নারীরও সমান দায়িত্ব
নারীরও সমান দায়িত্ব

নারীরও সমান দায়িত্ব

সুমাইয়া বিনতে রহমান

নারীরা যেখানে পুরো বিশ্বেই ছিল অবহেলিত, সেখানে ইসলামে পুরুষের মতোই নারীকে সমান মর্যাদা দেয়া হয়েছে। তাকওয়াকে মর্যাদার মাপকাঠি ঘোষণা দেয়া হয়েছে। আরো বলা হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তিই বেশি মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে বেশি মুত্তাকি’ (৪৯:১৩)। নারীকে অনেক দায়িত্বের পাশাপাশি ‘মা’ হিসেবে গুরুদায়িত্ব পালনের উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়েছে। নারী শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে পুরুষের চেয়ে কিছুটা পৃথক। দায়িত্ব পালনের জন্য অনেক ক্ষেত্রে পুরুষদের মতো তাদের দক্ষ, বুদ্ধিদীপ্ত ও যোগ্য করে গড়ে তোলা হয়েছে। অতঃপর বলে দেয়া হয়েছে, ‘আমরা পৃথিবীতে খলিফা নিয়োগ করতে যাচ্ছি’ (২:৩০)। এখানে নারীদের বাইরে রাখা হয়নি। পুরুষদের মতো নারীরাও তাদের স্বকীয়তা নিয়ে খলিফা বা প্রতিনিধি হওয়ার পথে অগ্রগামী হবে, এটাই প্রত্যাশিত। তবুও খলিফার দায়িত্ব পালনে বেশির ভাগ নারী দৃশ্যপটের বাইরে কেন? কী কারণ তাকে এ মর্যাদা হাসিল করা থেকে দূরে রাখছে? ঘরোয়া দায়িত্ব পালনের ব্যস্ততাই কি এর কারণ? নাকি পর্যাপ্ত শিক্ষার অভাব এ বিষয়ে গুরুত্ব উপলব্ধির ব্যাপারে চেতনা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়নি? নাকি কোনো বিপর্যয়ের আশঙ্কা তাদেরকে এ মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব পালনে উপযোগী হয়ে ওঠা থেকে দূরে রাখছে?

প্রচলিত সংস্কৃতির ধারায় আমাদের সমাজের একটি বিরাট অংশে বিয়ে সম্পর্কে কিছু ভ্রান্ত ধারণা আছে। তাতে কিছু প্রশ্নের উদ্রেক হয়Ñ মুসলমানদের মধ্যে বিয়ে কি স্ত্রীর পিতা-মাতাকে কন্যাদায়গ্রস্ত অবস্থা থেকে মুক্তি দেয়া? স্বামীর সংসারে স্ত্রীর শ্রম দেয়া কি বাধ্যতামূলক? স্বামী কি স্ত্রীর তুলনায় উচ্চতর সত্তা? না, মুসলিম পরিবারে এ সম্পর্ক করুণার নয়, বরং সম্মান ও মর্যাদার? স্ত্রীর ভরণপোষণ ও মর্যাদা স্বামীগৃহে শ্রমের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় না। স্ত্রীর ভরণপোষণ, স্বতন্ত্রগৃহে অবস্থানের অধিকার, গৃহস্থালি কাজে সহযোগীর ব্যবস্থা করে দেয়া ও স্ত্রীর মর্যাদা রক্ষা করা স্বামীর দায়িত্ব। নারী-পুরুষ একই উৎস থেকে উৎসারিত।

বিয়ে একটি পবিত্র বন্ধন, যা স্বামী-স্ত্রী উভয়ের জন্যই সফলভাবে গড়ে ওঠা ও বেড়ে ওঠার পবিত্র ক্ষেত্র। আমাদের দেশে বেশির ভাগ নর-নারী পর্যাপ্ত শিক্ষা ছাড়াই বিবাহিত জীবনে প্রবেশ করে থাকে থাকে। পরিবারের সবার সাথে পারস্পরিক সম্পর্ক রক্ষা ও দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হিমশিম খায়। সৃষ্টিকর্তা ও বিশ্বজগতের সাথে তাদের সম্পর্কের বিষয়ে জ্ঞানের স্বল্পতা ও নিজের অধিকার সম্পর্কে অসচেতনতার কারণে তারা সঠিক দিকনির্দেশনা খুঁজে পায় না। নিজের অধিকার সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাব নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় দুর্বল করে রাখে। তাই দেখা যায়, অনেক সময়ই স্ত্রীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হতেই পর্যাপ্ত শিক্ষা ছাড়া সন্তানদের গড়ে তোলার ব্যস্ততায় উভয়ে আটকা পড়ে যান। ফলে দুর্বল কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী প্রজন্মের শিক্ষা চলতে থাকে। স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সচেতনতা ও পারস্পরিক সাহায্যই পারে এ পরিস্থিতির উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে। ইসলামে বিবাহবন্ধনকে উল্লেখ করা হয়েছে স্থিতিশীলতা, পরিতৃপ্তি ও প্রশান্তি লাভের, পারস্পরিক ভালোবাসার এবং মমতার উৎস হিসেবে। এটা উভয়ের জন্য আল্লাহ তায়ালার নিয়ামত। আল কুরআনে বলা আছে, ‘মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী পরস্পরের বন্ধু, সাহায্যকারী। তারা ভালো কাজে আদেশ দেয় ও খারাপ কাজে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, নামাজ কায়েম করে, জাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে।’ (৯:৭১)।

