কোরিয়ায় যুদ্ধ কিভাবে এড়ানো যায়
কোরিয়ায় যুদ্ধ কিভাবে এড়ানো যায়

যুক্তরাষ্ট্র-উত্তর কোরিয়া যুদ্ধ অনিবার্য?

জিমি কার্টার

বিশ্ব যত দূর জানে, আমরা আরেকটি কোরীয় যুদ্ধের মুখোমুখি। এই সম্ভাব্য যুদ্ধে কোরিয়া উপদ্বীপ, জাপান, প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত আমেরিকার দূরবর্তী বা বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ড বা অঞ্চলগুলো মারাত্মক পরিণতি ভোগ করবে। সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডও এর ক্ষতি থেকে মুক্ত থাকতে পারবে না। বিশ্বশান্তির জন্য এটা হচ্ছে অত্যন্ত মারাত্মক বিদ্যমান হুমকি। এটা একান্ত প্রয়োজনীয় যে, পিয়ংইয়ং ও ওয়াশিংটনকে তীব্র উত্তেজনা প্রশমনের জন্য কিছু পথ খুঁজে বের করতে হবে এবং একটি স্থায়ী, শান্তিপূর্ণ চুক্তিতে পৌঁছতে হবে।

২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে পিয়ংইয়ং এবং দেশটির গ্রামাঞ্চল সফর করার সময় উত্তর কোরিয়ার পদস্থ কর্মকর্তা এবং সাধারণ নাগরিকদের সাথে দীর্ঘ সময় আলাপ-আলোচনা করেছি। আমি তাদের (মহান নেতা) কিম ইলসুং, সুপ্রিম পিপলস অ্যাসেমব্লির প্রেসিডিয়ামের প্রধান কিম ইয়্যাং নেম এবং অন্যান্য নেতাকে সরকার নিরাপদ রাখার ব্যাপারে সম্পূর্ণরূপে বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন এবং আত্মত্যাগী, উভয় গুণে গুণান্বিত দেখতে পেয়েছি।

উত্তর কোরিয়ার কর্মকর্তারা সব সময় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সরাসরি আলাপ-আলোচনা করার দাবি জানিয়ে আসছেন। তারা আলোচনার মাধ্যমে এখনো বিদ্যমান ১৯৫৩ সালের যুদ্ধবিরতির বদলে একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তি সম্পাদন করতে চান। উল্লেখ্য, ১৯৫৩ সালের যুদ্ধবিরতি কোরীয় যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছিল। উত্তর কোরীয়রা অবরোধ বা নিষেধাজ্ঞার অবসান এবং শান্তিপূর্ণ উত্তর কোরিয়ার ওপর কোনো সামরিক হামলা না করার নিশ্চয়তা চান। অর্থাৎ, তারা তাদের দেশ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্ক কামনা করেন।

উত্তর কোরিয়ায় অনাহারক্লিষ্ট লোকদের দেখেছি। এখনো সেখানে লাখ লাখ মানুষ দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাসে খাদ্যের অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরছে; কিন্তু এই অবস্থায়ও মনে হয়, তারা তাদের সর্বোচ্চ নেতার অনুগত। সম্ভবত তারাই পৃথিবীর সর্বাধিক নিঃসঙ্গ মানুষ। আর প্রায় সর্বসম্মতভাবে মনে করা হয় যে, তাদের জন্য বৃহত্তম হুমকি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেই তাদের ওপর আগে হামলা চালানো হবে।

উত্তর কোরীয় নেতৃবৃন্দের সর্বাধিক অগ্রাধিকার হচ্ছে, তাদের সরকারকে রক্ষা করা এবং যথাসম্ভব সরকারকে বাইরের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত রাখা। তারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বাইরের প্রভাব অথবা চাপ থেকে নিরাপদ রয়েছে। বর্তমান নেতা কিম জং উনের সময়ে এই দায়মুক্তি চীনের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হয়েছিল।

উল্লেখ্য, চীনা নেতৃবৃন্দ উত্তর কোরিয়ার সরকারের পতনের বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চেয়েছিলেন। অথবা তারা পরমাণু অস্ত্র সজ্জিত জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার শক্তি অর্জনের বিষয়ে গভীরভাবে বিবেচনা করছিলেন।

এখন পর্যন্ত কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ উত্তর কোরিয়াকে একটি ভয়ঙ্কর ও উৎসর্গীকৃত সামরিক বাহিনী গঠন করা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। তাদের সামরিক বাহিনীর হাতে দূরপাল্লার পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। এই ক্ষেপণাস্ত্রের রয়েছে বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ব্যবহারের উপযোগিতা। পরমাণু অস্ত্রমুক্ত লিবিয়ার ক্ষেত্রে কী ঘটেছে তা দেখার পর এবং ইরানের পরমাণু চুক্তির সাথে সংশ্লিষ্ট থাকার ব্যাপারে আমেরিকার সন্দেহজনক অবস্থান মূল্যায়ন করে উত্তর কোরিয়ার এখন সম্পূর্ণ অস্ত্রমুক্ত হওয়ার বিষয়ে সম্মত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।

এই সঙ্কট সমাধানের জন্য উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক স্থাপনায় সামরিক হামলা চালানোসহ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত অন্যান্য সুপারিশ বা পরামর্শের মধ্যে রয়েছে অত্যধিক কঠোর অর্থনৈতিক শাস্তি এবং যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মধ্যকার অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির মতো চীন আর উত্তর কোরিয়ার মধ্যে ও একই ধরনের একটি সুরক্ষিত পরমাণু চুক্তি করা। এ ছাড়া পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী সব রাষ্ট্র কর্তৃক তাদের অস্ত্রভাণ্ডারের বিস্তৃতি না ঘটানো এবং যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়ার বার্ষিক সামরিক মহড়ার অবসান ঘটানোর মধ্য দিয়ে অস্ত্র বিস্তাররোধ চুক্তির সত্যিকার বাস্তবায়ন। এসব বিকল্পে সবগুলো দূরপাল্লার পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী একটি দেশের নেতাকে ভয় দেখিয়ে নিবৃত্ত করা অথবা উপদেশ দিয়ে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। দূরপাল্লার পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী এই দেশটি নিজেকে রক্ষা করার জন্য যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছে, তাতে সবাই দেশটির অস্তিত্বকে হুমকি বলে মনে করছে।

তাদের কেউ বর্তমান সঙ্কটের অবসান ঘটাতে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো পথ দেখিয়ে দেননি। কারণ পিয়ংইয়ং সরকার মনে করে তাদের অস্তিত্ব এখন বিপন্ন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন বলেছেন, ‘পিয়ংইয়ংয়ের সাথে আমাদের যোগাযোগের পথ আছে। আমরা অন্ধকারে নেই।’ তার এই বক্তব্য উত্তেজনা প্রশমনের জন্য প্রথম একটি ভালো পদক্ষেপ।

যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে শান্তি আলোচনার জন্য উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল পাঠানোর প্রস্তাব দেবে অথবা পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য একটি স্থানে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনসহ একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সমর্থন দেবে।হ

লেখক : সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট, কার্টার সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা।

ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে ভাষান্তর : মুহাম্মদ খায়রুল বাশার

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.