শূন্যতা

আহমদ মেহেদী

বড় চাচার ঘরে আমরা ভাইবোনরা খুব একটা যাই না। যাই না বললে ভুল হবে, বিশেষ কারণ ব্যতীত তাঁর ঘরে যাওয়া নিষেধ, আর গেলেও অনুমতি নিয়ে যেতে হয়। অসম্ভব রাগী এই মানুষটাকে কৈশোরে যেমন দেখে আসছি এখনো ঠিক তেমনি দেখছি। রাগ যেমন তেমনি তাঁর ভালোবাসাও। চাচা খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠেই নাশতা করেন, তার পর একটু হাঁটাহাঁটি করেন নিজের তৈরি বাগানের চার পাশে। মন চাইলে বাগানের পরিচর্যাও করেন। আর সিগারেট টানতে টানতে বাগানে নতুন ফুলের আগমন প্রত্যক্ষ করেন। বাগানের চার পাশে চক্রাকারে ঘুরলে নাকি মনের পাষাণ খণ্ডটা ক্ষয় হয়। এ কথাটা প্রায় বলতেন আমাকে আর ছোট বোনকে। চাচার আদেশ সকালে মসজিদ পর্যন্ত দু’বার দৌড় শেষ করে আবার তাঁর সাথে বাগানে থাকা বাধ্যতামূলক। ছোট বোনটি প্রথম প্রথম ঘুম থেকে উঠতেই চাইত না। ধীরে ধীরে অভ্যাস হয়ে গেছে। মা-বাবা এ নিয়ে কারো কোনো অভিযোগ ছিল না। চাচাকে সবাই খুবই সম্মান করে। ভয়ও পায়। এক দিন বড় বোনের মেয়েটি তাঁর ঘরে ঢুকে তাঁর বইয়ের তাক ফিল্টারের পানি দিয়ে ভাসিয়ে দিলো, নারিকেল-মালায় কাদা মাটি মাখিয়ে সংসার-সংসার খেলছে আপন মনে। নারিকেল-মালা আর কাদা মাটিতে মিশে গেছে বইগুলোর সুন্দর বিছানায়। তাই নিয়ে সবার কী যে উৎকণ্ঠায় কেটে ছিল সে দিন। রানু আপা তো তার মেয়েকে মারতে শুরু করল। দুপুরে চাচা কোথা থেকে এসেই দরজা লাগিয়ে দিলেন। পরক্ষণে দরজা খুলেই আমাকে ডাক দিলেনÑ বদিউল শুনে যা তো! গম্ভীর ডাক শুনে ভয়ে ভয়ে তাঁর ঘরের সামনে গেলাম।
কিরে এসব কী আমার ঘরে?
চাচা রানু আপার মেয়ে...। আপা জান্নাতকে মেরেছে আর যাতে না আসে এখানে।
মেরেছে কেন? রাগত সুরে
আমি শ্চুপ।
যা রানুকে বল তার মেয়েকে নিয়ে এখানে আসতে। আর শোন, থানার ঝামেলার কী করলি?
চাচা ওসি সাহেব আপনাকে একবার ফোন করতে বলেছেন আর কিছুই বলেননি।
যা এখান থেকে। আমি চলে এলাম। এমন বদমেজাজি চাচা সে দিন রানুকে ধমক দিয়েছেন কড়া করে।
শুধু তাঁর মেয়েটিকে মারার জন্য আর বলেছেন- দেখ রানু দুধের বাচ্চাদের জন্য আমার ঘর নিষিদ্ধ না। আমি একা মানুষ একটি পরিপাটি থাকতে পছন্দ করি এই টুকুই। তাই বলে তুই তাকে মারধর করতে পারিস না, এটা অন্যায়।
চাচা আর এরকম হবে না!
ঠিক আছে যা, আর শোন জান্নাত ঘুম থেকে উঠলেই আমার ঘরে পাঠিয়ে দিবি। দিনের বেলা বেশি ঘুমাতে নেই। তুই আামর জন্য একটা আদা-চা বানিয়ে নিয়ে আয় তাড়াতাড়ি।
সে দিনের পর থেকেই বড় চাচার বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল হয়ে গেছে। এই পরিবারের সুশাসন আর পরিচালনার অভিভাবক বড় চাচাই আমাদের আগলে রেখেছেন ত্রিশ বছর ধরে। তার সুশৃঙ্খল আর পরিপাটি পদচিহ্ন আমাদের জীবনকে দিয়েছে অনেক কিন্তু এই মানুষটিই ক্যান্সারে আক্রান্ত সাত মাস ধরে! কী যে কষ্ট আর ভোগান্তি তাঁর আজ। এইচএসসি পাসের পর তাঁর এক বন্ধু মহসিন তাকে সুইডেন নিয়ে যায়। ওখানে দিনরাত পরিশ্রমের ফসল আজকের এই আমাদের অবস্থান। দুই টাকার জন্য যেন কারো কাছে হাত পাতা না লাগে সেই ব্যবস্থা করে গেছেন।

