গ্রিন বিল্ডিং প্রযুক্তি ও লিড প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ
গ্রিন বিল্ডিং প্রযুক্তি ও লিড প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ

গ্রিন বিল্ডিং প্রযুক্তি ও লিড প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ

মো: শাহজাহান আলম

বৈশ্বিক অর্থনীতির চাকা খুব দ্রুত গতিতে ত্বরান্বিত হচ্ছে এবং এর পেছনের মূল চালিকাশক্তি হলো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নব নব আবিষ্কার। জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, ওজোন স্তরের ক্ষয়, জীববৈচিত্র্যের বিলুপ্তি, কার্বন নিঃসরণ এবং পরিবেশের ওপর এ সবের নানামুখী কুপ্রভাব পুরো বিশ্বকে দারুণভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। এসবের ক্ষতিকর প্রভাব দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে সর্বক্ষেত্রে এবং বাংলাদেশে এর প্রভাব হবে আরো মারাত্মক। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা তাই জরুরি। আর এ ক্ষেত্রে গ্রিন বিল্ডিং প্রযুক্তির ধারণা ও চর্চা ফেলতে পারে খুবই ইতিবাচক প্রভাব।

নির্মীয়মান/নির্মিত ভবন বা স্থাপনা প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর নেতিবাচক বা ইতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং এ প্রভাব শুধু ক্ষণিকের জন্য নয় বরং তা চলে যুগ যুগ ধরে। এই দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পরিবেশের অন্যতম উপাদান মানুষসহ সব প্রাণীকেই হজম করতে হয় প্রতিনিয়ত। ইতিবাচক প্রভাবে মানুষ সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করে আর বৃদ্ধি পায় তার কর্মক্ষমতা এবং নেতিবাচক প্রভাবে হ্রাস পায় তার কর্মক্ষমতা ও আয়ুষ্কাল। গ্রিন বিল্ডিং এমন এক প্রযুক্তি যা নির্মিত ভবন বা স্থাপনার ইতিবাচক দিকগুলোকে যেমন বৃদ্ধি করে আর সেই সাথে নেতিবাচক দিকগুলোকে যথাসম্ভব একটা সহনীয় মাত্রায় সীমাবদ্ধ রাখে এবং ভবন বা স্থাপনার মালিকসহ সবাইকে (স্টেকহোল্ডার) একটা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সফলতার সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়।

গ্রিন বিল্ডিংয়ের ধারণা অনেক পুরনো। সম্পদের যথোপযুক্ত প্রয়োগ ও সর্বোচ্চ ব্যবহার, অপচয় বা অযথা ব্যবহার রোধ, পুনঃব্যবহার ইত্যাদি গ্রিন বিল্ডিংয়ের কয়েকটি প্রধান প্রতিপাদ্য পবিত্র কুরআন শরিফে মহান আল্লাহ পাক তাঁর অসংখ্য অগণিত নিয়ামতের কথা উল্লেখপূর্বক বলেছেন : ‘হে বনি আদম, তোমরা প্রতি সালাতে তোমাদের বেশ-ভূষা গ্রহণ করো এবং খাও, পান করো এবং অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি (আল্লাহ) অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না’ (সূরা: আল আ’রাফ, আয়াত ৩১)। আমাদের প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদা তাঁর এক অন্যতম সঙ্গী সাদ রা:কে (যিনি অজু করছিলেন) উদ্দেশ করে বলেন : তুমি এভাবে পানি নষ্ট করছ কেন? এতে সাদ রা: বিস্মিত হলেন এবং নবী করিম সা:-কে জিজ্ঞাসা করলেন- অজুর সময় কি পানি নষ্ট হয়? এর জবাবে নবী সা: বললেন- প্রবহমান নদীর পাশে অবস্থানকালেও একজন মানুষের কখনো পানি অপচয় করা উচিত নয়।

গ্রিন বিল্ডিং শক্তি এবং পানি ব্যবহারে সংযমী হতে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে। এজন্য গ্রিন বিল্ডিংকে নেট জিরো অ্যানার্জি, নেট জিরো ওয়াটার এবং নেট জিরো ওয়েস্ট বিল্ডিং বলে অভিহিত করা হয়। অর্থাৎ এটি একটি রিজেনারেটিভ বিল্ডিং। গ্রিন বিল্ডিং জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে প্রাধান্য দেয়। গ্রিন বিল্ডিংয়ের পরিচালন ও সংরক্ষণ ব্যয় প্রচলিত বিল্ডিং বা স্থাপনার চেয়ে কম; যার কারণে গ্রিন বিল্ডিংকে হাই পারফরম্যান্স বিল্ডিংও বলা হয়ে থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রিন বিল্ডিং প্রযুক্তি প্রয়োগের ফলে আমরা নিম্নোক্ত অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে পারি :
এটি অ্যানার্জি সাশ্রয়ী- প্রায় শতকরা ২৫ ভাগ বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা সম্ভব। প্রায় শতকরা ২০ ভাগ সংরক্ষণজনিত (মেইনটেন্যান্স) খরচ কম। শতকরা ১১ ভাগ পানি ব্যবহার কমানো যায়। গবেষণায় দেখা গেছে শতকরা ২-১৬ ভাগ উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো যায়। প্রায় শতকরা ৩০ ভাগ কার্বন নিঃসরণ কমানো যায়। ভবন বা স্থাপনার গ্রহণযোগ্যতা বহু গুণে বৃদ্ধি পায়।

