দৈনিক বাংলা ও বিচিত্রার সেই সম্পদগুলো কোথায়?

অলিউল হক খান

  (দুই)
গতকালের পর
দৈনিক বাংলার সহকারী সম্পাদক ছিলেন নির্মল সেন। স্বাধীনতার পর অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনার সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছিল। ওই মুহূর্তে নির্মল সেন একটি নিবন্ধ লেখেনÑ ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই।’ দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত লেখাটি জাতিকে প্রচণ্ডভাবে নাড়া দেয়।
আরো যারা দৈনিক বাংলায় সম্পাদকীয় বিভাগে ছিলেন তারা হলেন আহমেদ হুমায়ূন, সানাউল্লাহ নূরী, মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ, সালেহ চৌধুরী ও মোস্তফা কামাল। ‘মহিলা মহলের’ সম্পাদক ছিলেন কবি তালিম হোসেনের সহধর্মিণী সাহিত্যিক মাফরুহা চৌধুরী এবং ছোটদের ‘সাতভাই চম্পার’ সম্পাদক ছিলেন আফলাতুন। সিটি এডিটর ছিলেন ফজলুল করিম। চিফ রিপোর্টার ছিলেন আলী আশরাফ। সহকারী বার্তা সম্পাদক ছিলেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের চাচাতো ভাই ফওজুল করিম তারা ভাই।
ফওজুল করিম সাহসী বার্তা সম্পাদক ছিলেন। একবার দৈনিক বাংলা থেকে তিনি একটি চাকরির ব্যাপারে এক যুবককে পাঠালেন জিয়াউর রহমানের কাছে। তিন দিন ঘুরেও যুবকটি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করতে ব্যর্থ হন। চতুর্থ দিন ফওজুল করিম রাষ্ট্রপতিকে প্রায় ধমকের সুরে বলেনÑ ‘তুমি কী রাষ্ট্রপতি হইছো যে, একজন যুবক তোমার সঙ্গে দেখা করতে পারে না তিন দিন ঘোরাঘুরি করেও?’ জিয়া দুঃখ প্রকাশ করে যুবকটিকে পাঠিয়ে দিতে বলেন। তার চাকরির ব্যবস্থা হয়ে যায়। পাকিস্তান আমলে প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইউব খান FRIENDS NOT MASTERS (প্রভু নয় বন্ধু) নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। সেই সময়ে দৈনিক পাকিস্তানের সহকারী সম্পাদক কবি হাসান হাফিজুর রহমান ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি নির্দেশে অত্যন্ত রুষ্ট হলেও গ্রন্থটির অনুবাদ করে দৈনিক পাকিস্তানে ধারাবাহিকভাবে ছাপাতে বাধ্য হয়েছিলেন। তিনিই ১৯৫২’র মহান ভাষা আন্দোলনের প্রথম সঙ্কলন ‘২১ ফেব্রুয়ারি’ সম্পাদনা করেছেন।
