সবাই যেন সুপার হিরো

আহমদ শামিল

বর্তমান সময়ের শিশু কিংবা তরুণ-তরুণীদের প্রথম পছন্দ কমিকস, কার্টুন দেখা কিংবা ভিডিও গেমস খেলা। কমিকস কিংবা কার্টুনের চরিত্রগুলো তাদের ভীষণভাবে আকর্ষণ করে। যদি এমন হয় নিজেরাও হয়ে উঠতে পারে কার্টুন চরিত্র। তাহলে ব্যাপারটা দারুণ! তাই না? কমিক-কন ঠিক তেমনিই একটি আয়োজন। এখানে কার্টুন ফ্যানরা নিজেদের পছন্দের চরিত্রের সাজে সাজতে পারে এবং পারফর্ম করতে পারে। কমিক-কনের আদ্যপ্রান্ত নিয়ে লিখেছেন আহমদ শামিল

তখন মাত্র জেএসসি পাস করেছি। হঠাৎ আমাদের বন্ধুদের মাঝে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠল কমিক-কন নামের জিনিসটি। কমিক-কনের বিষয় আগ্রহী হয়ে আমিও যাই ব্যাপারটা দেখতে। গিয়ে দেখি যেন শত শত সুপার হিরো ঘোরাঘুরি করছে সুপারম্যান, ব্যাটসম্যান কী নাই সেখানে। এগুলোকে বলা হয় কসপ্লে সহজ কথায় গেম, মুভি, কমিক্সের চরিত্রদের মতো করে সাজা। অর্থাৎ কসপ্লে হলো সুপার হিরোর চরিত্রের মতো করে সাজা এবং তেমন পারফরম করা অনেকটা যেমন খুশি তেমন সাজোর মতো। কিন্তু গেম, মুভি অথবা কমিক্সের চরিত্র হতে হবে। দিন শেষে সবচেয়ে পারফেক্ট কসপ্লেগুলোকে পুরস্কৃত করা হয়। কমিক কন মুভি-কমিক্স লাভারদের জন্য স্বর্গরাজ্যÑ তারা নিজেদের প্রিয় চরিত্রগুলোকে বাস্তবে শুধু দেখতেই পায় না বরং কথা বলতে এবং ছবি তুলতে পারে। আমি ধীরে ধীরে কমিক-কনগুলোয় নিয়মিত যাওয়া শুরু করি এবং পরিচিত হই বিভিন্ন কসপ্লেয়ার এবং আয়োজকদের সাথেও।

কসপ্লে শব্দটি প্রথম প্রচলিত হয় ১৯৩৯ সালে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড সায়েন্স ফিকশন কনভেনশনে। যদিও পঞ্চাদশ শতক থেকে ইউরোপের উচ্চ বংশীরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করত। যেখানে তারা বিভিন্ন চরিত্র সেজে যেতেন। উনবিংশ শতকে ইংল্যান্ড ও আমেরিকায় কসটিউম পার্টি নামক এক ধরনের অনুষ্ঠান জনপ্রিয়তা লাভ করে। যার থেকে ১৯৩৯ সালে ওয়ার্ড সায়েন্স ফিকশন একটি কনভেনশনের আয়োজন করে। যার মাধ্যমে কসপ্লে অনানুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে সারা পৃথিবীজুড়েই কমিক-কন আয়োজন করা হয়।

এ বিষয়ে কথা হচ্ছিল আমাদের দেশের প্রথম কমিক-কনের আয়োজকদের অন্যতম কাজী নূরের সাথে। জিজ্ঞেস করলাম তাকে, কিভাবে শুরু হলো এই কমিক-কন? তিনি বললেন, আসলে ছোটবেলা থেকেই মুভি কমিক্সের ভীষণ ফ্যান ছিলাম। সুপার হিরো সাজার অনেক ইচ্ছে ছিল; কিন্তু তেমন উপায় ছিল না। বড় হয়ে দেখলাম বাইরের বিভিন্ন দেশে কমিক-কন হয়। যেখানে মুভি-কমিক্সের পাগল মানুষজন একসাথে হয় এবং নিজেদের প্রিয় চরিত্র সেজে ঘুরে বেড়ায়। ভাবলাম আমরা এ রকম কিছু করি, ব্যাস যেমন কথা তেমন কাজ, ২০১১ সালে বন্ধুরা মিলে আয়োজন করে ফেললাম কমিক-কনের। আর পিছে ফিরে দেখতে হয়নি মানুষের রেসপন্স দেখে।

