প্রকল্পের সময় ও ব্যয় বাড়ানো

অপচয় ও দুর্নীতি আর নয়

রাজউকের বহুলালোচিত পূর্বাচল প্রকল্পে পাঁচ কাঠার একটি প্লটের জন্য ২০০১ সালে আবেদন করে তিন বছর পরে বরাদ্দ পেয়েছিলেন অবসরপ্রাপ্ত একজন চাকুরে। এর দু’টি কিস্তির টাকাও দিয়েছেন, কিন্তু এরপর বারবার ধরনা দিয়েও এ ব্যাপারে আর কোনো খবর পাননি। ১৬ বছর পর জানতে পেরেছেন, ২১ নম্বর সেক্টরে তার প্লটের আজো কোনো উন্নয়ন কাজ হয়নি। একটি পত্রিকায় খবরটি ছাপা হয়েছে ‘প্রকল্পের সময় বাড়ে, ব্যয়ও বাড়ে’ শিরোনামে। ওই চাকরিজীবী দুঃখের সাথে বলেছেন, সারা জীবনের সঞ্চয় ব্যয় করে পূর্বাচলের প্লটটি পেয়েছিলাম। কিন্তু এখন দেখছি, সেখানে নিজে বাস করার আর কোনো আশা নেই। অপর দিকে দু’জন দালাল তাকে বলেছেন, ভূমি রেজিস্ট্রেশন আর প্লান পাস করিয়ে নেয়ার কাজ তাদের দিলে কাজটা শিগগিরই হয়ে যাবে। কথা হলো, যেখানে বাস্তবে প্লটই তৈরি করা হয়নি আজ পর্যন্ত, সেখানে শুধু কাগজপত্র দিয়ে তিনি কী করবেন?
পত্রিকার আলোচ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, রাজধানীর কুড়িল উড়াল সড়ক থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার পূর্বে, জিন্দাপার্কের দক্ষিণ প্রান্তে পূর্বাচলের ২১ নম্বর সেক্টর। বড় বড় ঘাসে ঢাকা জায়গাটি দেখে বোঝার উপায় নেই যে, সেখানে কোনো প্লট আছে। শুধু উল্লেখিত ব্যক্তিই নন, শত শত মানুষ আজ হতাশ পূর্বাচল ও উত্তরায় প্লট পেয়েও। প্রকল্প নিয়ে সময়ক্ষেপণ আর দীর্ঘসূত্রতার প্রবণতা রাজউকের পাশাপাশি ওয়াসা, সিটি করপোরেশন, এলজিইডি প্রভৃতি সংস্থার কার্যক্রমেও দৃশ্যমান। ফলে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে প্রকল্প ব্যয়ও বেড়ে যায় অনেক। এ দিকে এ চারটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের ১৪টি প্রকল্পে বাড়তি ব্যয় হয়েছে সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকার মতো। এমনকি ২০ বছরেও প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ার নজির রয়েছে।
প্রকল্পের খরচ বাড়ানোর বড় দৃষ্টান্ত যেসব প্রকল্প, সেগুলোর মধ্যে আছেÑ রাজউকের উত্তরা ও গুলশান লেকসহ চারটি প্রকল্প, ওয়াসার সায়েদাবাদ এবং পদ্মা ও মেঘনার পানি শোধনাগারসহ চারটি প্রকল্প, সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভার এবং এলজিইডির মৌচাক-মগবাজার ফ্লাইওভার।
আলোচ্য প্রতিবেদনে আরো জানানো হয়েছে, রাজউকের প্রকল্পগুলোতে গ্রাহকেরা ৮৫ শতাংশ টাকা শোধ করা সত্ত্বেও প্রকল্পের কাজ গড়ে ৪০ শতাংশই বাকি। তাদের কাজের শম্ভুকগতির একটি নমুনাÑ পূর্বাচলে পানির লাইন বসাতে ওয়াসার সাথে গত ১০ সেপ্টেম্বর চুক্তি করা হয়েছে। অথচ প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়েছিল ১৭ বছর আগে। এ দিক দিয়ে উত্তরা তৃতীয় প্রকল্পের অবস্থা আরো খারাপ। সেখানে ২০ বছরেও পানির লাইন বসেনি। কয়েকটি প্রকল্পে বিদ্যুতের খুঁটি আছে, তার নেই।
প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব এবং সেই সাথে এর ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলো বলেছে, জমি অধিগ্রহণ সমস্যা, সেবা সংস্থাগুলোর অসহযোগিতা, রাস্তার কাজ শুরু করার অনেক পরে প্রকল্পে সেতু যোগ করা প্রভৃতি কারণে এই অবস্থা। আসলে এর মধ্য দিয়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কাজে সমন্বয়হীনতা ও দায়িত্ববোধের অভাব ফুটে উঠেছে। আলোচ্য প্রতিবেদনে এ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ গ্রহণে ব্যর্থতা এবং সময়ক্ষেপণের প্রবণতাকেও দায়ী করা হয়েছে। এহেন প্রবণতা ও অদক্ষতার কারণ উদঘাটন এবং এর প্রতিকারের আশু ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, প্রকল্পের সময় বাড়ানো হয় অনেক ক্ষেত্রে অসৎ উদ্দেশ্যে। সময় বাড়লে অপচয়ই শুধু বাড়ে না, দুর্নীতির সুযোগও বাড়ে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.