নারী নিরাপত্তা বিশ্লেষণ
নারী নিরাপত্তা বিশ্লেষণ

নারী নিরাপত্তা বিশ্লেষণ

প্রফেসর ইউছুফ হারুন

একটু মুরুব্বি গোছের লোক দেখলে একসময় সিগারেটটা এমনকি চা-টা পর্যন্ত লুকিয়ে খেত। বিয়েতে লজ্জায় বর চোখেমুখে রুমাল গুঁজে থাকত। বাস্তবিক এগুলো শালীনতা-সভ্যতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ শালীনতা, শৃঙ্খলা, শান্তি ও স্থিতিশীলতার পূর্বশর্ত। এগুলো যে সমাজে আছে সে সমাজটি ভালো, যে সমাজে নেই, ওই সমাজটি ভালো নয়। এসব ভালোমন্দে আমার আপনার কি বলে পার পাওয়া যাবে না। কারণ একটা দেশের সুখ-শান্তি, শৃঙ্খলা-সমৃদ্ধি, উন্নতি-স্থিতিশীলতার স্বার্থে ভালো সামাজিকতা আবশ্যক। এ সুন্দর গুণাবলি অর্জন এমনি হয়ে যায়, নাকি আয়াস-প্রয়াসের প্রয়োজন। অবশ্যই প্রচেষ্টার প্রয়োজন। সেই প্রচেষ্টা চলেছে শিক্ষা, সমাজ, সংস্কৃতি ধর্মীয় ক্ষেত্রে। শিক্ষক পড়িয়েছেন গুরুজনকে ভক্তি-শ্রদ্ধা সম্মান করতে, তাই চা-সিগারেট লুকিয়ে আড়ালে খেত। 

সমাজ-সংস্কৃতি বলেছে অশ্রাব্য ভাষা পরিহার করো তাই গাল-মন্দ কম ছিল, সৎসঙ্গে স্বর্গবাস অসৎসঙ্গে সর্বনাশ তাই খারাপ লোকের সাথে মিশত না। ধর্মীয় অনুশাসন বলেছে শ্লীলতাহানি মহাপাপ, তাই মা-বাপ ঠিক করা বিয়েতেও লজ্জাবোধ করত। সামারি করা যায় এভাবে যে রকম স্ট্যান্ডার্ড সামাজিক কারখানা বানাবেন ব্র্যান্ডের মানসম্মত সামাজিক পণ্য পাবেন।

কেউ বলতে পারেন সভ্যতা-সংস্কৃতি কি মাপা যায়! হ্যাঁ মাপা যায়। যেমন ছেলেদের পোশাক নেমে যাচ্ছে যাতে হোঁচট খেয়ে পা ভাঙতে পারে, কাজের যোগ্যতা-দক্ষতা কমতে পারে, দুনিয়া-আখিরাত উভয় জায়গায় অসফলতা দেখা দিতে পারে। আর মেয়েদের কাপড় ওপরে উঠে যাচ্ছে বা নগ্ন হয়ে যাচ্ছে। তাতে কী হয়! পুরুষ-আকর্ষণ বাড়বে। পোশাক উঠিয়ে নগ্ন হয়ে যে গন্তব্যে চলছিল মেয়ে সেখান পর্যন্ত পৌঁছার আগেই নাজেহাল, অঘটন ঘটে যেতে পারে।

