হায় রোহিঙ্গা হায় কপাল
হায় রোহিঙ্গা হায় কপাল

হায় রোহিঙ্গা হায় কপাল

এম আখতারুজ্জামান

রাখাইনে বেশির ভাগ মানুষই মগ সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। মিয়ানমারে মগদের সংখ্যা দেড় কোটির মতো। অন্যান্য নৃগোষ্ঠী হলো- বর্মি, কারান, সান, চিন, কাচিন, মুন, পিউ প্রভৃতি। বার্মা বা মিয়ানমারের সাড়ে পাঁচ কোটি লোকের মধ্যে মগরা বেশ ক্ষমতাশালী। অং সান সু চির বাবা অং সান একজন গণতান্ত্রিক নেতা। তিনি কারান, সান, চিন প্রভৃতি জাতির জন্য স্বায়ত্তশাসন দিতে চেয়েছিলেন; কিন্তু তিনি নিহত হওয়ার পর বার্মায় এদের আর স্বায়ত্তশাসন দেয়া হয়নি। মগদের দাপটে এখন জাতিগত নিপীড়ন চরম আকার ধারণ করেছে।

আজকের দুর্দশাগ্রস্ত রোহিঙ্গারা হঠাৎ করেই আরাকান বা রাখাইনের বাসিন্দা হয়নি। এরা বাঙালি নয়, বেশির ভাগ বাংলাদেশেরও নয়। তাদের ভাষাকেও বলা হয় রোহিঙ্গা ভাষা। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, অস্ট্রীয় জাতির একটা অংশ আজ থেকে সাড়ে তিন হাজার বছর আগে আরাকান অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। এরা কুরুখ নামে পরিচিত। এ সময় মধ্যপ্রাচ্যসহ এশিয়ার পূর্বাংশেও জাতিগত বিপর্যয় ঘটে। আমরা জানি, সাড়ে তিন হাজার বছর আগে জরথ্রুস্ত্রদের অত্যাচার, নিপীড়ন-নির্যাতনে আর্যরা পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়। তারা ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে ‘সাত সমুদ্র’ পাড়ি দিয়ে পশ্চিম ভারতে আসে।
সাত সমুদ্র অর্থাৎ সিন্ধু নদের পাঁচটি উপনদী, যথা- শতদ্রু, ইরাবতি, চন্দ্রভাগা, বিতস্থা ও বিপাশা। এর সাথে সূর্য নদী ও সিন্ধু নদ মিলিয়ে এই সাত বড় নদীকে তারা সাত সমুদ্র বলত। আমরা প্রবাদ-প্রবচন ও উপকথাতেও সাত সমুদ্র তের নদীর অনেক কাহিনী শুনেছি নানা গল্পে। এই সমসাময়িক সময়েই দক্ষিণ দিক থেকে ‘পিউ’ এবং ভারতবর্ষের পূর্বাংশ থেকে ‘মিন’ জাতির আগমন ঘটে। এদের দিয়েই পাগান রাজ্য গঠিত হয়। পাগান বার্মার পূর্বনাম। বার্মা নাম ইংরেজদের দেয়া।

এ অঞ্চলে বিভিন্ন জাতির আগমনের কারণ, অঞ্চলটিতে ধানসহ নানারূপ খাদ্যশস্য প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিত হতো। জীবনযাত্রা সহজ ছিল। মিয়ানমারের আকিয়াব, সামব্রা, রেথেডং, মংডু, কিওকতা ও পাত্তরকিলা, কাইউক পাইড, পুন্যাগুন, পাউকতাই এলাকায় ক্রমেই বসতি ঘন হয়ে ওঠে। আর্যদের আগমনে স্থানীয় দ্রাবিড়দের সাথে যে যুদ্ধ হয়েছিল, পিউ, মুন প্রভৃতির সাথে সে রকম যুদ্ধের কথা শুনিনি। বার্মায় এভাবে বিভিন্ন জাতির আগমন ঘটে। ইংরেজ আমলে ১৩৯টি জাতিগোষ্ঠীর তালিকা করা হয়। বর্তমানে ১৩৫টি জাতিগোষ্ঠীর তালিকা করা হয়েছে। এর মধ্যে রোহিঙ্গা জাতির নাম নেই।
প্রায় হাজার বছর আগে থেকে আরব বণিকেরা চট্টগ্রাম, আরাকান ও আকিয়াবে কিছু বসতি স্থাপন করে। পরের ৩০০ বছর আরবদের আগমন ব্যাপক হয়। এরপর পারসিক, বাঙালি, তুর্কি, মোগল ও পাঠানদের আগমন ঘটে। এসব মুসলিম জাতির বৈশিষ্ট্য হলো, তারা ঔপনিবেশিক ইংরেজদের মতো স¤পদ লুণ্ঠন করে দেশে নিয়ে যেত না। তারা বসতি স্থাপন করে নিজেরাই স্থানীয়দের সাথে মিলেমিশে স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে যেত।

