চলতি মাসে মিয়ানমারের সাথে চুক্তি : পররাষ্ট্র সচিব

রোহিঙ্গাদের জন্য ব্যয় হবে বাজেটের ১.৭ শতাংশ

নিজস্ব প্রতিবেদক

চলতি অর্থবছরের শেষ ১০ মাসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য অন্তত সাত হাজার ১২৬ কোটি টাকা বরাদ্দ লাগবে। যা বাংলাদেশের ২০১৭-১৮ অর্থবছরের মোট বাজেটের এক দশমিক আট শতাংশ। আর মোট রাজস্বের দুই দশমিক পাঁচ শতাংশ।

এদিকে চলতি মাসের শেষের দিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিয়ানমার সফরে যাবেন। এরপর দুই দেশের মধ্যে একটি জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠিত হবে। এরপর রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে দুদেশের মধ্যে একটি চুক্তি হতে পারে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র সচিব শহিদুল হক।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ও জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনের (ইউএনএইচসিআর) এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।

আজ শনিবার রাজধানীর গুলশানে একটি হোটেলে সিপিডি আয়োজিত এক সেমিনারে এ তথ্য উপস্থাপন করা হয়। ‘রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশের করণীয়’ শীর্ষক এ সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।

মূল প্রবন্ধে তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের কারণে বাংলাদেশ বহুমাত্রিক সমস্যায় পড়েছে। রোহিঙ্গা সংকটের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে অর্থনীতি, সমাজ ও পরিবেশের ওপর। এ তিন খাতে বাংলাদেশ নানা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। অর্থনীতিতে প্রভাব পড়ায় জীবন যাপনের ব্যয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সংকট তৈরি হয়েছে। আর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পর্যটন।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় সামাজিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন সমস্যা, স্থানীয় জনসাধারণের মধ্যে রোহিঙ্গাদের নিয়ে নেতিবাচক ধারণা দেখা দিয়েছে।

পরিবেশের ওপর রোহিঙ্গা সংকটের প্রভাব তুলে ধরে তিনি বলেন, কক্সবাজারে মোট বনভূমির পরিমাণ ২০ লাখ ৯২ হাজার ১৬ একর। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে এরইমধ্যে তিন হাজার ৫০০ একর বনভূমির ক্ষতি হয়েছে। রোহিঙ্গা শরণার্থী অধ্যুষিত এলাকায় বায়ু দূষণ, ভূমিধসের মতো ঘটনা ঘটছে। এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে জীবন-জীবিকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

সিপিডির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. রেহমান সোবহানের সভাপতিত্বে সেমিনার সঞ্চালনা করেন সংস্থার বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

এতে প্রধান অতিথি ছিলেন পররাষ্ট্রসচিব শহীদুল হক।

বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ ডেপুটি হাইকমিশনার ডেবিট এসলে, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার শাখাওয়াত হোসেন, বিশ্ব বুদ্ধিস্ট ফেডারেশনের সভাপতি অধ্যাপক ড. সুকমল বড়ুয়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ প্রমুখ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্র সচিব শহিদুল হক বলেন, চলতি মাসের শেষের দিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিয়ানমার সফরে যাবেন। তখন দুই দেশের মধ্যে একটি জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠিত হবে। এরপর রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে দু’দেশের মধ্যে একটি চুক্তি হতে পারে। মিয়ানমারের সাথে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্ক বজায় রেখেই রোহিঙ্গা ইস্যু সমাধান করতে হবে। একইোথে একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। একাজে সফল হব বলেও আমরা প্রত্যাশা করি।

তিনি বলেন, মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের উপর জাতিগত নিধন অভিযান চালাচ্ছে, এটা আমরা সরাসরি বলতে চাই না। কিন্তু আমরা কোনোভাবেই এ পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য দায়ী নই। শুধুমাত্র মানবিক সহায়তায় এগিয়ে এসেছি। তবে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ একটি সহানুভূতিশীল (রেসপনসিভ) দেশ হতে চায়।

রোহিঙ্গা সঙ্কটের শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক মহলের সাথে বাংলাদেশ কাজ করে যাচ্ছে জানিয়ে শহিদুল হক বলেন, বাস্তব পরিস্থিতি দেখার জন্য আমরা সবাইকে বাংলাদেশে আসার ব্যবস্থা করছি। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এখনো পর্যন্ত আনান কমিশনের প্রতিবেদন গ্রহণ করেনি। এত বিপুল পরিমাণ রোহিঙ্গা এখন বাংলাদেশের জন্য একটি বিরাট বোঝা। বিশ্ববাসীর কাছে আমাদের আর্থিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতা দরকার। কিন্তু রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আন্তর্জাতিক মহল উদ্বেগ বা সহযোগিতা করলেও এখন পর্যন্ত কোনো দেশ একজন রোহিঙ্গাকেও তাদের দেশে নিয়ে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেনি।

অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, যখন কোনো জাতি ধবংস করার উদ্দেশে গণহত্যা পরিচালিত হয়, তখন এটা আর দুই দেশের ইস্যু থাকে না। বিষয়টা তখন আন্তর্জাতিক ইস্যু হয়ে যায়। রোহিঙ্গাদের শরণার্থী (রিফিউজি) বলতে হবে এবং অবশ্যই তাদের ফিরিয়ে নিতে হবে। এজন্য চীন, রাশিয়া ও ভারতে শক্তিশালী প্রতিনিধি দল পাঠানোর পরামর্শ দেন তিনি।

মিয়ানমারে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত অনুপম চাকমা বলেন, আমাদের মাথায় রাখতে হবে যে, মিয়ানমারে চীনের ব্যবসায়িক স্বার্থ রয়েছে। শুধুমাত্র কাচিনের একটি হাইড্রো পাওয়ার প্রজেক্টেই তিন দশমিক ছয় বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ রয়েছে। এছাড়া থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগ রয়েছে। মূলত তাদের বিনিয়োগ বাঁচাতেই এসব দেশ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছে না।

মিয়ানমারে বাংলাদেশের আরেক সাবেক দূত মোহাম্মদ মুসা বলেন, যেসব দেশ মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, সেসব দেশের সাথে বাংলাদেশেরও ভালো সম্পর্ক রয়েছে। এসব দেশে শক্তিশালী প্রতিনিধি দল পাঠিয়ে তাদের বুঝাতে হবে। তিনিও ভারত, চীন ও রাশিয়ায় প্রতিনিধি দল পাঠানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

সভায় সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ফারুক সোবহান বলেছেন, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার অনেকগুলো অর্থনৈতিক জোটে জড়িত। তাই বাংলাদেশ চাইলেও অনেক কিছু করতে পারে না। রোহিঙ্গাভিত্তিক উগ্রপন্থি গ্রুপ আরসা (এআরএসএ) মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সৃষ্টি বলে মনে করেন তিনি।

সাবেক এই পররাষ্ট্র সচিব বলেন, জিহাদ বা মিলিট্যান্সি দুটিই জটিল বিষয়। এখন রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে মিয়ানমারের ওপর বহুমাত্রিক চাপ সৃষ্টি করে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বসে সমস্যার সমাধান করতে হবে।

সভাপতির বক্তব্যে রেহমান সোবহান বলেন, ভারতীয় উপমহাদেশে জাতিগত সমস্যা দীর্ঘদিনের। সেনাবাহিনী এসব ইস্যু জিইয়ে রাখে, তারাই এর সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের হাতেই এর চূড়ান্ত সমাধান রয়েছে। তবে জাতিগত নিধন বন্ধে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। রোহিঙ্গা সমস্যায় দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব পড়বে এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এ সমস্যা বেশি দিন জিইয়ে রাখা যাবে না। এজন্য আন্তর্জাতিক মহলকে সাথে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নিতে হবে।

ড. দেবপ্রিয় বলেন, বিশ্বব্যাপী ৬৫ মিলিয়ন মানুষ এখন উদ্বাস্তু। একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ চতুর্থ সর্বোচ্চ উদ্বাস্তু আশ্রয়দাতা। কিন্তু বাংলাদেশে অর্থনৈতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এটা বিরাট বোঝা বলা যায়। এটা বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্চ উল্লেখ করে তিনি বলেন, সমস্যা সমাধানে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। নিতে হবে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি উদ্যোগ।

অধ্যাপক ড. সুকমল বড়ুয়া বলেন, এটি একটি মানবজাতির সমস্যা। মানবতার সমস্যা। মুসলিম বা বুদ্ধ বলে তাদের আখ্যায়িত না করে মানুষ হিসেবে সমস্যার সমাধান করতে হবে।

রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারকে বাধ্য করতে ছয়টি প্রস্তাব করে সিপিডি। এর মধ্যে ‘বিমসটেক’ ও ‘বিসিআইএম’ এর মতো আঞ্চলিক জোটের মাধ্যমে মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করা, অতিরিক্ত আঞ্চলিক জোট যেমন ‘আসিয়ান’ এর মতো জোটকে জড়িত করে সমস্যা সমাধানে কাজ করা।

এছাড়া রোহিঙ্গাদের জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে সম্পদের যোগানের ব্যবস্থা করা, জেনেভা বৈঠক পরবর্তী ফলো-আপ মিটিং করে অর্থ সংগ্রহে এখনই প্রস্তুতি নেয়া এবং বিশ্বব্যাংকের মতো দাতা সংস্থার কাছ থেকে রোহিঙ্গাদের জন্য শুধুমাত্র অনুদান হিসেবে সহায়তা সংগ্রহ এবং রোহিঙ্গা ও দেশের দক্ষিণাঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.