আরো যারা দৈনিক বাংলায় ছিলেন তারা হলেন সৈয়দ কামালউদ্দিন, খন্দকার আলী আশরাফ, হাসিনা আশরাফ, হেদায়েত হোসেইন মোরশেদ, সৈয়দ আবদুল কাইহার, শুভ রহমান, মনজুর আহমেদ, কামাল আহমেদ, আমীরুল ইসলাম, এ টি এম শামসুল আলম, সৈয়দ লুৎফুল হক, গোলাম মওলা, কাজী মাসুম, মাহতাবউদ্দিন, আবদুল আওয়াল, কামরুজ্জামান, আবদুল খালেক, সুনীল ব্যানার্জী, মাসুদ আহমেদ রুমী, ওয়াসে আনসারী, জহিরুল হক, কামরুজ্জামান (ফটোগ্রাফার), সাখাওয়াত আলী খান, নাসির আহমেদ, আফজাল প্রামাণিক, তারেক শামসুর রেহমান, দিলীপ দেবনাথ, মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর (নোবেল বিজয়ী ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসের অনুজ), রেজোয়ান সিদ্দিকী, মেসবাহউজ্জামান, সৈয়দ আবদাল আহমদ প্রমুখ।
ঢাকার বাইরের সাংবাদিকদের মধ্যে ছিলেন চট্টগ্রামের সায়ফুল আলম, যশোরের শামছুর রহমান, সিলেটের তবারক হোসেন, পাবনার শামসুল হক, মুন্সীগঞ্জের সফিউদ্দিন আহমেদ, ফরিদপুরের লিয়াকত হোসেন প্রমুখ।
সাপ্তাহিক বিচিত্রা ও আনন্দ বিচিত্রার সম্পাদক ছিলেন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা শাহাদত চৌধুরী। তার আগে বিচিত্রার প্রথম সম্পাদক ছিলেন কবি ফজল শাহাবুদ্দীন। সাপ্তাহিক বিচিত্রা ও আনন্দ বিচিত্রার প্রচারসংখ্যা সর্বাধিকপর্যায়ে উঠেছিল। অর্থাৎ সাপ্তাহিক বিচিত্রার প্রচারসংখ্যা ৭০ হাজারে পৌঁছে। সাপ্তাহিক বিচিত্রা ও সচিত্র সন্ধানী সর্বপ্রথম প্রতি বছর ঈদ সংখ্যায় একাধিক উপন্যাস প্রকাশের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। এক একটি বিশাল আকারের ঈদ সংখ্যায় ছয়-সাতটি উপন্যাস প্রকাশিত হতো। স্বল্পমূল্যে প্রকাশিত উপন্যাস পড়ার এমন অপূর্ব সুযোগ পাঠাভ্যাসের বিপ্লব ঘটায়। তরুণ হুমায়ূন আহমেদের ‘নন্দিত নরক’ উপন্যাস সাপ্তাহিক বিচিত্রায় ঈদ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত হয়ে ব্যাপকভাবে পাঠকনন্দিত হলো। সৈয়দ শামসুল হক, হুমায়ুন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন, রাহাত খান, রিজিয়া রহমান, মঈনুল আহসান সাবের, সেলিনা হোসেনের মতো ঔপন্যাসিকদের উপন্যাস ছাপা হলে তো কথাই নেই। একেবারে হটকেক। অফিসের রেকর্ড কপিগুলোও নিঃশেষ প্রায়। আরো ঈদসংখ্যা প্রকাশের জন্য ভীষণ চাপ। কিন্তু তা কি সম্ভব? তখনকার সময়ে বলা হতো যে, মাঝারিপর্যায়ের ১৬টি দৈনিকের প্রচারসংখ্যার সমান প্রচারসংখ্যা ছিল এককভাবে ‘বিচিত্রা’র। উল্লেখ করা প্রয়োজন, শাহেদ আলীর ‘শা’নজর’, সৈয়দ শামসুল হকের ‘নিষিদ্ধ লোবান’, রিজিয়া রহমানের ‘রক্তের অক্ষর’ উপন্যাস খুবই সাড়া জাগিয়েছিল।