ইন্টিগ্রেটিভ প্রসেস, মিটারিং এবং কমিশনিং, অ্যানার্জি সিমুলেশন, বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, সিস্টেম থিংকিং, লাইফ সাইকেল কস্টিং ইত্যাদি কর্মসূচি গ্রিন বিল্ডিং প্রযুক্তির কিছু বিশেষত্ব।
গ্রিন বিল্ডিং জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, ওজোন স্তরের ক্ষয়, জীববৈচিত্র্য বিলুপ্তি প্রভৃতির মতো মহাপ্রাকৃতিক দুর্যোগকে মোকাবেলাপূর্বক মানুষের জীবনযাত্রার প্রণালীকে সাবলীল ও সহজতর করে। এ প্রযুক্তি ভবন বা স্থাপনায় বসবাসরত বা কর্মরত সবাইকে কর্মক্ষম রেখে তাদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে যা আমাদের তৈরী পোশাক শিল্পের জন্য জরুরি। কারণ আমাদের পোশাক শিল্প এখনো অনেকটাই শ্রমিকনির্ভর। এ ক্ষেত্রে পণ্যের উৎপাদন খরচ কমাতে তাদের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। গ্রিন বিল্ডিংয়ের ধারণা ভবন বা স্থাপনার অভ্যন্তরীণ পরিবেশের উপাদান, যেমন তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, শব্দ, আলো, সূর্যের আলো ইত্যাদিকে মানুষের জন্য শুধু সহনীয় নয় বরং আরো উপযোগী করার ওপর গুরুত্ব দেয়, যা মানুষের কর্মস্পৃহা বাড়ায়। তা ছাড়া গ্রিন বিল্ডিং সার্টিফাইড কোনো ফ্যাক্টরি বিদেশী ক্রেতাদের কাছেও আকর্ষণীয়। এতে দেশী-বিদেশী অনেক সংস্থা থেকেও অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যায়, যা প্রচলিত ভবনে সম্ভব নয়।

বিভিন্ন দেশে গ্রিন বিল্ডিংয়ের চর্চা ও এর প্রয়োগ শুরু হয়েছে অনেক আগে। গ্রিন বিল্ডিং রেটিং সিস্টেম, এই প্রযুক্তির ওপর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, সমাজে গ্রিন বিল্ডিংয়ের ধারণার প্রচার, ইত্যাদির মাধ্যমে এর চর্চা ক্রমে ক্রমে ব্যাপক থেকে ব্যাপকতর হচ্ছে। বিভিন্ন দেশে গ্রিন বিল্ডিং রেটিং সিস্টেম বিভিন্ন, যেমন যুক্তরাষ্ট্রে LEED, যুক্তরাজ্যে BREEAM, অস্ট্রেলিয়ায় Green Star, কানাডায় LEED Canada/Green Globe, জার্মানিতে DGNB, ইন্ডিয়ায় GRIHA/IGBC ইত্যাদি।

আমেরিকার একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান United States Green Building Council কর্তৃক পরিচালিত LEED (Leadership in Energy & Environmental Design) বিশ্বব্যাপী সর্বাধিক প্রচলিত রেটিং সিস্টেম। এই রেটিং সিস্টেমে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে যেমনÑ প্রকল্পের স্থান এবং যানবাহন, পানি ব্যবহারে দক্ষতা, শক্তি এবং ভূমণ্ডল, সাসটেইন্যাবল সাইট সিলেকশন, ব্যবহৃত মালামালের গুণাগুণ, অভ্যন্তরীণ বাতাসের গুণাগুণ ইত্যাদিতে সর্বমোট ১১০ পয়েন্ট আছে। কোনো একটা বিল্ডিং উপরোক্ত ক্যাটাগরিতে কত পয়েন্ট পেল তার ওপর ভিত্তি করে উক্ত বিল্ডিংয়ের রেটিং অর্থাৎ সার্টিফিকেট নির্ধারণ করা হয়; যেমন লিড প্লাটিনাম, লিড গোল্ড, লিড সিলভার এবং লিড সার্টিফাইড।

প্রতিদিন ২.২০ মিলিয়ন বর্গফুট লিড সার্টিফাইড হচ্ছে। আমাদের দেশও এ ক্ষেত্রে খুব পিছিয়ে নেই। আমাদের দেশের শিল্প মালিকেরা ব্যবসায়িক প্রয়োজনেই তাদের শিল্প প্রতিষ্ঠানকে গ্রিন সার্টিফাইড করার কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন অনেক আগেই। সর্বশেষ তথ্যমতে, বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ৩৬৬টি প্রকল্প গ্রিন সার্টিফিকেশনের জন্য USGBC তে নিবন্ধিত হয়েছে, যার মধ্যে ৫৬টি প্রকল্প লিড সার্টিফিকেট পেয়েছে। তবে হতাশাজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশে গ্রিন বিল্ডিং প্রফেশনাল/কনসালট্যান্ট আছে হাতেগোনা কয়েকজন; এদের মধ্যে সাতজন লিড এপি (Accredited Professional) এবং ১৪ জন লিড গ্রিন অ্যাসোসিয়েটস। বিদেশী কনসালট্যান্ট বিশেষ করে শ্রীলঙ্কান এবং ইন্ডিয়ান কনসালট্যান্ট আমাদের দেশে এ বিষয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। কিন্তু এখানে আমাদের ভূমিকা এখনো নগণ্য যা অতি সত্বর কাটিয়ে ওঠা উচিত।

লেখক : বিএসসি ইঞ্জি: (মেকানিক্যাল- বুয়েট), এফআইইবি, এমবিএ, LEED গ্রিন অ্যাসোসিয়েট
ই-মেইল : info@tengineersbd.com

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.