তার মতে কসপ্লে হলো এমন একটি বহুমুখী হবি যে একজন কসপ্লেয়ারকে অনেক কিছু শিখতে হয়। সাধারণত কসপ্লেয়ারদের নিজেদের পোশাক নিজেদেরই বানাতে হয়। আর ওই অনুযায়ী পছন্দের চরিত্রদের মতো পারফরমও করতে হয়। আর এসব বহুমুখী দক্ষতা থাকলেই একজন দক্ষ কসপ্লেয়ার হতে পারে।

আসলে কমিক-কনে কসপ্লে করার অনুভূতি কেমন সেটি জানার জন্য নক দিলাম জনপ্রিয় কসপ্লেয়ার হাফসা সাবিরা আপুকে, যিনি এর মধ্যেই জিতেছেন কয়েকটি কমিক-কনের সেরা কসপ্লের পুরস্কার। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কসপ্লে করার অভিজ্ঞতা কেমন। তিনি বললেন, এক কথায় অসাধারণ, মানুষ আসে কসপ্লে দেখতে, কিছু মানুষ আমার সাজের প্রশংসা করে যা আসলেই ভালো লাগে। নিজের বন্ধু-বান্ধবীদের নিয়ে নিজের প্রিয় চরিত্রের সাজে ঘুরে বেড়ানোর চেয়ে সুন্দর কিছু আসলে চিন্তা করা যায় না। আমি মূলত একটি চরিত্রের প্রতি ভালোবাসা এবং নিজের প্রতিভা প্রকাশের জন্য কসপ্লে করি সাথে মানুষের ভালোবাসা বাড়তি পাওনা। তবে পারফেক্ট কসপ্লে করার জন্য প্রচুর সময় এবং টাকা খরচ করতে হতে পারে। হাফসা আপুর মতে চরিত্র ভেদে ১৫ হাজার পর্যন্ত টাকাও মাসখানেক সময় লাগতে পারে।

কসপ্লে ধীরে ধীরে একটি ইন্ডাস্ট্রিতে পরিণত হচ্ছে। হাফসা সাবিরার মতে একজন কসপ্লেয়ার অন্যদের কসটিউম বানিয়ে দিয়ে অর্থ উপার্জন করতে পারে। আবার বিভিন্ন ইভেন্টের অফিসিয়াল কসপ্লেয়ার হিসেবে টাকা আয় করতে পারে। আবার একজন নন-কসপ্লেয়ার ও কমিক কন আয়োজন করে কিংবা কসপ্লের সাথে সম্পর্কযুক্ত কসটিউম অথবা কসপ্লে কস্টিউম বানানো বিভিন্ন পার্টস আমদানি করে অর্থ আয় করতে পারে। এ দেশে কসপ্লের জনপ্রিয়তা যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি বাড়ছে কসপ্লেসংক্রান্ত জিনিসগুলোর চাহিদা।

বর্তমানের আমাদের দেশে বছরে পাঁচ-ছয়টি কমিক-কন আয়োজিত হয় বছরে বিভিন্ন সময়ে। তবে জুন-জুলাই-অক্টোবর-ডিসেম্বরে বেশি হয়। ঢাকা কমিক-কন, ঢাকা পপ কালচার এক্সপো, গ্রেসসহ বিভিন্ন অর্গানাইজেশন এসব কমিক-কন আয়োজন করে থাকে। এসব কমিক কনের অনুকরণে বিভিন্ন কলেজ যেমন- সেন্ট জোসেফ হাইয়ার সেকেন্ডারি স্কুল, ভিকারুনিসা নূন কলেজ নিজেদের কসপ্লে কম্পিটিশন আয়োজন করে যেখানে যেকোনো স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা অংশগ্রহণ করতে পারে।
যদিও কসপ্লে করতে অনেক সময় ও টাকা খরচ হয় তবুও কসপ্লের মাধ্যমে মানুষ তার স্বপ্ন পূরণ করতে পারে এবং নিজের ক্রাফটিং স্কিলের স্বীকৃতি পেতে পারে। বর্তমান জেনারেশন সুপার হিরো বা নায়ক সাজার মাধ্যমে নায়কের গুণগুলো নিজের মধ্যে গঠন করতে পারে তাহলে হয়তো তারা নৈতিক অবক্ষয় থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারবে। তবে এ ক্ষেত্রে আয়োজকদের সচেতন ভূমিকা রাখতে হবে।

ছবি: তাওহীদ বিন ফয়সাল

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.