কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়কের একাংশের অবস্থা। ছবিটি লক্ষ্মীপুর-বিত্তিপাড়ার মাঝামাঝি এলাকা থেকে তোলা :নয়া দিগন্ত
কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়কের একাংশের অবস্থা। ছবিটি লক্ষ্মীপুর-বিত্তিপাড়ার মাঝামাঝি এলাকা থেকে তোলা :নয়া দিগন্ত

কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়কের পুরোটাই খানাখন্দে ভরা

সাইফুল্লাহ হিমেল ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

কুষ্টিয়া শহর থেকে ঝিনাইদহ শহর পর্যন্ত প্রায় ৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ মহাসড়কের পুরোটাই খানাখন্দে ভরা। এ মহাসড়কে গাড়ি চালানোই যেন দায়। রাস্তার বড় বড় গর্তের কারণে গন্তব্যে পৌঁছাতে স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ সময় লাগছে। গাড়ির গতি কমিয়েও দুর্ঘটনার হাত থেকে রেহাই পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতিনিয়তই গর্তে পড়ে গাড়ি নষ্ট হতে দেখা যায়। রাস্তায় অসংখ্য গর্ত থাকায় দুই পাশের মাটির ওপর দিয়ে গাড়ি চলে। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা আরো বেড়ে যায়। যতই দিন যাচ্ছে কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়ক চালকদের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ভাঙা রাস্তায় গাড়ি চালাতে প্রচণ্ড মানসিক চাপে থাকতে হয় বলে জানিয়েছেন চালকেরা।
উত্তরাঞ্চলের সীমান্ত জেলা পাবনা থেকে লালন শাহ সেতু হয়ে কুষ্টিয়া জেলায় প্রবেশ করার পর থেকেই শুরু হয় ভাঙা রাস্তা। কুষ্টিয়া শহর হয়ে রাস্তাটি ঝিনাইদহ জেলা শহরে মিলেছে। পুরো রাস্তাই খানাখন্দে ভরা। সম্প্রতি কুষ্টিয়া শহর থেকে ঝিনাইদহের দিকে কয়েক কিলোমিটার রাস্তা সামান্য জোড়াতালি দিয়ে সংস্কার করা হয়েছে। রাস্তায় গর্তের সংখ্যা এত বেশি যে গর্ত ভরাট করে সংস্কার করা সম্ভব নয়।
কুষ্টিয়া সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এই মহাসড়কের সর্বশেষ সংস্কার কাজ হয় ২০১০-১১ সালে। সে সময়ে মহাসড়কের ওপরে যে স্তরটি দেয়া হয় তা একেবারেই নষ্ট হয়ে গেছে। সড়কের ক্ষমতা শতভাগ লোপ পেয়েছে। তাই এর ওপরে নতুন করে আরেকটি স্তর দিলেও তা থাকবে না। মূলত এ কারণেই শহরের তলি বটতৈলের পর থেকে ২০১০-১১ সালে দেয়া স্তর ড্রেজার দিয়ে সরিয়ে দিচ্ছে সওজ। এখন গাড়ি চলছে ২০১০ সালের আগে নির্মিত রাস্তার ওপর দিয়ে। এতে রাস্তার গর্তগুলো তুলনামূলক ছোট হয়েছে। তবে এতে সন্তোষ প্রকাশ করতে নারাজ পরিবহন চালকেরা।
কুষ্টিয়া শহর থেকে ঝিনাইদহে আসতে বিত্তিপাড়া ও লক্ষ্মীপুর হয়ে আসতে হয়। কিন্তু রাস্তা খুব খারাপ হওয়ায় বিড়ম্বনায় পড়তে হয় চালক ও যাত্রীদের। কুষ্টিয়া শহর থেকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দূরত্ব ২২ কিলোমিটার এবং ঝিনাইদহ শহর থেকে ২৪ কিলোমিটার। বিশ্ববিদ্যালয়ের এ গাড়িগুলো প্রতিদিন চারবার (সকালে দুই ট্রিপ এবং বিকেলে দুই ট্রিপ) যাওয়া-আসা করে। এতে প্রতিটি গাড়ি দিনে ২০০ কিলোমিটার রাস্তা চলে। এ ছাড়া কিছু গাড়িকে রাতেও আরো এক ট্রিপ দিতে হয়। এতে তাদের প্রতিদিন ২৫০ কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করতে হয়। বড় বড় গর্তে ভরা রাস্তায় প্রতিদিন ২০০-২৫০ কিলোমিটার গাড়ি চালিয়ে ঝাঁকিতে ঝাঁকিতে অসুস্থ হয়ে পড়েন বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি চালকেরা। কুষ্টিয়া-কাস্টমস মোড় রুটে চলা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গাড়ির চালক বলেন, ‘ঝাঁকিতে কোমরের ব্যথায় লোহার বেল্ট ব্যবহার করতে হচ্ছে। ঘুম বাদে সার্বক্ষণিক এটি ব্যবহারের জন্য বলেছে ডাক্তার। তাছাড়া ভাঙা রাস্তায় গাড়ি চালাতে প্রচুর মানসিক চাপ সহ্য করতে হয়।’
সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহনকারী একটি গাড়ি ক্যাম্পাস থেকে কুষ্টিয়ার উদ্দেশ্যে যাওয়ার পথে লক্ষ্মীপুর এলাকায় গর্তে পড়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়। ওই গাড়ির স্টাফদের সাথে কথা বলে জানা যায়, গাড়ির সামনের চাকা বড় একটি গর্তে পড়লে গাড়ি চালকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের গর্তের দিকে ঝুঁকে পড়ে। পরে পেছনের চাকা আরেকটি গর্তে পড়লে গাড়ি থেমে যায়। এ দিকে ক্যাম্পাসের ভাড়া করা গাড়িগুলোর বেশির ভাগেরই ফিটনেস নেই বলে জানা গেছে। ভাঙা রাস্তায় এসব লক্কড়-ঝক্কড় গাড়িতে চলাচল করা খুবই কষ্টকর। শিক্ষার্থীরা ভাঙা রাস্তায় ফিটনেসবিহীন গাড়িতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন ৫০ কিলোমিটার যাতায়াত করছে।
কুষ্টিয়া থেকে ক্যাম্পাসে নিয়মিত যাতায়াতকারী শিক্ষার্থী জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘২৪ কিলোমিটার রাস্তা গাড়িতে যেতে এক ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। রাস্তার বড় বড় গর্তের কারণে ঝাঁকুনিতে ক্লান্ত হয়ে যাই। ক্লাসে এসে খুব ঘুম পায়।’ ঝিনাইদহ শহর থেকে যাতায়াতকারী এক কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রতিদিন ভাঙা রাস্তায় যাতায়াত করে শরীর ব্যথা হয়ে গেছে। ব্যথার ট্যাবলেট খাচ্ছি।’
ইবি শিক্ষার্থীদের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া দোতলা গাড়ির সুপারভাইজার ফারুক হোসেন বলেন, ‘রাস্তা ভাঙা হওয়ায় গাড়ি ঘন ঘন নষ্ট হচ্ছে। আমার গাড়ির স্প্রিং এবং ব্যালান্স রড ভেঙে গিয়েছিল।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এক কর্তাব্যক্তির মাইক্রোবাস চালক বলেন, ‘ভাঙা রাস্তায় গাড়ি চালিয়ে শরীর ক্লান্ত হয়ে যায়। রাত ৯টা বাজতেই চোখ ভেঙে ঘুম আসে। রাস্তার কোনো সাইড দিয়ে গাড়ি নিলে ঝাঁকি কম লাগবে তা নিয়ে মানসিক চাপে থাকতে হয়।’
কুষ্টিয়া জেলা সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম বলেন, রাস্তার ওপরের লেয়ারটা নষ্ট হয়ে গেছে। মেটেরিয়াল আটকে ধরে রাখার মতো কোনো শক্তি ওপরের লেয়ারে নেই। ৪০ কোটি টাকার একটি বড় প্রকল্প অনুমোদনের জন্য আমরা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। অনুমোদন হলেই আমরা কাজ শুরু করব।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন প্রশাসক প্রফেসর ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে রাস্তার এমন বেহাল দশা কখনোই দেখা যায়নি। ঝিনাইদহ শহর থেকে ক্যাম্পাসে আসতে ঝাঁকিতে শরীর ব্যথা হয়ে যায়। এটি দেশের একটি অন্যতম ব্যস্ত মহাসড়ক। আমি মনে করি রাস্তার বেহাল দশার সাথে সরকারের ভাবমূর্তি জড়িত। এই রাস্তা দিয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪ হাজার শিক্ষার্থী চরম ভোগান্তি সহ্য করে নিয়মিত যাতায়াত করে। তাই যত দ্রুত সম্ভব এই রাস্তা সংস্কার করে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা ছাড়াও দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের জনসাধারণের ভোগান্তি দূর করা দরকার।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.