চাওয়া-পাওয়া

চারাগল্প
মো: মাঈন উদ্দিন


‘বউয়ের মুখ চেপে ধরে জব্বার। না, আমি বেঁচে থাকতে তোমাকে মানুষের কাছে হাত পাততে দিব না। আমিই বরং পথে নামব।’
বাজারের প্রবেশপথে একটি বাটি সামনে নিয়ে বসে আছেন জব্বার। পায়ের গোড়ালিতে দগদগে ঘা। মানুষজন ঘা দেখে দয়াপরবশ হয়ে কিছু অর্থ দান করে যায়।
ভিক্ষা করতে জব্বারের আর লজ্জা লাগে না। প্রথম যেদিন তিনি রাস্তায় বাটি হাতে নেমেছিলেন, লজ্জায় তার চোখ বন্ধ হয়ে এসেছিল। এক পরাবাস্তবতা তাকে ভিক্ষাবৃত্তি বেছে নিতে বাধ্য করেছে। অথচ এমনটা হওয়ার কথা ছিল না।
প্রথম ছেলে যেদিন জন্ম নেয় সেদিন জব্বার যেন আকাশের চাঁদ দুই হাতের মুঠোয় পান। ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলেন জব্বার। ছেলের মুখের হাসি দেখে জাগতিক সব সুখের স্বাদ পেয়েছিলেন। তখন তিনি জওয়ান ছিলেন। পুকুরভরা মাছ ছিল, গোয়ালভরা গরু ছিল। কত সুখের সংসার ছিল তার। দুই বছর পর একটি মেয়ে জন্মেছিল। কী ফুটফুটেই না ছিল মেয়েটি! কিন্তু নানা অসুস্থতায় ভুগছিল মেয়েটি। অনেক অর্থ ব্যয় করেও অবশেষে মেয়েটিকে বাঁচিয়ে রাখা গেল না।
ছেলের বয়স যখন সাত, তখনই আরেক বিপদ নেমে এলো তার সংসারে। হাতের পাঁচ একমাত্র ছেলে আক্রান্ত হলো দুরারোগ্য ব্যাধিতে। জব্বারের চোখের সামনে শুধুই অন্ধকার। একমাত্র ছেলের কিছু হলে কী নিয়ে বাঁচবেন তিনি। ডাক্তারকে বললেন, ‘ডাক্তার সাব, আমার চোখের মণিকে আপনি সুস্থ করুন, যত টাকা লাগে আমি দিব।’ ডাক্তারের পরামর্শে ছেলেকে ইন্ডিয়ায় নিয়ে যাওয়া হলো। চিকিৎসা করানো হলো। আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে উঠল তার একমাত্র ছেলে কিন্তু সহায়-সম্পত্তি সব বিক্রি করে নিঃস্ব হলেন জব্বার। তারপরও সান্ত্বনা পেত এই ভেবেÑ ‘একমাত্র ছেলে বেঁচে না থাকলে কী হতো সম্পত্তি দিয়ে। ছেলে বেঁচে থাকলে এ রকম সম্পত্তি কত হবে!’ একদিন জব্বারের স্ত্রী আদুরে গলায় বায়না ধরলেনÑ দেখো, আমাদের তো আর দশটা-পাঁচটা ছেলে না। একটা মাত্র ছেলে। আমি ছেলেকে বিয়ে করাতে চাই। ছেলের বউয়ের মুখ দেখতে চাই। নাতি-নাতনী দেখতে চাই।
কিন্তু কিছু দিন যেতে-না-যেতেই তার সংসারে আবার দুর্যোগ নেমে এলো। ছেলেবউ তো নয়, সাক্ষাৎ দজ্জাল এসে ঘরে ঢুকেছে! কথায় কথায় ঝগড়া করে। জব্বারের স্ত্রীকে সহ্যই করতে পারে না মেয়েটা। বিশ্রী ভাষায় গালাগাল করে। কিছু বলতে গেলে আত্মহত্যার হুমকি দেয়। জব্বার চুপসে যানÑ
একমাত্র ছেলেকেও একসময় অপরিচিত মনে হয়। বাবা-মাকে দেখলেও মুখ কালো করে রাখে। দেখেও না দেখার ভান করে। একদিন ছেলের বউ জব্বারের মুখের ওপর বললÑ সব সম্পত্তি বিক্রি করে পেটের মধ্যে ঢুকিয়েছেন। নাতি-নাতনীদের জন্য রাখেননি তো কিছুই। এ বাড়িতে এসে একটা ভাতের হাঁড়ি ছাড়া আর কী পেয়েছি? জব্বার উত্তরে বলেনÑ ছেলের চিকিৎসা খরচ দিয়েই তো আজ আমি নিঃস্ব। ছেলের বউ মুখে ভেংচি কাটে। বলে, সে তো নিজেদের সুখের জন্যই।
ভবেছেন ছেলে বড় বড় মাছ কিনে আনবে আর আপনারা গালভরে খাবেন। ছেলের বউয়ের এরূপ আচরণে ভীষণ আহত হন জব্বার।
একসময় সুখের সন্ধানে ছেলে-ছেলের বউ ঢাকা শহরে পাড়ি জমায়। খোঁজখবর নেয় না বাবা-মায়ের। এ দিকে জব্বার মাছ ধরে বিক্রি করে ভালোই চলছিলেন। হঠাৎ একদিন মরা শামুকে পা কেটে যায় তার। পচন ধরে ক্ষতস্থানে। মাছ ধরা বন্ধ হয়ে যায়। অর্ধাহারে-অনাহারে বিছানায় পড়ে থাকেন। একমাত্র সম্বল ভিটেবাড়ি বিক্রি করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন জব্বার। কিন্তু তার স্ত্রী বাধা দিলেনÑ না, অন্তত এই ভিটেবাড়িটা নাতিদের জন্য রেখে যেতে চাই। প্রয়োজনে আমি মানুষের কাছে চেয়েচিন্তে তোমাকে খাওয়াব। বউয়ের মুখ চেপে ধরেন জব্বার। না, আমি বেঁচে থাকতে তোমাকে মানুষের কাছে হাত পাততে দিব না। আমিই বরং পথে নামব। স্ত্রীর চোখের জল মুছে, লাঠিতে ভর দিয়ে জব্বার বাটি হাতে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন।
নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.