আধপেট খাওয়া এই সঙ্কটের সমাধান নয়
আধপেট খাওয়া এই সঙ্কটের সমাধান নয়

আধপেট খাওয়া এই সঙ্কটের সমাধান নয়

মেজর অব: জিল্লুর রহমান

মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন নিপীড়ন ফ্রি স্টাইলে চালাচ্ছে দীর্ঘ দিন ধরে। রাখাইনে মগেরা হত্যা ধর্র্ষণ অগ্নিসংযোগের মহোৎসবে মেতেছে। রোহিঙ্গাদের ভিটেবাড়ি থেকে উচ্ছেদসহ সভ্য পৃথিবীতে নজিরবিহীন জল্লাদের ভূমিকা পালন করছে। দিন যত যাচ্ছে, অত্যাচারের মাত্রা ততই বৃদ্ধি করছে। এখন রোহিঙ্গাদের প্রায় প্রতিটি পরিবারের যুবক-যুবতী মিয়ানমার আর্মির নির্মম হত্যার শিকার। যুবকদের টার্গেট করেছে যেন প্রতিবাদের কোনো শক্তি তাদের না থাকে। এর সত্যতার প্রমাণ মেলে শরণার্থীদের দিকে দৃষ্টি দিলে। দেখা যায়, বেশির ভাগ নারী শিশু ও বৃদ্ধ-বৃদ্ধা। তাদের যুবকদের মগরা হত্যা করেছে, জেলে ঢুুকিয়েছে, এক লাখের বেশি ডিটেনশন ক্যাম্পে আটক রেখেছে, কেউ জঙ্গলে প্রাণের ভয়ে আশ্রয় নিয়েছে, কেউ বা প্রতিশোধের আগুন বুকে নিয়ে বিদ্রোহী হয়ে গা ঢাকা দিয়েছে। মিয়ানমারের কূটকৌশলের ব্যাপারে আমাদের কোনো সরকার গভীরে গিয়েছে বলে মনে হয় না। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তারা রোহিঙ্গা বা আরাকানি বা বার্মিজ সম্বোধন না করে ‘বাঙালি’ বলে ভাঙা রেকর্ড বাজাচ্ছে। নোবেল শান্তি পুরস্কারের নিবু নিবু বাতি নিয়ে সু চি অশান্তির নিবিড় চাষবাস করে বৌদ্ধ জঙ্গি সন্ত্রাসের উন্নত বীজ রোপণ করে যাচ্ছেন। কয়েক দিন আগে এক টিভি সাক্ষাতের পর তিনি একজন সাংবাদিক সম্পর্কে বললেন, সাংবাদিক মুসলমান জানলে তাকে সাক্ষাৎ দিতাম না। প্রমাণিত হলো, চরম মুসলিমবিদ্বেষী এই রমণী। তার কাছ থেকে ইনসাফ পাওয়ার কোনো আশা করা বাতুলতা মাত্র। এমন জাতিবিদ্বেষী মানসিকতার সরকারের সাথে নরম মোলায়েম সুরে কথা বলে ফায়দা হবে কি? তার দফতর মন্ত্রীর সাথে আনুষ্ঠানিক দুদণ্ড কথা বলে সাংবাদিকদের যতই বলা হোক, ‘আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে’, তা বিবেকবান মানুষ বিশ্বাস করে না। ওই মন্ত্রীর জবানের কোনো টুঁ শব্দ শোনা গেল না। আমাদের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিলো আর বাংলাদেশের মুখপাত্র ঢাকঢোল পিটিয়ে বলছেন, মিয়ানমার বন্ধুপ্রতিম দেশ।