রাজশাহীর চাঞ্চল্যকর নীহার বানু হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত সংখ্যাটি ৭৫ হাজার কপি ছাপা হয়েছিল। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিচিত্রার বিশেষ প্রতিনিধি শফিউদ্দিন আহমেদ ওই সাড়াজাগানো প্রতিবেদনটি লিখে বিপুলভাবে প্রশংসিত হয়েছিলেন। ওই সময়ে বলা হতো, সাপ্তাহিক বিচিত্রায় যে বিশেষ প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়, তা নিয়েই পরের দিন জাতীয় সংসদে আলোচনা হয় এবং প্রতিবেদকের পরামর্শগুলো ‘তৎক্ষণাৎ’ আইনে পরিণত হয়। এ ছাড়া বিচিত্রার অন্যতম আকর্ষণ ছিল শিল্পী রফিকুন নবীর ‘টোকাই’ কার্টুন। বিচিত্রা ও আনন্দ বিচিত্রার সাংবাদিক ও সম্পাদকীয় বিভাগে ছিলেন তারা হলেনÑ শাহরিয়ার কবির, মাহফুজউল্লাহ, মঈনুল আহসান সাবের, সায্যাদ কাদির, চন্দন সরকার, কাজী জাওয়াদ, আবদুল হাই শিকদার, আসিফ নজরুল, সেলিম ওমরাও খান, আশরাফ কায়সার, মাহমুদ শফিক, চিন্ময় মুৎসুদ্দী, শামীম আজাদ, অরুণ চৌধুরী, মাহমুদা চৌধুরী, আকবর হায়দার কিরণ, কবিতা হায়দার, মিনার মাহমুদ, ইরাজ আহমেদ, শিল্পী মাসুক হেলাল, ফটোগ্রাফার শামসুল ইসলাম আলমাজী, রফিকুর রহমান রেকু প্রমুখ।
প্রতিবছর ৩১ ডিসেম্বরের রাতে শাহদত চৌধুরীর হাটখোলার পৈতৃক বাসভবনে বিরাট এক পার্টির আয়োজন করা হতো। সাপ্তাহিক বিচিত্রা ও আনন্দ বিচিত্রা ছাড়াও দেশের সেরা বুদ্ধিজীবী, লেখক, কবি, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, অভিনেতা, অভিনেত্রী, রাজনীতিবিদ এবং বিদেশী কূটনীতিকদের বিপুল সম্মিলন ঘটত। বেগম খালেদা জিয়াকে সর্বপ্রথম ওই পার্টিতে দেখি। তোফায়েল আহমেদকেও একবার দেখেছি।
এটা ছিল বিচিত্রা পত্রিকার একটি সফল জনসংযোগ ‘কর্মসূচি’। সদ্যস্বাধীনতাপ্রাপ্ত বাংলাদেশে এক সকালে সাপ্তাহিক বিচিত্রা কার্যালয়ে এসে উপস্থিত হন আজকের বিখ্যাত জাদুকর জুয়েল আইচ। তিনি এসে বললেনÑ সুদূর সেই দক্ষিণবঙ্গের বরিশাল থেকে এসেছি। মনের আনন্দে জাদু দেখিয়ে মানুষকে আনন্দদান করে থাকি। কিন্তু দুর্ভাগ্য, আমার সব জাদুর সরঞ্জাম পুড়িয়ে দিয়েছে সন্ত্রাসীরা। আমাকে একটু সাহায্য করুন। আপনি দৈনিক বাংলার এমন একজন সাংবাদিকের কাছে আমাকে পাঠান যিনি আমার সম্পর্কে একটি প্রতিবেদন লিখে দেশবাসীকে এ ব্যাপারে জানাতে পারেন।’ তৎক্ষণাৎ দৈনিক বাংলার সাংবাদিক দিলীপ দেবনাথের কাছে জুয়েল আইচকে পাঠালাম। দিলীপ দৈনিক বাংলার ফিচার পাতার দেখাশোনা করতেন। তিনি পরের দিনই দৈনিক বাংলায় জুয়েল আইচ সম্পর্কে বড় আকারে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। এতে জুয়েল অনেক উপকৃত হয়েছিলেন বলে জানিয়েছিলেন।
৬৯-এর গণ-আন্দোলনে দৈনিক পাকিস্তান কার্যালয়ে ও প্রেসে আগুন লাগিয়ে অত্যাধুনিক অফসেট প্রেসটি ভস্মীভূত করে দেয়া হয়। তবে এতে এক দিনেরও বেতন কাটা যায়নি। আরো আনন্দের সংবাদ হলো, ভস্মীভূত অফসেট প্রেসের স্থানে অত্যাধুনিক অফসেট মেশিন আসে। কিছুদিন অবশ্য অন্য প্রেস থেকে দৈনিক বাংলা ছাপার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আবার নতুন আঙ্গিকে দৈনিক বাংলা প্রকাশিত হয়।