ধর্মনিরপেক্ষতা লব্ধ ধর্মহীনতার আবহে নাটক, সিনেমা, ডিস-পর্নো ছবি, এমনকি পত্রিকার ছবি, বৈশাখী মেলা, আনন্দমেলা, মিলন মেলা, থার্টি ফার্স্ট দিবস, ভালোবাসা দিবস ইত্যাদি বিভিন্ন আঙ্গিকে এমনকি বিয়ে-শাদি, খতনা, নাক-কান ফোঁড়ানি, গায়ে হলুদ এমন সব অনুষ্ঠানে মেয়েরা ভীষণ উগ্র-আকর্ষণীয় নগ্ন দৈহিক সাজে সজ্জিত হয়ে লম্ফ-ঝম্ফ দিয়ে, কাৎ-চিৎ এমনকি শুয়ে নাচগান করলে পুরুষের কী মনোভাব সৃষ্টি হয় তা পুরুষ-মহিলা সবার জানা থাকার কথা। এহেন রঙঢঙ, সাজ-গোজ, সহচলন-বলন-ফিরন, সহ-সম্মেলন ইত্যাদি নগ্নতার সুযোগে আকর্ষিক প্রতিক্রিয়া প্রসূত আক্রমণ ঘটে। যখন একা অবস্থা সামাল দিতে পারে না তখন যৌথ প্রয়াসে কুকর্ম সঙ্ঘটিত হয় যা চমৎকার নাম ধারণ করেছে বাংলাদেশের গণমাধ্যম সাহিত্যে ‘গণ-ধর্ষণ’ নামক বিশেষ অভিধায়।
বাঘ-ছাগলের সহঅবস্থান কতটা মজার হতে পারে তা বাঘ, ছাগল উভয় পক্ষ বোঝা উচিত। বিশেষ করে ছাগল বুঝতে হবে বাঘের স্বভাব কী! বাঘ কী করে! বাঘ বলে আস ছাগল, আমি তোমায় ভালোবাসি আদর করি, না দেখলে মরি। ছাগলকে না পেলে বাঘ মরবে কি না জানি না; কিন্তু বাঘ ছাগলকে পেলে ছাগলকে কোনো না কোনোভাবে মরতে হবে। এটা খুবই স্বাভাবিক।

ছেলেমেয়ের নৈকট্য, সাক্ষাৎ, আলাপচারিতা, কুশল বিনিময়, ভাববিনিময়, ভালোবাসা, ভালো লাগা ইত্যাদি সম্পর্কে যে সব মুরুব্বিয়ানে কেরাম অসচেতন থাকেন তাদের সামনে মেয়ে চলে যাচ্ছে ওড়না নামের দৈহিক-কাঠামো প্রদর্শনযোগ্য পাতলা কাপড় লাগিয়ে, কখনো বা দেহ নগ্ন রেখে গলায় রশির মতো করে ওড়না ঝুলিয়ে, কোনো কোনো মেয়ে চলছে সম্পূর্ণ দৈহিক কাঠামো প্রদর্শন করে একেবারে ওড়না ছাড়াই। এভাবে মেয়েদের চলাফেরাটা কি ক্ষেত্র প্রস্তুত করে ধর্ষণের দিকে পরোক্ষভাবে আহ্বান জানানো নয়!

এভাবে বাঘ-ছাগলের কিসসাটা নিম্নোক্তভাবে কার্যকর হতে পারে। যেমন বর্ষবরণ, বৈশাখী মেলা ইত্যাদি অনুষ্ঠানে কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দেয় এত স্তরবিশিষ্ট নিরাপত্তা বলয় সৃষ্টি করা আছে। অতএব ‘আয় ছেলেরা আয় মেয়েরা বৈশাখী মেলায় যাই, স্বর্ণালি মেয়েরা হলুদ বরণ শাড়ি পরে পান্তা-ইলিশ খেতে যাই’ দুধে-আলতা চেহারা বানিয়ে, ডানা-কাটা পরী সমবয়সী তরুণ ছেলেদের সাথে মিলে-তালে চললে বিয়ের কাজ ধর্ষণের মাধ্যমে নিষ্পন্ন হবে মশাই এটা আর অস্বাভাবিক আশ্চর্য কী!

এখানে কর্তৃপক্ষীয় নিরাপত্তা বলয় বলতে বুঝায় বোধ হয়, তোমরা ছেলেমেয়েরা যা করার কর কেউ কিছু বলবে না, ডিস্টার্ব করবে না, ‘মা-বাপেরে লাগাই দিবো মানষে দেখিলে’ নিরাপত্তা বলয়ের নামে এতটুকু ভয়ও আর থাকল না। এ বলয়ের অর্থ কর্তৃপক্ষ নিজেও কিছু বলবে না, মা-বাপকেও কিছু লাগাবে না। এহেন অবস্থায় ধর্ষণ, গণধর্ষণ না হয়ে যায় কোথায়। ভাইসব বুঝার জন্য উন্নত বিজ্ঞান অণুবীক্ষণ, দূরবীক্ষণ কিছুই দরকার করে না, আল্লাহর দেয়া খোলা মনে, খালি চোখে দেখা যায়, অনুধাবন করা যায় মানব-সমাজের অবস্থা কোন দিকে গড়াচ্ছে। সামাজিক উন্নয়ন কেমন হচ্ছে! আল্লাহ শুভ-বুদ্ধির উদয় করুন।

লেখক : আর্থসামাজিক উন্নয়ন বিশ্লেষক

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.