৭ মার্চের ভাষণ ইউনেস্কোর স্বীকৃতিতে সংসদের ধন্যবাদ
৭ মার্চের ভাষণ ইউনেস্কোর স্বীকৃতিতে সংসদের ধন্যবাদ
জাতীয় দিবস ঘোষণার দাবি

৭ মার্চের ভাষণ ইউনেস্কোর স্বীকৃতিতে সংসদের ধন্যবাদ

সংসদ প্রতিবেদক

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ ইউনেস্কোর বিশ্ব প্রমাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে অন্তর্ভূক্ত হওয়ায় ইউনেস্কোসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে সর্বসম্মতক্রমে ধন্যবাদ জানিয়েছে জাতীয় সংসদ। পৃথিবীর অন্যতম এই শ্রেষ্ঠ ভাষণের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে মঙ্গলবার সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ধন্যবাদ প্রস্তাবটি উত্থাপন করলে দীর্ঘ আলোচনার পর সরকার, বিরোধী দল ও স্বতন্ত্র সদস্যদের স্বতস্ফুর্ত সমর্থনে তা সর্বসম্মতক্রমে পাস হয়েছে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে ’পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণ ও রাজনীতির মহাকাব্য’ উল্লেখ করার পাশাপাশি দিনটিকে জাতীয় দিবস হিসেবে ঘোষণার দাবী জানিয়ে বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর দীপ্ত কন্ঠের কালজয়ী এই ভাষণ কেবল বাঙালীর জাতিকে আলোড়িত করেনি, বিশ্ব বিবেককেও নাড়া দিয়েছে। ইউনেস্কোর এ স্বীকৃতি তারই প্রমাণ। তবে ভয় হয়, ইতিহাসের খলনায়ক দানবের দল (বিএনপি-জামায়াত) যদি কোনদিন ক্ষমতায় আসে, তবে আবারও বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী এই ভাষণ নিষিদ্ধ করবে, বঙ্গবন্ধুর কন্ঠ বন্ধ করে দেবে। তাই সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে ষড়যন্ত্রকারী ওই দানবের দলকে আবারও পরাজিত করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বাধীনতার সুফল জনগণের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দিতে হবে।

স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে কার্যপ্রণালী বিধি ১৪৭ বিধির প্রস্তাবের (সাধারণ) ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, যুব ও ক্রীড়া উপমন্ত্রী আরিফ খান জয়, সাবেক খাদ্যমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক, উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদ, সরকারি দলের এ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস, বিএম মোজাম্মেল হক, মনিরুল ইসলাম, সাগুফতা ইয়াসমীন এমিলি, সানজিদা খানম, ফজিলাতুন নেসা বাপ্পী, নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন, উম্মে রাজিয়া কাজল, এনামুল হক, ডা. এনামুল হক, এটিএম আবদুল ওয়াহাব, সাবিনা আখতার তুহিন, বিএনএফের এস এম আবুল কালাম আজাদ, স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ডা. রুস্তম আলী ফরাজী, তাহজীব আলম সিদ্দিকী এবং বিরোধী দল জাতীয় পার্টির ফখরুল ইমাম, পীর ফজলুর রহমান।

প্রস্তাবে বলা হয়- সংসদের অভিমত এই যে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ ইউনেস্কোর বিশ্ব প্রমাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে অন্তর্ভূক্ত হওয়ায় দেশ ও জাতির সঙ্গে আমরা গর্বিত এবং এজন্য ইউনেস্কোসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে জাতীয় সংসদ ধন্যবাদ জানাচ্ছে। আলোচনা শেষে প্রস্তাবটি ভোটে দিলে কন্ঠভোটে সর্বসম্মতভাবে তা গৃহীত হয়।

প্রস্তাবটি উত্থাপন করে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষণ আজ তা প্রমাণিত। ইউনেস্কোর এ স্বীকৃতি ছিল অত্যন্ত প্রত্যাশিত। বঙ্গবন্ধুর অলিখিত ১৮ মিনিটের এ ভাষণ বাঙালি জাতিকে জাতীয় মুক্তির মোহনায় দাঁড় করিয়েছিল। এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের সুষ্পষ্ট দিক নির্দেশনা। তিনি বলেন, পৃথিবীর অন্য কোন ভাষণ এতবার উচ্চারিত হয়নি। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বঙ্গবন্ধুর দীপ্ত কন্ঠের এই ঘোষণা কেবল বাঙালির জাতিকে আলোড়িত করেনি, বিশ্ব বিবেককেও নাড়া দিয়েছে। ইউনেস্কোর এ স্বীকৃতি তারই প্রমাণ। এতে দেশ ও জাতির সঙ্গে আমরাও গর্বিত।