বর্মিদের ভুয়া দাম্ভিকতার অবসান হতে পারে উপযুক্ত কৌশল অবলম্বন করা হলে। সোজা আঙুলে ঘি বের না হলে তাদের ঔদ্ধত্যের জবাব দিতে হবে। বাঙালির ইস্পাতকঠিন ঐক্য এবং অসাধ্য সাধনের পটুতা ’৭১ সালে তারা দেখেছে। বঙ্গবন্ধু বলেছেন, আমার বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের সৌম্য শক্তি ক্ষিপ্রতা বীরত্ব দেখে আজদাহা দেহের পাঞ্জাবি সৈনিকের কলিজা পর্যন্ত শুকিয়ে যেত। লড়াকু বাঙালি জাতির ধমনীতে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের রক্ত প্রবাহিত। এ রক্ত হার মানতে জানে না। শুধু জানে দেশের জন্য প্রাণপণ লড়াই করতে।
কূটনৈতিক তৎপরতায় বাংলাদেশের ব্যর্থতা ফুটে উঠেছে। রাষ্ট্র পরিচালনায় মানবিক গুণ দেশের স্বার্থ রক্ষায় কোনো মৌলিক উপাদান নয়। কূটনীতির সাফল্য আনে সামরিক শক্তি। শত্রু সমঝোতার টেবিলে আসতে বাধ্য হয় মিলিটারি অভিযানের ভয়ে। মিয়ানমারের সাথে এখন যথোপযুক্ত ভাষায় কথা বলতে হবে।

বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে ভারত আমাদের পরম মিত্র। আজ জাতীয় সঙ্কটে সেই বন্ধু ভারত আমাদের প্রতিপক্ষের বুকে বুক মিলিয়ে পিঠ চাপড়ে বলছে, ‘তোমাদের সাথে আছি।’ এমন পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিক ব্যর্থতার চরম গ্লানি। ২৫ আগস্টের রোহিঙ্গা জাতি নিধনের অভিযান শুরুর পর কত দিন কেটে গেল, এখনো ভারতকে তার অবস্থান থেকে টলানো যায়নি। ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশকে বুঝতে হবে (ত্রাণের বাইরে) আমাদের বেশি কিছু করার নেই। অথচ এই ভারতের আবদার মেটাতে পোর্ট, ট্রানজিট, বিছিন্নতাবাদের উপদ্রব, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিনা প্রশ্নে বিনা বাক্যব্যয়ে বাংলাদেশ দিয়েছে। ভারতের অন্তরে বাংলাদেশের প্রতি ভালোবাসা ও বন্ধুত্ব থাকলে তারা মিয়ানমারের সাথে থাকতে পারে না।

রাশিয়া আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে দুর্দিনে অসাধারণ অবদান রেখে ঋণী করেছে। সেই থেকে প্রতিটি সরকারের সাথে রাশিয়ার সাথে সুসম্পর্ক অথচ আজ রাশিয়াও মিয়ানমারের পক্ষে সাফাই গাইছে। এমন পরিস্থিতি বলে দেয়, কূটনীতিতে আমরা কত কাঁচা। আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, তুরস্ক, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও জাপান সোচ্চার হয়েছে। বন্ধু খুঁজতে নতুন নতুন জায়গায় যেতে হবে, সনাতনী বন্ধু আমাদের এখন নেই। জাতীয় স্বার্থে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কে বাংলাদেশের রাজনীতিকরা সব কিছুতেই আশু ব্যবস্থা ও জোড়াতালি দিয়ে সমাধানে ব্যস্ত থাকে। জাতীয় স্বার্থের চেয়ে ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার পেছনে মেধা ও সময় বিনিয়োগ করলে হবে না।