যদিও বৈবাহিক জীবনে নির্দিষ্ট কিছু দায়িত্ব আছে, তবু প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ পুরুষ ও নারীর জন্য একই রকম। তারা উভয়ই আল্লাহ ছাড়া আর কারো দাসত্ব করতে পারবে না। পুরুষের পরিচয় যেমন শুধু সন্তানদের পিতা বা কারো স্বামী হওয়ার মধ্যেই সীমিত নয়, তেমনি নারীর দায়িত্ব শুধু কারো ‘মা আর কারো স্ত্রী হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।

নারীর ভূমিকা সম্পর্কে বলতে গিয়ে ইসলামিক স্কলার ড. জামাল বাদাবি বলেছেন, ‘পুরুষের মতো প্রত্যেক নারীও এই পৃথিবীতে আল্লাহর খলিফা। পৃথিবীতে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠার ব্যাপক দায়িত্ব তার ওপরও সমানভাবে আছে- এই অনুভূতি নিয়ে প্রতিটি নারীর কাজ করা উচিত। এভাবে কাজ করলে তিনি ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক- এসব ক্ষেত্রেই উন্নয়নে বিরাট অবদান রাখতে পারবেন।’

পরিবারে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বৃহত্তর সামাজিক পরিবেশে নারীর ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন : ‘বৃহত্তর সামাজিক পরিবেশে সমাজের সবার কল্যাণকামী বোনের ভূমিকা রাখবে নারী। কুরআনে ৯ নম্বর সুরার ৭১ নম্বর আয়াতে যেভাবে বলা হয়েছে, সেভাবে মানুষকে সৎ কাজের আদেশ আর অসৎ কাজের নিষেধ করবে। মনে রাখতে হবে, এই কাজের জন্য তাকে আখেরাতে জবাবদিহি করতে হবে। এ জবাবদিহিতা এড়ানো যাবে না। আল্লাহর খেলাফতের গুরুদায়িত্ব পালনের জন্য একজন মুসলিম নারী (পুরুষের মতোই) প্রথমে নিজেকে পরিশুদ্ধ করবে। আল্লাহর প্রতি দৃঢ়বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন করে নিজের সব পছন্দ-অপছন্দের ওপর আল্লাহর ইচ্ছাকে স্থান দিতে হবে।’

আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘পুরুষ বা নারী যেই নেক কাজ করবে, সে যদি ঈমানদার হয়, তাহলে তাকে এ দুনিয়ায় সম্মানের সাথে জীবন যাপন করাব এবং পরকালে তাদের কৃতকার্যের উত্তম পুরস্কার দান করব।’ (সূরা আন নাহল, ১৬ : ৯৭)। কুরআনে কোথাও বলা হয়নি যে, নারীদের নেক কাজ করার ও মন্দ কাজ প্রতিরোধের কর্মক্ষেত্র শুধু পারিবারিক গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। নারীসমাজ নেক কাজ করবে এবং দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা, রোগব্যাধি, অজ্ঞতা নিরসনে কাজ করবে। সত্য অনুসন্ধান ও সত্য প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখবে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক- সব ক্ষেত্রেই।

অনেকে বলতে চান, নারীর বেহেশতে যাওয়ার জন্য শুধু সতীত্ব রক্ষা, নামাজ, রোজা আর স্বামীর আনুগত্যই যথেষ্ট। এ জন্য তারা মুহাম্মদ সা:-এর কথার রেফারেন্স দিতে চান। ড. জামাল বাদাবি এ প্রসঙ্গে যুক্তি পেশ করেছেন, ‘এমন ব্যাখ্যা করা ভুল যে, মুসলিম নারীর বেহেশত লাভের জন্য একটি কাজই করতে হবে।’ আবদুল হালীম আবু শুককাহ তার ‘রাসূল সা:-এর যুগে নারী স্বাধীনতা’ বইয়ে লিখেছেন, ‘জ্ঞান ও দ্বীনের ক্ষেত্রে নারী অপূর্ণাঙ্গÑ হাদিসটি গৃহের যাবতীয় দায়িত্ব পালন করে বাইরের জগতের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে, পূর্ণ শক্তি-সামর্থ্য ব্যয় করে নারীকে তার ঘাটতি পূরণের প্রতি উদ্বুদ্ধ করছে। আল্লাহ্ মানুষকে বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করে থাকেন। নারীকে পরীক্ষা করেছেন হায়েজ ও নিফাস দিয়ে। এ ক্ষেত্রে তার ধৈর্য ধারণ এবং সে দু’টির কারণে ইবাদতে তার যে ঘাটতি হয়, তা পূরণের চেষ্টার মাধ্যমে সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। এমনিভাবে গর্ভধারণ, সন্তান প্রসব, স্তন্যদান ও লালনপালনের মাধ্যমেও তাকে আল্লাহ পরীক্ষা করে থাকেন। আর এগুলো তার ঘরের বাইরে কাজকর্মের সুযোগ সঙ্কীর্ণ করে দেয়। কাজেই তার দায়িত্ব হচ্ছে, গৃহবহির্ভূত কাজকর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে নিজের ত্রুটি নিরসনের চেষ্টা করা। এতে তার চেতনা ও পরিপক্বতা বৃদ্ধি পায়।’ প্রশ্ন থেকে যায়, পুরুষ হিসেবে স্ত্রীর জীবনে স্বামী কী ভূমিকা রাখতে পারে? ড. জামাল বাদাবি মুসলিম নারীর উন্নয়নে পুরুষের ভূমিকা সম্পর্কে বলেছেন, ‘ব্যক্তিগত পর্যায়ে নারী ও পুরুষের দায়িত্ব একই।

