ইরানে পুরো জাতি ঐক্যবদ্ধ
ইরানে পুরো জাতি ঐক্যবদ্ধ

ইরানে পুরো জাতি ঐক্যবদ্ধ

পার্সটুডে

ইরানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তবর্তী এলাকায় ভয়াবহ ভূমিকম্পে সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৪৪৫ জন নিহত ও সাত হাজার ১৫৬ জন আহত হয়েছেন। ভূমিকম্পে বড় রকমের ক্ষয়ক্ষতির পর যেন পুরো জাতি ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্যের জন্য আরো বেশি ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। এরইমধ্যে একদিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে।

দুর্গত লোকজনকে উদ্ধারের জন্য প্রথম দিকেই যেমন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী জরুরি দিকনির্দেশনা দিয়েছেন তেমনি ঘটনাস্থলে ছুটে গেছেন প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রিপরিষদের বিভিন্ন সদস্য এবং সেনা ও বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কমান্ডাররা।

উদ্ধার তৎপরতা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে ছুটে গেছেন পুলিশ প্রধান, পাশাপাশি আহতদের চিকিৎসার জন্য গেছে মেডিক্যাল টিম। সামগ্রিক উদ্ধার তৎপরতায় বড় ভূমিকা পালন করছে সামরিক বাহিনী ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি।

এমন বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে হাজার হাজার মানুষ আহত হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই জরুরি ভিত্তিতে বাড়তি রক্তের প্রয়োজন হয়। প্রয়োজন হয় চিকিৎসাসেবার। সেই প্রয়োজন মেটাতে জোটবেধে নেমেছেন ইরানের তরুণ-তরুণীরা, সঙ্গে রয়েছে নানা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।

রক্তদান কর্মসূচিতে চলছে স্বেচ্ছাশ্রম আর আগ্রাহীরা রক্ত দেয়ার জন্য রক্তদান কেন্দ্রের সামনে ভিড় জমাচ্ছেন। সুশৃঙ্খলভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে মানবতার সেবায় রক্ত দিয়ে যাচ্ছেন শত শত মানুষ। জাতির প্রয়োজনে এবং দেশের টানে সবাই যেন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে গেছেন এক কাতারে।

মার্কিন-ইসরাইলি ষড়যন্ত্র ঠেকাতে ইরানের আট কৌশল

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জেসিপিওএ চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন প্রত্যাহারের ঘোষণার আগেই ইরান জানিয়ে দিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র বেরিয়ে গেলেই চুক্তির অবসান ঘটবে।

জোট গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ
ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট ইসহাক জাহাঙ্গিরি বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে নানা রকমের মতপার্থক্য বিরাজ করছে এবং এগুলোর সবই ইহুদিবাদী ইসরাইল ও আমেরিকার ষড়যন্ত্রের অংশ। এসব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করার জন্য আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলতে আমাদেরকে অবশ্যই শক্তিশালী অঞ্চলের ধারণা সমর্থন করতে হবে কারণ যদি আমাদের এ অঞ্চল শক্তিশালী হয় তাহলে আমেরিকা ও ইসরাইল এখানে কোনো ষড়যন্ত্র করতে পারবে না। যদি আমরা আঞ্চলিক দেশগুলো শক্তিশালী হই তাহলে অন্য দেশ ও শক্তি আমাদেরকে ক্ষতি করতে পারবে না এবং কোনো সংকটও তৈরি করতে পারবে না। এটাই আমাদের নীতি হওয়া উচিত। এতে যদি আমাদের স্বল্পমেয়াদি স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহলেও আমরা ভবিষ্যতে আমাদের লক্ষ্য অর্জন করতে পারব।