সর্বাপেক্ষা দুঃখজনক ঘটনা ঘটে ১৯৯৭ সালের অক্টোবর মাসে। দৈনিক বাংলা, সাপ্তাহিক বিচিত্রা, পাক্ষিক আনন্দ বিচিত্রা ও বাংলাদেশ টাইমসের প্রকাশনা তখনকার সরকার ১ নভেম্বর ১৯৯৭ সাল থেকে বন্ধ ঘোষণা করে। চারটি পত্রিকার কর্মরত সাংবাদিক ও কর্মচারীদেরকে ‘সোনালী’ করমর্দনের মাধ্যম অর্থকড়ি মিটিয়ে তৎক্ষণাৎ বিদায় করে দেয়া হয়। পত্রিকাগুলো নিজস্ব আয়েই চলত। তা সত্ত্বেও সরকারি জরুরি আদেশ বলে তিন দশকের এক বিশাল প্রকাশনা জগতের পরিসমাপ্তি ঘটে এভাবে। দৈনিক বাংলা ও বাংলাদেশ টাইমসের ভবনকে কর্মসংস্থান ব্যাংকের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে প্রতিভাবানদের আলোকে কখনোই নিভিয়ে দেয়া যায় না। তেমনিভাবে দৈনিক বাংলা, বিচিত্রা, আনন্দ বিচিত্রা এবং বাংলাদেশ টাইমসের প্রতিভাবানদের আলোকেও নিভিয়ে দেয়া যায়নি। তারা যে যেখানে আছেন মাথা উঁচু করেই আত্মমর্যাদার সাথে বেঁচে আছেন। শ্রেষ্ঠ পত্রিকাগুলোতে তারা অত্যন্ত সুনামের সাথে কাজ করছেন। দেশের প্রায় সব মিডিয়ায় আত্মমর্যাদার সাথে কাজ করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। দেশের সেরা প্রতিভাবানদের লেখাসমৃদ্ধ দৈনিক বাংলা, বিচিত্রা, আনন্দ বিচিত্রা ও বাংলাদেশ টাইমসের বাঁধানো পত্রিকাগুলো কোন অবস্থায় কোথায় পড়ে আছে এবং জাতির সেই বিশাল সম্পদ আজ কোথায়? দৈনিক বাংলা, বিচিত্রা, আনন্দ বিচিত্রা ও বাংলাদেশ টাইমসের বিরাট গোডাউন ছিল। সেখানে অতি যতেœর সাথে সব পত্রিকার কপি বাঁধিয়ে রাখা হতো। পোকার হাত থেকে বাঁচাতে নিয়মিত কীটনাশক ছিটানো হতো। এ ছাড়া সম্পদকদ্বয়ের কক্ষে বড় আলমারিতে দেশী-বিদেশী মূল্যবান গ্রন্থের বিপুল সংগ্রহ ছিল। সেই মহামূল্যবান সম্পদ আজ কোথায় হারিয়ে গেল? পত্রিকাগুলো ছিল জাতির গবেষণাকর্মের এক শ্রেষ্ঠ সহায়ক ও জ্ঞানের বিরাট ভাণ্ডার; ১৯৬৪ সাল থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত বাংলাদেশের স্থিরচিত্র। তথ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কি ওই রেকর্ডগুলো সংরক্ষণ করা হয়েছে? কোনো আর্কাইভে বা জাতীয় কোনো মহাফেজখানায় কি সংরক্ষণ করা হয়েছে। এর সঠিক তথ্য দেশবাসীর কারো জানা থাকলে এবং পত্রিকার মাধ্যমে সেই তথ্য অনুগ্রহ করে কেউ জানালে ওগুলো দেখে অন্তত দু’ফোঁটা চোখের জল ফেলতে পারব; আর বলতে পারবÑ বিধাতা, তুমি আমাদেরকে ওই ঐতিহ্যবাহী জাতীয় সম্পদগুলো সংরক্ষণের তওফিক দাও।
সমাপ্ত

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.