দৈনিক বাংলা ও বিচিত্রার সেই সম্পদগুলো কোথায়
দৈনিক বাংলা ও বিচিত্রার সেই সম্পদগুলো কোথায়

দৈনিক বাংলা ও বিচিত্রার সেই সম্পদগুলো কোথায়?-(এক)

অলিউল হক খান

১৯৬৪ সাল থেকে প্রকাশ হয়েছিল দৈনিক (পাকিস্তান) বাংলা, ১৯৭১ সাল থেকে প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক বিচিত্রা। তার পরে প্রকাশিত হয় পাক্ষিক আনন্দ বিচিত্রা এবং স্বাধীনতার পর প্রকাশিত হয়ে বাংলাদেশ টাইমস পত্রিকা সরকারি এক সিদ্ধান্তে ১৯৯৭ সালের নভেম্বর থেকে বন্ধ হয়ে গেল। 

৩৩ বছর দৈনিক বাংলা, সাপ্তাহিক বিচিত্রা ও পাক্ষিক আনন্দ বিচিত্রায় কর্মরত ছিলাম। ১৯৭২-৭৩ সালে দৈনিক বাংলা ছিল সর্বাধিক প্রচারিত জাতীয় দৈনিক এবং সাপ্তাহিক বিচিত্রা ছিল সর্বাধিক প্রচারিত জাতীয় সাপ্তাহিক। ষাটের দশকে দৈনিক পাকিস্তান সরকারিভাবে ন্যাশনাল প্রেস ট্রাস্টের অধীনে প্রকাশিত হতো বলে এই পত্রিকার বেতন কাঠামো বড়ই মর্যাদাসম্পন্ন ছিল। ফলে স্বাধীনতাপূর্ব ও স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে দেশের শ্রেষ্ঠ ও মেধাবী সন্তানেরা এখানে কর্মরত ছিলেন। দেশের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, কবি, লেখক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সম্মিলন ঘটেছিল এই প্রতিষ্ঠানে।
দৈনিক বাংলা ভবনে যাদের দিনরাত যাতায়াত করতে দেখেছিÑ তারা হলেন কবি জসীমউদ্দীন, শওকত ওসমান, মুনীর চৌধুরী, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, আশরাফ সিদ্দিকী, রশীদ করিম, এম আর আখতার মুকুল, আলাউদ্দিন আল আজাদ, জাহানারা ইমাম, ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন, রিজিয়া রহমান, বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, আবদুশ শাকুর, সৈয়দ শামসুল হক, কায়সুল হক, কাইয়ুম চৌধুরী, হাশেম খান, শহীদ কাদরী, আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন, ভূঁইয়া ইকবাল, রফিকুন নবী, ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরী, হাসনাত আবদুল হাই, আবুল হাসনাত, আসাদ চৌধুরী, রফিক আজাদ, বেলাল চৌধুরী, মমতাজউদ্দীন আহমেদ, রোকনুজ্জামান খান, রাহাত খান, আল মুজাহিদী, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, এনায়েতুল্লাহ খান, কাজী জাফর আহমদ, গোলাম মুস্তাফা, মামুনুর রশীদ, সৈয়দ হাসান ইমাম, আবুল হাসান, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, আহমদ ছফা, জিয়া হায়দার, রশীদ হায়দার, ফজলে লোহানী, হেলাল হাফিজ, গিয়াস কামাল চৌধুরী, বেবী মওদুদ, হুমায়ুন আজাদ, সমুদ্র গুপ্ত, জাহিদুল হক, আবিদ আজাদ, আনওয়ার আহমেদ, জুয়েল আইচ, শহীদুল হক খান, সানাউল হক খান, আমজাদ হোসেন, ইলিয়াস কাঞ্চন, দিলারা হাশেম, আসাদুজ্জামান নূর, সেলিম আল-দীন, শওকত আলী প্রমুখ। অনেকের নাম স্মরণ করতে পারছি না বলে দুঃখিত।

দৈনিক পাকিস্তানের প্রথম সম্পাদক ছিলেন বিখ্যাত সাহিত্যিক সাংবাদিক আবুল কালাম শামসুদ্দীন। এরপর সম্পাদক হন শামসুর রাহমান, আহমেদ হুমায়ুন ও চৌধুরী গোলামুর রহমান। তার আগে হাসান হাফিজুর রহমান দৈনিক বাংলার সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি ছিলেন। আবদুল তোয়াব খান ছিলেন বার্তা সম্পাদক। পরে দৈনিক বাংলার সম্পাদক হন। দৈনিক বাংলার আরো দু’জন সম্পাদক ছিলেন দৈনিক ইত্তেফাক থেকে আগত নূরুল ইসলাম পাটোয়ারী এবং দৈনিক পূর্বদেশ থেকে আগত এহতেশাম হায়দার চৌধুরী। ১৯৭৫ সালে বাকশাল সরকারের এক বিশেষ সময়ে এরা দু’জন সম্পাদক-প্রশাসক হয়ে আসেন। কারণ বাকশালের সময়ে মাত্র চারটি জাতীয় দৈনিক রেখে আর সব ক’টি দৈনিক বন্ধ করে দেয়া হয় সরকারি সিদ্ধান্তে।