তোফায়েল আহমেদ বলেন, স্বাধীনতার চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ আজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ আজ অগ্রগতির পথে ধাবমান হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর দুটি স্বপ্ন ছিল- এক বাংলাদেশের স্বাধীনতা, অন্যটি বাঙালি জাতির অর্থনৈতিক মুক্তি। প্রথমটা বঙ্গবন্ধু দিয়ে গেছেন। তাঁর দ্বিতীয় স্বপ্ন অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে তাঁরই কন্যা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। বাংলাদেশকে শেখ হাসিনা সারাবিশ্বে উন্নয়নের রোলমডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বাংলাদেশের এই অগ্রযাত্রা কেউ থামাতে পারবে না।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণ। ৭ মার্চের ভাষণের প্রতিটি পংক্তিতে উঠে এসেছে বাঙালি জাতির ইতিহাস, শোষণ-বঞ্চিত হওয়ার ইতিহাস।বঙ্গবন্ধু ছিলেন রাজনৈতিক কবি। ধর্ম-বর্ণ ও জাতির নামে বাঙালি জাতি ছিল বঞ্চিত। হাজার বছরের ইতিহাসে একমাত্র বঙ্গবন্ধুই বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে এনেছেন। নিরস্ত্র বাঙালি জাতিকে একটি মাত্র ভাষণে সশস্ত্র জাতিতে পরিণত করেছেন। আজ খলনায়ককে নায়ক বানানোর চেষ্টা চলে। খলনায়করা ক্ষমতায় এসে বার বার বঙ্গবন্ধুকে ছোট করার চেষ্টা করেছে। এই ভাষণকে তারা নিষিদ্ধ করেছিল। যুগে যুগে যত সংগ্রাম হবে, বিশ্ববাসী স্মরণ করবে এই ঐতিহাসিক ভাষণকে। ভয় হয়, ওই দানবের দল কোনদিন ক্ষমতায় আসে তবে আবারও নিষিদ্ধ হয়ে যাবে ঐতিহাসিক এই ভাষণ, বন্ধ করে দেবে বঙ্গবন্ধুর কন্ঠ। তাই ওই দানবের দলকে অবশ্যই পরাজিত করতে হবে।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেন, বাঙালি জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদই হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ। একটি ভাষণেই তিনি হাজারো বছরের বাঙালি জাতির শোষণ বঞ্চনা তুলে ধরার পাশাপাশি তাদের মুক্তি ও স্বাধীনতার সুষ্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে বাঙালী জাতি সশস্ত্র হয়ে যুদ্ধ করে বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছেন। সারাবিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের জন্য চিরদিন এই ভাষণ অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, ৭ মার্চের ভাষণের প্রতিটি বাক্য নিয়ে একেকটি প্রবন্ধ লেখা যায়। ওই ভাষণ বাংলার সাড়ে ৭ কোটি মানুষকে উজ্জীবিত করেছিলো। ভাষণের মাধ্যমে শেখ মুজিব সারা বিশ্বে রাজনীতির কবি হিসেবে পরিচিত পান।

প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, মাত্র ১৯ মিনিটের কালজয়ী ভাষণে বাঙালি জাতির হাজার বছরের শোষণ, বঞ্চণার বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন। স্বাধীনতার মন্ত্রে সাড়ে সাত কোটি নিরস্ত্র বাঙালি জাতিকে এই একটিমাত্র ভাষণে সশস্ত্র জাতিতে পরিণত করেছিলেন। প্রত্যেকটি ঘরকে একেকটি দূর্গ গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছিলেন। বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধুর ওই নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিলেন।

জাতীয় পার্টির ফখরুল ইমাম বলেন, বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ একটি কালজয়ী ভাষণ, রাজনীতির মহাকাব্য। সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা করলে বোম্বিং করে লাখ লাখ বাঙালিকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল পাকিস্তান। কিন্তু বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার সংগ্রামের ঘোষণার পাশাপাশি সুকৌশলে বক্তব্য দিয়ে পাকিস্তানী হানাদারদের বিভ্রান্ত করেছিলেন।

বিএনএফের এস এম আবুল কালাম আজাদ ৭ মার্চকে জাতীয় দিবস ঘোষণার দাবি জানিয়ে বলেন, বঙ্গবন্ধুর একটি মাত্র ভাষণে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে। কিন্তু অমর ও কালজয়ী এই ভাষণ সংরক্ষণে আমরা ৪৬ বছরেও কিছু করতে পারিনি। তাই ৭ মার্চকে জাতীয় দিবস হিসেবে ঘোষণা করতে হবে।

স্বতন্ত্র সদস্য রুস্তম আলী ফরাজী বলেন, পৃথিবীর অনেক বড় বড় নেতার ভাষণ রয়েছে, কিন্তু তাঁদের কারো ভাষণ ইউনেস্কো গ্রহণ করেনি, করেছে একটি মাত্র ভাষণ। সেটি হলো বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ। কারণ মাত্র ১৮ মিনিটের কালজয়ী ভাষণের মাধ্যমে বাঙালী জাতিকে স্বাধীনতা উপহার দিয়েছেন।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.