দুই.
মহসিন আংকেল যাকে বিয়ে করেন তাকেই নাকি বড় চাচা ভালোবেসে ছিলেন। এলাকায় তার বন্ধু জয়নালের কাছ থেকেই এসব তথ্য পেলাম কিছু দিন হলো। আরো অজানা অনেক কিছুই। সে দিনটা ছিল ১০ অক্টোবর। শারমিন, মহিসন আংকেলের স্ত্রীসহ আমাদের বাড়িতে আসার কথা ছিল। বড় চাচা ১০ অক্টোবর তার প্রিয়তমার জন্মদিন পালন করেন প্রতি বছরই। এবারো জমকালো জন্মদিনের আয়োজন করেছিলেন। এলাকার সবাইকে এই দিনে দাওয়াত দিয়ে খাইয়েছিলেন। চাচাকে ওই দিনের মতো আনন্দে থাকতে দেখিনি কোনো দিন। তাঁর উৎফুল ভাব দেখে কে বলবে তিনি ক্যান্সার নামক মারণব্যাধিতে আক্রান্ত। দুপুরের দিকে চাচাকে সাহস করে বলেই পেললামÑ চাচা আপনার স্পেশাল গেস্ট তো দেখি এখনো এলো না?
আরে বোকাÑ আসবে, অবশ্যই আসবে। কথা দিয়েছে আসবে।
২টা বেজে গেল, একবার ফোন করে দেখবেন?
আমি ট্রাই করেছি কয়েকবার। হয়তো বিমানে আছে ফোন তো বন্ধ! এমনি করে সন্ধ্যা হলো, যাকে ঘিরে সব আয়োজন সে আসেনি। চাচা সে দিন খুব কষ্ট পেয়েছিলেন।

