিন অপরাধীদের শিকল দিয়ে বাঁধা হবে, পায়ে বেড়ি দেয়া হবে।
হে মুসলিমগণ! সতর্ক ও সাবধান হোন। আমাদের কেউ যেন অনুমতি ছাড়া কারো সম্পদ গ্রহণ না করে। পরিমাণে কম হোক অথবা বেশি।
আবদুল্লাহ বিন উমার রা: থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যেন অনুমতি ছাড়া কারো পশুর দুধ দোহন না করে।’
আবু হুরাইরা রা: বর্ণনা করেন, এক সফরে আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ছিলাম। আমরা দেখলাম কিছু উট গাছের সাথে বাঁধা আছে। আমরা সেগুলোর উদ্দেশ্যে দৌড়াতে লাগলাম, তিনি আমাদেরকে ডাকলেন, আমরা তাঁর দিকে ফিরে গেলাম। তিনি বললেন, এই উটগুলো কয়েকটি মুসলিম পরিবারের। আল্লাহর পর এগুলো তাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন। তোমরা বাড়িঘরে ফিরে যাওয়ার পর যদি দেখ যে, তোমাদের সম্পদের অংশবিশেষ হাতছাড়া হয়ে গেছে, এতে কি তোমরা সন্তুষ্ট হবে? এ উটগুলোর বিষয়ও তেমন। (আহমাদ, ইবনে মাজাহ)
আবু হুমাইদ আস-সায়েদি থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, অনুমতি ছাড়া কারো জন্য অপরের একটি লাঠিও নেয়া বৈধ নয়। (আহমাদ, ইবনু হিব্বান)
ছোটখাটো বিষয় যাতে তেমন ক্ষতি নেইÑ তার বিধান যদি এমন হয়, তাহলে মূল্যবান বিষয়ের বিধান তো আরো কঠিন হওয়াই যুক্তিযুক্ত। তাই এ ব্যাপারে অধিকতর সতর্কতা অবলম্বন প্রয়োজন।
হাকাম বিন আল-হারিস আস-সুলামী রা: থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে অন্যায়ভাবে এক বিঘত পরিমাণ জমি দখল করবে, সে ওই পরিমাণ সাতস্তর মাটির বোঝা বহন করে কিয়ামতের দিন উপস্থিত হবে। (আবু ই‘আলা)
আবু হুমাইদ আস-সায়েদি রা: থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহর কসম! তোমাদের যে-ই অন্যায়ভাবে কারো সম্পদ নেবে, সে কিয়ামতের দিন ওই সম্পদের বোঝা বহন করে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হবে।’
অতঃপর তিনি উপরের দিকে এমনভাবে হাত উঠালেন যে, তাঁর বগলের নিচের শুভ্রতা প্রকাশ পেল। তিনি বললেন, ‘হে আল্লাহ! আমি কি পৌঁছিয়েছি?’ (সহিহুল বুখারি)
আবু মালিক আল-আশজায়ী রা: থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে জঘন্য খিয়ানত তথা অবিশ্বস্ততা হলোÑ দুই প্রতিবেশীর পাশাপাশি কৃষিজমি রয়েছে, আর তাদের একজন আরেকজনের জমি নিয়ে নেয়া। এর পরিণতি হলোÑ কিয়ামত দিবসে সাতস্তর জমিন থেকে অতটুকু তার গলায় পেঁচিয়ে দেয়া হবে।’ (আহমাদ)
চোর যদি তার চুরির অপরাধ থেকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, আল্লাহ তার এ অপরাধ ক্ষমা করবেন, তবে চুরিকৃত সম্পদ মালিককে ফেরত দিতে হবে। চোরাই মাল যদি তার কাছে অবশিষ্ট থাকে তা ফিরিয়ে দিতে হবে। যদি মাল না থাকে তাহলে উপযুক্ত মূল্য পরিশোধ করতে হবে।
হে মুসলিমগণ! আমাদের কেউ যখন ভিসা নিয়ে কোনো দেশে যায়, তখন সে মনে করবে যে, এ ভিসা হলো সে দেশে তার বৈধ প্রবেশের দলিল। এর মাধ্যমে সেখানে সে নিরাপত্তা পাবে। তার দায়িত্ব হলো, সে দেশের নিয়ম মেনে চলা। সব ধরনের অবিশ্বস্ততা, চুরি; সে দেশের নিরাপত্তা, মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্ভ্রমের যেকোনো ধরনের সীমা লঙ্ঘনমূলক আচরণ তার ওপর হারাম। অনুমতি ছাড়া বা অন্যায়ভাবে কোনো সম্পদ গ্রহণ করলে তা মালিককে ফিরিয়ে দেয়া তার ওপর অত্যাবশ্যক।
আলী রা: থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনার উদ্দেশে হিজরতের সময় আমাকে আদেশ করলেন, আমি যেন মক্কায় থেকে যাই এবং তাঁর কাছে কুরাইশদের গচ্ছিত অর্থ-সম্পদ লোকদেরকে যথাযথভাবে বুঝিয়ে দিই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় ১৩ বছর ছিলেন। তিনি কখনো কোনো মুসলিমকে অন্যায়ভাবে কারো সম্পদ গ্রহণ, কারো রক্ত প্রবাহিত করা বা কারো সম্মান-মর্যাদা লঙ্ঘনের আদেশ দেননি।
ইসলাম সবসময় চুক্তি ও প্রতিশ্রুতি রক্ষার আদেশ দেয়। অবিশ্বস্ততা ও চুক্তি লঙ্ঘনকে নিষেধ করে।
আল্লাহ আমাদেরকে হেদায়াতপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত করুন। সীমা লঙ্ঘন ও বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পথ থেকে রক্ষা করুন।
অনুবাদ : অধ্যাপক আ ন ম রশীদ আহমাদ
খুতবার তারিখ : ১২ সফর ১৪৩৯ হিজরি; ৩ নভেম্বর ২০১৭

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.