আমরা এমন একটি অঞ্চলে বসবাস করি যেখানে সবসময় নানা রকম সংঘাত লেগেই থাকে এবং সেগুলো হয়ে থাকে বাইরের দেশের হস্তক্ষেপের কারণে। এইসব উত্তেজনার অংশ হিসেবে ইসরাইল নানা পদক্ষেপ ও চক্রান্ত করে থাকে। ইরাক, ইরান ও তুরস্কের মধ্যে সহযোগিতা থাকলে বাগদাদ সরকার চলমান সংকট সহজেই কাটিয়ে উঠতে পারবে। এছাড়া সিরিয়া সংকটে আস্তানা শান্তি প্রক্রিয়া হচ্ছে ইরান ও তুরস্কের মধ্যে যৌথ সহযোগিতার ক্ষেত্রে নিশ্চয়তা প্রদানকারী বিষয়।

দ্রুতগতির যুদ্ধজাহাজ বানানো
ইরান নৌবাহিনী আরো উন্নত এবং শক্তিশালী হচ্ছে। সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে অত্যন্ত দ্রুতগতির যুদ্ধজাহাজ তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছে দেশটি। এসব যুদ্ধজাহাজ ঘণ্টায় ৮০ নট বা প্রায় দেড়শ কিলোমিটার বেগে চলতে পারবে বলে জানিয়েছে দেশটির নৌবাহিনী। নৌবাহিনীর কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল বলেছেন, খুব দ্রুত দেশীয় প্রযুক্তিতে দ্রুতগতির যুদ্ধজাহাজ তৈরির প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি বছরে শেষ থেকেই এই শক্তিশালী এবং উন্নত যুদ্ধজাহাজ তৈরির পরিকল্পনার বাস্তবায়ন দেখা যাবে । সামরিক সরঞ্জাম নির্মাণের ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা অর্জন করছে ইরান।

ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বন্ধ না করা
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি’র বিমান শাখার কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমির আলী হাজিজাদেহ বলেছেন, কোনো অবস্থাতেই তেহরান ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বন্ধ করবে না। যদি দেশের চারপাশজুড়ে দেয়াল তৈরি করা হয় তাহলেও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন স্থগিত করা হবে না। কারণ এটা সম্পূর্ণভাবে দেশীয় প্রযুক্তি এবং নিজস্ব শিল্প। আইআরজিসি ইরানি জাতির স্বার্থ রক্ষা করছে এবং কোনোভাবেই তাদেরকে ধোঁকা দেয়া যাবে না।

আইআরজিসি নিয়মিতভাবে তার ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বাড়িয়ে যাবে কারণ দেশের নিরাপত্তা হচ্ছে সবার আগে। আমাদের দেশ এত শক্তিশালী যে, কেউ হামলা করতে সাহস দেখাবে না বরং এ ধরনের হুমকি হচ্ছে শত্রুদের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার শত্রুতামূলক দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে ওয়াশিংটনের অপরিবর্তনীয় ইস্যু এবং কৌশল। ইহুদিবাদীদের মাধ্যমে মার্কিন নীতি নির্ধারিত হয় এবং এসব হচ্ছে তারই ফসল।

মাথা নত না করা
ট্রাম্পের এই ঘোষণার পর তেহরানে পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দেওয়া এক বক্তব্যে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বলেছেন, ‘ইরানের সঙ্গে বিশ্ব শক্তিগুলোর চুক্তি বাতিলের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের কোনো চাপের কাছে মাথানত করবে না, আত্মসমর্পণ করবে না এবং নত হবে না শক্তিশালী দেশ ইরান।

দুর্নীতিগ্রস্ত, মিথ্যাবাদী, বিশ্বাসঘাতক যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা দাম্ভিকতার সঙ্গে ইরানিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছে। যদিও ইরান সততার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে এবং সৎ মনোভাব নিয়েই এই পথ ধরে চলতে থাকবে। তোমরা মিথ্যাবাদী। ইরান জাতি দৃঢ়ভাবে ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে এবং যেকোনো ধরনের ভুল সিদ্ধান্তের জবাব দেবে ইসলামী প্রজাতন্ত্র।’