ক্রমে আরাকান এলাকায় মুসলিমদের প্রভাব ব্যাপক আকারে বেড়ে যায়। ১৪৩০ খ্রিষ্টাব্দে আরাকানে স্বাধীন মুসলিম রাজত্ব কায়েম হয়। ফারসি হয় রাজভাষা। তখন ফারসি ভাষা ও মুসলিম নাম অতি সম্মানের সাথে দেখা হতো। আশপাশের অনেক রাজা মুসলিম নাম ধারণ করে রাজ্য শাসন করতেন। এটা তাদের কাছে সম্ভ্রম ও সম্মানের বিষয় ছিল। আরাকান সমৃদ্ধশালী হয়ে ওঠে। আরাকানের মুসলিম রাজারা বার্মা রাজাদের অনেক সাহায্য সহযোগিতা করতেন।

আরাকান রাজ্য সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিল্প, বাণিজ্যে প্রভূত উন্নতি ও ব্যাপক সুনাম অর্জন করে। আরাকান রাজ্যের রাজসভা রোসান বা রোসাঙ্গ রাজসভা নামে পরিচিত। এই রাজসভার প্রধানমন্ত্রী মাগন ঠাকুর সাহিত্য সংস্কৃতিতে ব্যাপক উৎসাহ প্রদান করতেন। ওই রাজসভায় বাঙালি কবি, মহাকবি আলাওলের নাম সর্বজনবিদিত। তার লেখা কালজয়ী মহাকাব্য পদ্মাবতী ব্যাপক সুনাম অর্জন করে। ভারতের সংস্কৃতি কবি জায়সী পদুমাবত নামে এ মহাকাব্যের অনুবাদ করেন সংস্কৃতি ভাষায়। সারা ভারতে এ মহাকাব্য ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। অসমাপ্ত কাব্য সতী ময়না ও লোর চন্দ্রানী এ সময়েরই লেখা। পরবর্তীকালে বাঙালি কবি দৌলত কাজী যা সমাপ্ত করেন। এ সময় ‘তোহফা’ নামের বিখ্যাত গ্রন্থের অনুবাদ একটি সমৃদ্ধ সাহিত্য কর্মকাণ্ড।

মোগল সম্রাট শাজাহানের চার পুত্র দারাশিকো, শাহসুজা, আওরঙ্গজেব ও মুরাদ। পুত্র চতুষ্টয়ের মধ্যে সিংহাসন নিয়ে এক সময় ভাতৃঘাতী যুদ্ধ শুরু হয়। শাহসুজা ভ্রাতৃযুদ্ধে সঙ্কটাপন্ন হয়ে আরাকান রাজদরবারে আশ্রিত হন। কিন্তু আওরঙ্গজেবের আক্রমণের ভয়, তারও চেয়ে তাদের মোগল দরবার থেকে বয়ে আনা প্রচুর ধনস¤পদের লোভে আরাকান রাজ শাহসুজাকে হত্যা করেন। তার কন্যাকে জোরপূর্বক বিয়ে করতে চাইলে কন্যা সঙ্গী-সাথী নিয়ে আত্মহত্যা করেন। পরবর্তীকালে মোগল সম্রাটের সম্মানহানির জন্য প্রতিশোধ যুদ্ধে আরাকান অনেক দুর্বল হয়ে পড়ে। এর পরও প্রায় শতবর্ষ কালব্যাপী আরাকান রাজন্যবর্গ আরাকান শাসন করেন। অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে ১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দে বার্মারাজ বোদাপায়া এক যুদ্ধে আরাকান দখল করে নেন। ২২ হাজার বর্গমাইলের স্বাধীন মুসলিম দেশ আরাকান স্বাধীনতা হারায়।

আরাকানের রোসাঙ্গ রাজ্যের বাসিন্দারাই রোহিঙ্গা। রোহিঙ্গা নামের উৎপত্তি স¤পর্কে এক মন্তব্যে বলা হয়, ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি ইসলাম প্রচারের জন্য ত্রয়োদশ শতকে লোকজন পাঠান আরাকানে। তারা এলাকার নাম দেন ‘রোহ’। এ থেকেই রোহিঙ্গা নাম হয়েছে। অন্য মতে, আরব বণিকেরা বাণিজ্যে এসে জাহাজডুবির ফলে ‘রহম’, ‘রহম’ বলে চিৎকার করছিল। স্থানীয় জনগণ এদেরকে ‘রহম’ জাতির লোক বলে ভেবে নেয়। এ থেকেই রোহিঙ্গা নাম হয়েছে। অন্য এক মতে, আরাকানের এক সময়ের রাজধানী ছিল ‘ম্রোহঙ্গ’। কালক্রমে এ ম্রোহঙ্গ শব্দই রোহঙ্গ বা রোহিঙ্গা হয়েছে। বেশি গ্রহণযোগ্য মত হলো, আরাকান রাজসভার নাম বলা হতো রোসান বা রোসাঙ্গ।