চীনের সাথে বেশ আগে থেকে বাংলাদেশের সম্পর্কের উন্নয়ন হয়েছে। আমাদের সমর শক্তিতে চীনের প্রায় একচ্ছত্র ভূমিকা রয়েছে। চীন মিয়ানমারকে রসদ দিয়ে যাচ্ছে; কিন্তু চীনকে কোনো সরকার স্থায়ীভাবে পাশে পেতে আদাজল খেয়ে লাগেনি। চীনকে পরিস্থিতি ও বোঝানোর কোনো দৃশ্যমান কর্মতৎপরতা চোখে পড়েনি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সবাই অপেক্ষায় আছেন কখন প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দেবেন। তখন নড়েচড়ে বসবেন। সামগ্রিক অর্থে যাদের বাংলাদেশের সঙ্কট উত্তরণের জন্য পাশে থাকার কথা, তারা কেউ আমাদের সাথে নেই। সামনের দিনে পাশে থাকবে, তেমন আলামতও দেখা যাচ্ছে না। বর্তমান সঙ্কট সমাধান দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্যে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দরকষাকষিতে মিয়ানমারের সাথে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় স্থায়ী সমাধান আসবে না। বরং ত্রিপক্ষীয় সালিস বাংলাদেশকে সুবিধাজনক অবস্থানে নেবে। জাতিসঙ্ঘকে নিয়ে আলোচনা করলে তারা চাপে থাকত। অথচ দ্বিপক্ষীয় আলোচনাই মন্ত্রী করলেন। জাতিসঙ্ঘকে কি আমন্ত্রণ করা হয়েছে? না কি তারা মধ্যস্থতা করতে অপারগতা প্রকাশ করেছে? চীনের রাজনৈতিক দলের নিমন্ত্রণে আমাদের টিম গেল। সেখানে তাদের সাথে আলোচনা হয়েছে। রোহিঙ্গা নিয়ে স্বল্প কথা স্ফীত কণ্ঠে উঠেছে। এমন রুটিন-দাওয়াত বহু দেশের বিভিন্ন দলকে তারা দেয়। বিএনপিকেও দাওয়াত করেছিল। এ দিকে ফলাও করে প্রচার শুরু হয়েছে, চীন জয় করে এসেছেন। কারা টিমে ছিলেন? তাদের রাজনৈতিক কূটনৈতিক অভিজ্ঞতাই বা কী? রাজপথ গরম করা এবং অনাবশ্যক উচ্চকণ্ঠে কথা বলে দলকানাদের মন তুষ্ট করা সহজ; কিন্তু বিদেশীদের মন জয় করা ততই কঠিন।

বিশ্ব জনমত নিপীড়িত বঞ্চিত অসহায় দুর্বল মানুষের পক্ষে থাকে। তবে সঙ্কট সমাধানে কোনো ভূমিকাই কোনো দিন রাখেনি সফেদ লোকের করুণা। তাদের কৌলীন্য বজায় রেখে নিরাপদ দূরত্বে থেকে লিপ সার্ভিস দেন। সু চির ছবি যুক্তরাজ্য সরিয়ে ফেলেছে, বিভিন্ন দেশে তার কুশপুত্তলিকা দাহ হচ্ছে; সমালোচনার সুনামি বয়ে যাচ্ছে। তাতে কী? দিনের শেষে আমার থলেয় কিছু আসছে।
শরণার্থী সমাধানের জয়ে যারা দিবাস্বপ্ন দেখছেন- তাদের বলি, ইহুদিবাদ ফিলিস্তিন সঙ্কটের জন্ম দেয় ১৮৯৭ সালে। ফিলিস্তিন শরণার্থীদের প্রতি তখন সবার সহানুভূতি ছিল। তবে কিছু বাণী দেয়া ছাড়া পশ্চিমারা কিছুই করেনি। ১৯১৭ সালে ব্রিটেনের বেলফোর ডিক্লারেশন। তারপর দুই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবে পিল কমিশন হলো, পাল্টা আরব লিগ উডহেড কমিশন করল। জর্ডান, সিরিয়া, ইরাক, মিসর ও ইসরাইলের মাঝে যুদ্ধ হলো। প্যালেস্টাইন লিবারেশন অরগানাইজেশন (পিএলও) থেকে আবির্ভূত হলো হামাস। প্রায় শত বছর গেল। শরণার্থী সঙ্কটের কোনো সমাধানের কূলকিনারা আজও দেখা যায়নি।