পারিবারিক পর্যায়ে পুরুষ তার মা, স্ত্রী বা কন্যার সাথে ইসলামে বর্ণিত উপায়ে আচরণ করবে। সে তার পরিবারের নারীদের পৃথক ব্যক্তিত্বের স্বীকৃতি দেবে এবং তাদের পরিচয় ও অধিকার নিশ্চিত করবে। সে এটা স্বীকার করবে যে, নারী নিজের কাজের জন্য স্বামীর কাছে নয়, আল্লাহ্র কাছে জবাবদিহি করবে। কাজেই সে তার স্ত্রীর মধ্যে যাতে পরিপূর্ণ ব্যক্তিত্ব এবং আল্লাহর কাছে জবাবদিহির দায়িত্ববোধ জাগ্রত হয়, তার ব্যবস্থা করবে। কোনো কোনো পুরুষ তাদের স্ত্রী-কন্যাদের আল্লাহর প্রতি কাজে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অথচ উচিত হচ্ছে সে তাদের আল্লাহর কাজে শুধু অনুমতিই দেবে না, বরং উৎসাহ জোগাবে। ইসলাম বলে, নারীর দায়িত্ব শুধু পরিবারেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং ইসলাম নারীকে সমাজসচেতন হিসেবেই দেখতে চায়। কাজেই সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো উপযুক্ত জ্ঞান, প্রশিক্ষণ, প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক দক্ষতা প্রভৃতি অর্জনের জন্য উৎসাহ ও সহযোগিতা দিয়ে প্রত্যেক পুরুষ তার স্ত্রী, কন্যা ও বোনকে তৈরি করতে হবে; যাতে তারা সামাজিকভাবে ফলপ্রসূ ও কার্যকর হয়।’

আল্লাহ তায়ালা নিজেই যেহেতু বিধানদাতা, সেখানে ইসলামের বিধান এমন কী করে হতে পারে যে, একটি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তা অন্য দায়িত্ব পালনের পথ বাধাগ্রস্ত করবে? বরং প্রতিটি নির্দেশ অন্য নির্দেশগুলো পালনের জন্য সহায়ক হবে। নারী ও পুরুষ নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে তারা পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা অব্যাহত রেখে থাকলে, কোথায় কোথায় তার কর্মকাণ্ড তার কিংবা পরিবারের প্রধানের গৃহস্থালি ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনায় আল্লাহর নির্ধারিত বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হচ্ছে। সেটা কি তাদের কোনো দক্ষতার অভাব, নাকি কোনো ভুল সংস্কৃতির ঐতিহ্যের অনুসরণ?

নারীকেও প্রশ্ন করতে হবে, যেখানে সমস্যা হচ্ছে, সেখানে স্বামীর সন্তুষ্টির ওপরে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে কি না। আল্লাহর নির্দেশ পালন করতে গিয়ে বিপর্যয়ের আশঙ্কা থাকলে তা প্রতিহত করার উপায়ও থাকবে। আল্লাহ বলেছেন, ‘ইন্না মাআল উসরি ইয়ুসরা’- অর্থাৎ ‘প্রতিটি সমস্যার সাথে সমাধান রয়েছে।’ (৯৪:৬)। কঠিন হতে পারে, কষ্টকর হতে পারে, কিন্তু বিপর্যয় রোধ করা অসম্ভব নয়। আমাদের অবশ্যই সব কিছুর ওপরে আল্লাহর নির্দেশকে গুরুত্ব দিতে হবে। রাসূল সা:-এর যুগে জনগোষ্ঠী ছিল সদ্য জাহেলিয়াত থেকে বের হয়ে আসার পথে পরিপূর্ণতা অর্জনে প্রচেষ্টারত একটি সমাজ। সেখানে কোনো বিপর্যয় নারীদের মসজিদে যাওয়ার পথে বাধার কারণ হয়নি। বিভিন্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে তাদের বাধা ছিল না।হ

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.