আমাদের দেশে ও মধ্যপ্রাচ্যে ‘স’কে ‘হ’ উচ্চারণের রেওয়াজ আছে। যেমন- উত্তর টাকার হাড়ি, যা আসলে সত্তর টাকার শাড়ি। এভাবে ‘স’কে ‘হ’ উচ্চারণ করা হয়। তেমনি ইরান, তুরস্ক প্রভৃতি মুসলিম দেশে সিন্ধু নদের সিন্ধকে হিন্দ উচ্চারণ করা হতো। এ কারণেই সিন্ধু এলাকা বা তার পূর্বাঞ্চলকে ‘হিন্দুস্তান’ নামে অভিহিত করা হতো। একইভাবে এ অঞ্চলের যত লৌকিক ধর্ম আছে, সব ধর্মকেই হিন্দু ধর্ম বলা হতো। বেদ ধর্ম গ্রন্থের সমর্থক বৈদিকেরা, উপনিষদ সমর্থক ব্রাহ্মণরা, পুরাণ ধর্ম গ্রন্থ অষ্টাদশ পুরনানী বা ১৮টি পুরাণ (যথা- অগ্নিপুরাণ, চণ্ডী পুরাণ, কল্কি পুরাণ প্রভৃতি) সমর্থক লৌকিক ধর্মগুলো হিন্দু ধর্ম নামে অভিহিত হয়।

যা হোক, রোসান বা রোহাঙ্গ থেকে রোহিঙ্গা শব্দটিরই গ্রহণযোগ্যতা বেশি। মুসলিম বা হিন্দু সবাই রোহিঙ্গা। তাদের ভাষার নামও রোহিঙ্গা। রোহিঙ্গা ভাষায় প্রচুর উর্দু, হিন্দি, আরবি ও ফারসি শব্দ রয়েছে। এ ভাষা বাংলা ভাষা থেকে পৃথক। রোহিঙ্গা ভাষাভাষীরা প্রায়ই বাংলা ভাষা বোঝেন না। বাঙালিরাও রোহিঙ্গা ভাষা বোঝেন না। তাদের ভাষায় চট্টগ্রাম এলাকার কিছুটা টান আছে। এটা ভাষাবিজ্ঞানের গ্রিমস ও গ্রেসামস ল অনুসারে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ঘটে। তবে বাংলা ভাষা ও রোহিঙ্গা ভাষা পৃথক ভাষা। কাজেই রোহিঙ্গারা মোটেই বাঙালি নন, তবে তারা মুসলিম।

রোহিঙ্গারা এখন রাষ্ট্রহীন, নাগরিক অধিকারহীন ভাসমান মানুষ। সরকার নাগরিকত্ব বাতিল করে। মগরা চরম অত্যাচার ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। সেনাবাহিনীর উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে মগদের প্রাধান্য বেশি। সিভিল মগরা ‘মাবাথা’ নামে একটি সংগঠন তৈরি করেছে। (মাবাথা- কমিটি ফর প্রোটেকশন অব ন্যাশনাল অ্যান্ড রিলিজিয়ান) স্থানীয় ভাষায় মাবাথা, সেনা সদস্যদের সংগঠন টেকউচের সাহায্যে গঠিত। তাদের উদ্দেশ্য জাতিধর্ম রক্ষা। এই ঠ্যাঙ্গাড়ে সংগঠন আসলে রোহিঙ্গাদের ধ্বংস করতেই ব্যবহৃত হয়। মগ বৌদ্ধভিক্ষু ভিরাথু নামে এক ভয়ঙ্কর উগ্র নেতা পরিচালনা করেন মাবাথা।

রোহিঙ্গারা তাদের নাগরিক অধিকারের আন্দোলন করলে সন্ত্রাসী হয়। কেন তারা আন্দোলন করে, সে কথা বলার কেউ নেই। তবে তাদের উৎখাত ও হত্যা করতে সবাই তৎপর। সামরিক সরকার ক্ষমতায় থাকার জন্যই অপপ্রচার ও জাতিগত দ্বন্দ্ব উসকে দিয়ে দীর্ঘ দিন ক্ষমতায় ছিল। এখনো আছে সামরিক মার্কা গণতন্ত্র দিয়ে।

লেখক : কেন্দ্রীয় নেতা, ভাসানী ন্যাপ

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.