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আধপেট খেয়ে হলেও ১০ লাখ রোহিঙ্গা খাওয়াব। বাংলাদেশে ভূমি না থাকা সত্ত্বেও গাদাগাদি করে অল্প জায়গায় আমরা কষ্ট করে তাদের থাকতে দিচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী মাতৃমমতা নিয়ে ছুটে গেলেন শরণার্থী শিবিরে। বৃদ্ধাকে জড়িয়ে ধরে অশ্রু বিসর্জন দিলেন। শিশুকে পরম মমতায় কোলে তুলে নিলেন। রোহিঙ্গাদের দুর্দশা দেখে মাতৃ মনে প্রতিবাদের শক্তিশালী ঢেউ এসে আছড়ে পড়েছে, তা তার মুখে ফুটে উঠেছিল। রোহিঙ্গারা উদর ভর্তি খেতে সীমান্ত পাড়ি জমায়নি, তারা এসেছে প্রাণের ভয়ে। বাংলাদেশ সীমিত সম্পদের ওপর চাপ প্রয়োগ করেও তাদের মানবিক চাহিদা পূরণ করছে। এ কাজের উপহার হিসেবে মাদার অব হিউম্যানিটি হওয়া সহজ, তবে জলদি সমাধান পাওয়া যাবে না। আবেগ দিয়ে বেশি অগ্রসর হওয়া যায় না। আবেগ যদি বিবেক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না হয়, সে আবেগের ফল সবসময় কল্যাণকর না।

সু চির মন্ত্রী এলেন, আলোচনা করলেন; চলে গেলেন। কী অগ্রগতি হলো কিছু বুঝলাম না। দুই দেশ ওয়ার্কিং কমিটি করবে, কোন তারিখে, কারা কারা থাকবে, কত তারিখে প্রত্যাবাসন শুরু হবে? মিয়ানমারের নাগরিক যাচাই-বাছাই করার পদ্ধতি কী? এসব হোমওয়ার্ক করে আমাদের মন্ত্রী বাহাদুর তাদের দিয়ে স্বাক্ষর করানোর পদক্ষেপ নিতে পারতেন কি না। সফর আন্তর্জাতিক চাপ প্রশমিত করার চাতুর্য, কাল ক্ষেপণের ফন্দি, ওদের দু-চারজনকে নিয়ে বলবে, বাকি রোহিঙ্গারা আমাদের নাগরিক না।
জাতীয় সঙ্কটে সুদূরপ্রসারী পরিণতি ভেবে রাজনৈতিক দলগুলো ভেদাভেদ ভুলে এক টেবিলে বসে। আমাদের রাজনৈতিক অনৈক্যের ফোকর দিয়ে মিয়ানমার আমাদের ওপর অন্যায্য বোঝা চাপিয়ে দেয়ার সাহস পেতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যের প্রশ্নে এক সাংবাদিক প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করলেন কয়েক দিন আগে। প্রধানমন্ত্রী ধমকের সুরে বললেন, বিএনপির সাথে বসার কথা কখনো বলবেন না।’ এটাই বুঝি দেশের স্বার্থে ‘রাজনৈতিক সমঝোতা’র নমুনা। মিয়ানমার ধরে নিয়েছে বাংলাদেশ দুর্বল, তাই তারা সময় ক্ষেপণ করার পথে যেন হাঁটতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। পরিস্থিতি শান্ত হলে আর মিটিং করতে তারা আসবে না। এমন ডিগবাজি অতীতে তারা অনেক দিয়েছে। ১৯৯২ সালে চুক্তি করেও দু-পাঁচজন রোহিঙ্গা নিয়ে এই দেশের ডাকে সাড়া দেয়নি। তাই carrot and stick policy দিয়েই তাদের মোকাবেলা করতে হবে। মিয়ানমারের সাথে টানাপড়েনের সুরাহা মূলত আঞ্চলিক শক্তির মুঠোয়। 

লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক, রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.