তিন.
রাত ১২টা। বড় চাচা ও আমি হাসনাহেনা গাছটির সাথে থাকা পাকা বেঞ্চিতে বসে আছি। তিনি একটার পর একটা সিগারেট টেনেই যাচ্ছেন কিন্তু কিছু বলার মতো দুঃসাহস ছিল না আমার। চুপচাপ দু’জনই। আমার কাঁধে হাত রেখে চাচাই প্রথম কথা বললেন।
কিরে তোর অনার্স শেষ হবে কবে?
এক বছর বাকি।
ও আচ্ছা, অনার্স শেষ হওয়ামাত্র আমার ন্যাংটা কালের দোস্ত আছে। সলিট হারুন তার নাম। তথ্য মন্ত্রণালয়ে সচিব। আমার ডায়েরিতে তার সেল নাম্বারসহ ঠিকানা লেখা আছে। তাকে বলে দেখিস তোকে একটা ভালো চাকরি দিয়ে দেবে।
ঠিক আছে চাচা।
তোর মেধার কারণেই চাকরি পাবি, কিন্তু হারুন একটু তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা করে দিতে পারবে।
আর এই নে মোটরসাইকেলের চাবি, এ মুহূর্ত থেকে এটি তোর। আমাকে ভালোবাসতেন বেশি তাই তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, তাঁর জমিজমা, ঘরবাড়ি আমাকে উপহার দিয়ে যান। আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।
আর এই যে গাছটির নিচেই আমাকে কবর দিবি। বড় চাচাকে আমি কখনো কাঁদতে দেখিনি। তিনি কাঁদছেন আর আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। আমি আর কান্না থামিয়ে রাখতে পারিনি। বড় চাচাকে জড়িয়ে ধরলাম। উনিও আমাকে জড়িয়ে ধরলেন আর বললেনÑ একদম চিন্তা করবি না! আমি মরে গেলেও তোরা নিরাপদ থাকবি, বিধাতা আমাকে অনেক দিয়েছেন। কিছু দিন পরই বড় চাচা মারা গেলেন। সবই আছে আগের মতো কিন্তু একটি শূন্যতা আমাদের চার পাশ ঘিরে। যার বৃত্তের মাঝে আমাদের পথচলা ছিল সেই রাগী মানুষটির জন্য পরিবারের সবার মতো আমার মন কেঁদে ওঠে এখনো।

চার.
সে দিন রাতে কড়া জোসনা ছিল। আমি বড় চাচার ঘরে পড়ছিলাম। গেটের কাছে পাজেরো গাড়ির হর্ন বাজছে। আমি দারোয়ানকে ডেকে বললাম গেট খুলে দিতে। গাড়ি ভেতরে ঢুকতেই এক সুন্দরী রমণী একটি ফুটফুটে মেয়ে নিয়ে গাড়ি থেকে নামলেন। চোখে সবুজ ফ্রেমের কালো চশমা। আমার আর চিনতে অসুবিধা হয়নি।
এই যে শারমিন...। বড় চাচার ডায়েরি পড়ে সব জানতে পেরেছি এবং তাঁর কয়েকটি বাঁধাই করা ছবিও দেখেছি।
আস্সালামু আলাইকুম আন্টি।
ওয়া লাইকুম আস্সালাম।
আন্টি ভেতরে আসেন।
হ্যাঁ বাবা, আহসানের ঘরটা দেখিয়ে দাও।
আসেন আন্টি। এই বলেই ঘরে নিয়ে গেলাম। ঘরের চার পাশে তিনি কী যেন খুঁজছেন। আলতো করে বড় চাচার বিছানায় বসলেন। মনে হচ্ছে কাঁদছিলেন কিন্তু চশমার জন্য বোঝা যায়নি। চাচার মৃত্যুর কথা শুনে সেই সুইডেন থেকে সোজা আমাদের বাড়ি।
বদিউল আমাকে তাঁর কবরের কাছে নিয়ে চল।

বড় চাচার কবরের সামনে শারমিন আন্টি, তার মেয়ে ও আমি দাঁড়িয়ে আছি। তিনি কাঁদনে আর বলছেনÑ তুমিই জয়ী হলে আরেকবার। জানো তোমার রাগটাকেই বেশি ভালোবাসতাম আমি। তাঁর ছোট্ট মেয়েটি তার মাকে বলছেÑ
আম্মু, বড় বাবা এখন কোথায়?
আন্টি হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। চশমা খুলে আমার দিকে একবার তাকালেন। তাঁর চোখ অসম্ভব লাল হয়ে গেছে। পরক্ষণেই তাঁর মেয়েকে ধরে মা-মেয়ে একসাথে কয়েক গুচ্ছ গোলাপ বড় চাচার কবরে রাখলেন। কবরকে খানিকটা ছুঁয়েও দিলেন।
তাঁর মেয়ের মুখে বড় বাবা কথাটাই বলে দেয় তাদের ভালোবাসা কতটা খাঁদহীন!
আস্তে আস্তে জোসনার আলো কমতে থাকে। চাচার জীবনের মতো সেও যেন নিভে যাবে খানিক পর।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.