দৈনিক বাংলার সম্পাদক কবি শামসুর রাহমানকে একবার রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এক রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে সুট, টাই, প্যান্ট পরিহিত দেখে বলেন, আপনাকে এই পোশাকে খুব সুন্দর লাগছে। কবিদেরকে সব সময় দাড়ি-গোঁফ রেখে ঢিলেঢালা পোশাক পরে থাকতে হবে- এমন কোনো কথা নেই।’

শামসুর রাহমান সম্পাদক থাকাকালে শেষ দিকে একটি ঘটনা ঘটে। এরশাদ রাষ্ট্রপতি তখন। তিনি সাপ্তাহিক বিচিত্রায় প্রকাশের জন্য কবিতা পাঠাতেন এবং প্রায় প্রতি সপ্তাহে কবিতাগুলো সাপ্তাহিক বিচিত্রায় প্রথম দিকে ছাপা হতো। একবার সাংবাদিকেরা শামসুর রাহমানকে প্রশ্ন করেন, আপনি এরশাদ সাহেবের যে কবিতাগুলো ছাপেন, ওই কবিতাগুলোর মান কেমন?’ জবাবে কবি বলেন- কবিতাগুলো ছাপার যোগ্য নয়; তবে একজন রাষ্ট্রপতি যখন কবিতা ছাপানোর জন্য দেন, তখন কবিতাটি ছাপানো আমার জন্য অর্ডার হয়ে যায়। বাধ্য হই কবিতাগুলো ছাপতে।’

কথাটি পত্রিকায় প্রকাশের সাথে সাথে এরশাদ সাহেব ক্ষুব্ধ হয়ে শামসুর রাহমানকে দৈনিক বাংলার সম্পাদকের পদ থেকে অপসারণ করেন। শামসুর রাহমান অবশ্য এর বিরুদ্ধে একটি কবিতা লিখেছিলেন। তার সারমর্ম ছিল- যে নাম গাছের পাতায় পাতায় এবং পাখির ঠোঁটে ঠোঁটে, সে নাম মুছে ফেলা যাবে না সহজে। শামসুর রাহমানের শূন্যপদে সম্পাদক হয়ে আসেন সহকারী সম্পাদক আহমেদ হুমায়ূন।

একবার সাপ্তাহিক বিচিত্রার ঈদসংখ্যায় কবি শামসুর রাহমানের একটি বড় উপন্যাস ছাপা হয়। একজন নতুন কবি আমাকে এসে বলেন- খান ভাই, আপনাদের রাহমান ভাইকে এবার দিয়েছি প্রায় কাঁদিয়ে। কেন তিনি একজন বড়মাপের কবি হয়ে ‘বিচিত্রা’য় নিম্নমানের উপন্যাস লিখতে গেলেন? কবি যে নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারলেন।’ বললাম- আপনার এত গা-জ্বালা কেন? আপনার কি সেই জ্ঞান আছে যে, উনি ওই উপন্যাসটি লিখে তার সুনাম একশত গুণ বৃদ্ধি করেছেন। বড় কবি হয়ে উপন্যাস লিখতে পারবেন না- এ ধরনের কথা শুধু আপনার মতো ঈর্ষাপরায়ণ কবির মুখেই শোভা পায়।’

শামসুর রাহমানের গদ্যও ছিল অতি চমৎকার। এই বিশাল ভাণ্ডার পড়ে আছে দৈনিক বাংলা ও সাপ্তাহিক বিচিত্রার বাঁধানো ফাইলে। তার পদ্যের প্রায় সব পাণ্ডুলিপি প্রকাশিত হলেও গদ্যের দিকে প্রকাশকেরা নজর দেননি। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এবং বাংলা একাডেমিকে আবেদন জানাব, শামসুর রাহমানের মতো ব্যক্তিদের সমগ্র সৃষ্টিকর্ম গ্রন্থাকারে প্রকাশের ব্যবস্থা করার জন্য।
একবার আমি অফিসের কাজে বাংলাবাজার যাচ্ছি শুনে কবি অতি বিনয়ের সাথে বলেন- খান সাহেব, কিছু মনে করবেন না। বাংলাবাজারে এক প্রকাশকের কাছে বইয়ের সম্মানী পাবো। দীর্ঘ দিন ধরে ঘোরাচ্ছেন। এ পত্রটি প্রকাশকের কাছে পৌঁছে দিলে তিনি টাকা দেবেন। ওই পরিমাণ টাকার কম দিলে ফেরত দিয়ে আসবেন।’