প্রতিরক্ষা সক্ষমতা শক্তিশালী করা
ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে রয়েছেন। ট্রাম্প তার বক্তৃতায় ইরানের বিরুদ্ধে কাল্পনিক অভিযোগ উত্থাপন ও গালিগালাজ করেছেন। ইরানের জনগণ কোনো উৎপীড়ক শাসকের খিস্তিখেউড়ের সামনে মাথা নত করার জাতি নয়, এদেশের জনগণ কোনো ধরনের হুমকির সামনে নতি স্বীকার করেনি এবং ভবিষ্যতেও করবে না।

ট্রাম্পের বক্তব্য প্রমাণ করেছে- পরমাণু সমঝোতাকে কেন্দ্র করে ইরান বিদ্বেষী ভূমিকার ক্ষেত্রে আমেরিকা সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়েছে এবং ঐতিহাসিক বাস্তবতা থেকে আমেরিকা অনেক দূরে রয়েছে। বাস্তবতা থেকে ওয়াশিংটন এত দূরে সরে গেছে যে, সে নিজের ইউরোপীয় মিত্রদের কথা শুনতেও রাজি নয়। শত্রুর মোকাবিলায় ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা শক্তিশালী করা হবে।’

পরমাণু সমঝোতা নিয়ে কোনো আলোচনা নয়
জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত গোলামআলী খোশরো বলেন, ‘ইরানের পরমাণু সমঝোতা একটি আন্তর্জাতিক দলিল; কাজেই একক কোনো দেশের পক্ষে এটি বাতিল করা সম্ভব নয়। ইরানের শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচির ব্যাপারে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ঘোষণা শুধু পরমাণু সমঝোতার চেতনা পরিপন্থি নয় সেইসঙ্গে পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটির সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।

আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা- আইএইএ যখন গত ১৩ অক্টোবর তার সর্বশেষ প্রতিবেদনেও পরমাণু সমঝোতার প্রতি ইরানের অবিচল থাকার কথা নিশ্চিত করেছে তখন এই সমঝোতাকে ধ্বংস করার তৎপরতায় মেতে উঠেছে আমেরিকা। পরমাণু সমঝোতা নিয়ে আর কোনো আলোচনা হবে না। সমঝোতা অনুযায়ী ইরানের স্বার্থ রক্ষিত না হলে এটি থেকে ইরান নিজেই বেরিয়ে যাবে।’

ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সক্ষমতা এক লাখ এসডাব্লিউইউ-তে উন্নীতকরণ
ইরানের আণবিক শক্তি সংস্থার প্রধান আলি আকবর সালেহি জানান, ইরান সব সময় আন্তর্জাতিক আইন ও চুক্তি মেনে চলেছে এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ), জাতিসংঘ ও নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিবেদনেও তা স্বীকার করা হয়েছে। চূড়ান্ত পরমাণু সমঝোতা বা জেসিপিওএ থেকে ট্রাম্প সরে গেলে তার বিপরীতে নানা পদক্ষেপ নেয়ার কথা ভাবছে ইরান।

নানা অবস্থার জন্য ইরান প্রস্তুত রয়েছে এবং নিঃসন্দেহে এর যথাযথ জবাব দেয়া হবে। আমেরিকা পরমাণু সমঝোতা লঙ্ঘন করলে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সক্ষমতা এক লাখ এসডাব্লিউইউ-তে উন্নীত করা হবে। ইরান কারো হুমকিতে ভয় পায় না এবং কারো হাসিতে আশাবাদীও হয়ে উঠে না।’

আক্রান্ত হলে কঠোর জবাব দিতে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে রাখা
পরমাণু চুক্তি প্রত্যয়ন না করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার জবাবে ইরানের ডেপুটি কুদস কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইসমাইল গনি বলেন, 'আমরা যুদ্ধবাজ দেশ না। তবে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে পস্তাতে হবে। ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের হুমকি যুক্তরাষ্ট্রেরই ক্ষতি করবে। আমরা ট্রাম্পের মতো অনেককেই কবর দিয়েছি। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কীভাবে যুদ্ধ করতে হবে তা-ও আমাদের জানা আছে। '

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.