বাংলাবাজারে প্রকাশকের হাতে চিঠিটি পৌঁছে দিয়ে অপেক্ষা করছি। একটু পরে তিনি টাকাটা দিলেন। গুনে দেখি পত্রের বর্ণিত টাকার অর্ধেক দিয়েছেন মাত্র। টাকাটা ফেরত দিতে উদ্যত হতেই প্রকাশক আমাকে অপেক্ষা করতে বলেন। এরপর পরিমাণমতো টাকা আমার হাতে দিয়ে গুনতে বলেন। সঠিক টাকা বুঝে পেয়ে বিদায় হলাম।

শামসুর রাহমান তার শ্যামলীর বাসভবনে ২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট চিরবিদায় নিয়েছেন। মৃত্যুকে উদ্দেশ করে তিনি লিখেছিলেন- ‘যে দিন মরব আমি সেদিন কী বার হবে, বলা মুশকিল। শুক্রবার, বুধবার, শনিবার? নাকি রোববার? যে বারই হোক, সে দিন বর্ষায় যেন না ভেজে শহর, যেন ঘিনঘিনে কাদা না জমে পলির মোড়ে। সে দিন ভাসলে পথঘাট, পুণ্যবান শবানুগামীরা বড় বিরক্ত হবেন।’

দৈনিক বাংলার সহকারী সম্পাদক এবং পরবর্তীকালে সম্পাদক আহমেদ হুমায়ূনও ব্যক্তিত্ববান লোক ছিলেন। তিনি দীর্ঘ দিন ছিলেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি। তিনি সম্পাদকীয় পাতায় প্রতি শুক্রবার ‘সুপান্থ’ নামে ‘নগর দর্পণ’ লিখতেন। ঢাকা শহর ঘুরে ঘুরে তিনি ওই লেখার মাল-মসলা সংগ্রহ করতেন। কবি হাসান হাফিজুর রহমান দৈনিক বাংলার প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের সাথেও সমভাবে জড়িত ছিলেন। কবি শামসুর রাহমানের সাথে ছিল তার মানিকজোড় সম্পর্ক।

দৈনিক বাংলার সাহিত্য সম্পাদক আহসান হাবীব বড়মাপের একজন সম্পাদক ছিলেন। তার ছেলে মঈনুল আহসান সাবের একজন লেখক ও উপন্যাসিক। একদিন সন্ধ্যায় জিপিওতে জরুরি কাজে গিয়ে দেখি, কবি অনেকগুলো খাম পোস্ট বক্সে ফেলছেন। তিনি বলেন- কয়েকজন লেখকের লেখা ফেরত পাঠালাম। কয়েকজনকে কিছু পরামর্শ দিলাম। সেসব চিঠি নিজ হাতে ডাক বাক্সে ফেলে গেলাম।’ ভাবলাম- দৈনিক বাংলায় পিয়নের অভাব নেই। অথচ মনের প্রশান্তির জন্য আহসান হাবীব নিজ হাতে জিপিওতে এসে চিঠি পোস্ট করলেন। এ জন্যই তিনি বড় কবি হতে পেরেছিলেন।’

১৯৭৩ সালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের বিপরীতে, তোপখানা সড়কে একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন সরকারের নানাবিধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে একটি মারমুখী প্রতিবাদ মিছিলে পুলিশের সাথে প্রচণ্ড সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। তখন পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে গুলি চালিয়ে কয়েকজনকে হতাহত করে। পরের দিন দৈনিক বাংলার প্রথম পাতায় ছাপা হয়- ‘এই হত্যাকাণ্ডে এটাই প্রমাণিত হয় যে, এই সরকারের আর একদণ্ডও ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই।’ এর দুই দিন পরই দৈনিক বাংলার সম্পাদক আবদুল তোয়াব খান ও সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি হাসান হাফিজুর রহমানকে চাকরিচ্যুত করে পররাষ্ট্র দফতরে বদলি করে মস্কোতে পাঠিয়ে দেয়া হয় দু’টি পদে নিয়োগ দিয়ে। (অসমাপ্ত)

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.