মহানবী সা:-এর জীবনী জানতে চেষ্টা করি

সংবিধান ও রাজনীতি
সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক

বালাগাল উলা বি কামালিহি,
কাশাফাদ্ দুজা বি জামালিহি,
হাসানাত জামিওঁ খিসালিহি,
সাল্লু আলাইহি ওয়া আলিহি।।
জগৎবিখ্যাত এবং ইতিহাস খ্যাত অমর কবি ও সুফি সাধক আল্লামা জালালুদ্দিন রুমী রহ:-এর সমসাময়িক কাব্যজগতের আরেকজন উজ্জ্বল নক্ষত্র ও আধ্যাত্মিক জগতের দীপ্তমান সূর্য ছিলেন ‘মুশাররফ উদ্দিন মুসলেহ বিন আবদুল্লাহ সাদি শিরাজি’ সংক্ষেপে যিনি শেখ সাদি নামে পরিচিত (১২০৯ থেকে ১২৯১ খ্রিষ্টাব্দ)। বিগত দেড় হাজার বছরে, যুগে-যুগে কালে-কালে বছরে-বছরে উৎসবে-উৎসবে দিনে এবং রাতে রাসূলপ্রেমিকরা কাব্যিক ভাষায় মহানবী সা:-এর প্রশংসা করেছেন, তাঁর প্রতি সম্মান জানিয়েছেন। মহানবী সা:-এর প্রতি নিবেদিত ও রচিত হাজার হাজার বা লাখ লাখ কবিতার চরণগুলোর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ কবিতার লাইন বা বাক্য হলো চারটি; যেগুলো রচনা করেছিলেন শেখ সাদি রহ:। সেই চারটি লাইন কলামের শুরুতেই লিখেছি; এখানে বাংলায় অর্থ লিখছি। অর্থ : ‘তাবৎ পূর্ণতা নিয়ে শীর্ষে হয়েছেন উপনীত/ অপার সৌন্দর্যে তিনি আলোকিত করেছেন তমসাকে/ আশ্চর্য চরিত্র তাঁর অতুলন সৌন্দর্যমণ্ডিত/রাহমাতুল্লিল আলামিন, হাজার সালাম তাঁকে।’

দিবসটির তাৎপর্য জানা গুরুত্বপূর্ণ
আজ ১৫ নভেম্বর ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দ এবং হিজরি ক্যালেন্ডার মোতাবেক সফর মাসের ২৫ তারিখ ১৪৩৯ হিজরি। আর চার দিন পর অথবা পাঁচ দিন পর রবিউল আউয়াল মাসের চাঁদ দেখা যাবে। চন্দ্র উদয়ের মুহূর্ত থেকে দ্বাদশ দিবসটি অর্থাৎ রবিউল আওয়াল মাসের ১২ তারিখ হচ্ছে বিশ্বনবী, মহানবী সা:-এর এই পৃথিবীতে আগমন দিবস তথা আমাদের ভাষায় জন্মদিন। বাংলাদেশে নবীপ্রেমিক মুসলমানরা এই দিবসের কয়েকদিন আগে থেকেই দিবসটি পালন করা শুরু করেন। কেউ পালন করেন মিলাদুন্নবী নাম দিয়ে, কেউ পালন করেন সিরাতুন্নবী নাম দিয়ে। সরকারের উদ্যোগে বঙ্গভবনে মিলাদ মাহফিল হবে, দিনটি ছুটি থাকবে। এর বেশি কিছু নয়। বড় বড় মহানগরী এবং শহরে সম্মান ও আনন্দের মিশ্রণে মিছিল বের হবে। আমরা যখন শিশু বা কিশোর ছিলাম তখন স্কুলে আলোচনা সভা হতো, মিলাদ মাহফিল হতো এবং মিষ্টি বিতরণ হতো। একজন অভ্যাসকারী মুসলমান হিসেবে আমি মনে করি, দিনটি পালন করা যেমনি গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ হলো দিনটির তাৎপর্য বোঝা। অর্থাৎ, এই দিনে জন্মগ্রহণকারী বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব, মহান আল্লাহ তায়ালার বন্ধু, সর্বশেষ রাসূল ও নবী এবং রাসূল ও নবীগণের ইমাম হজরত মুহাম্মদ সা:-এর জীবনের শিক্ষাগুলো নিয়ে চিন্তা করা। তাই এই দিনটিকে সামনে রেখেই আজকের কলাম।

আজকেই কেন এই কলাম?
বিগত ৭ নভেম্বর ছিল মঙ্গলবার। তারিখটিতে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখা কলাম প্রকাশিত হয়েছে; নয়া দিগন্ত পত্রিকায় বিশেষ ক্রোড়পত্রও প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু আমি ৭ নভেম্বর প্রসঙ্গে আমার লেখাটি বুধবার ১ নভেম্বর তারিখেই লিখে দিয়েছিলাম বিশেষ উদ্দেশ্যে। উদ্দেশ্য ছিল, ১ নভেম্বর যদি আমার কলাম কেউ পড়েন এবং যারা পড়লেন তাদের মধ্যে যদি কেউ চিন্তা করেন, তাহলে তিনি ৭ তারিখ সম্বন্ধে নিজের একটি ধারণা গঠন করার জন্য কয়েক দিন সময় পাবেন। আমার মনে একই প্রকার চিন্তা কাজ করছে ১২ রবিউল আউয়াল নিয়ে। আগামী কয়েক দিন এই কলামের পাঠক সময় পাবেন এ বিষয়ে চিন্তা করার জন্য। আমার আবেদন, সম্ভব, যতটুকুই সম্ভব চিন্তা করুন। চিন্তার বিষয় কী? বিষয় হলো মহানবী সা:-এর জীবনী, তাঁর কর্মগুলো; তাঁর পারিবারিক জীবন ও সমাজসেবার জীবন, মক্কায় ইসলাম প্রচারের জীবন, মদিনায় হিজরতের ঘটনা, মদিনায় ইসলামি রাষ্ট্রের উন্মেষ ও রাষ্ট্রনায়কের জীবন, সেনাপতির জীবন, নৈমিত্তিক সাংসারিকতার জীবন, নৈমিত্তিক ইবাদতের জীবন, যতটুকু দর্শনীয় ততটুকু আধ্যাত্মিকতার জীবন ইত্যাদি। ইনশা আল্লাহ বুধবার ২২ নভেম্বর তারিখেও আজকের কলামের বর্ধিতাংশ উপস্থাপন করব।

‘সংবিধান ও রাজনীতি’এবং আজকের কলাম
পাঠক খেয়াল করুন, নয়া দিগন্ত পত্রিকায় আগে ছয় ও সাত নম্বর পৃষ্ঠায় এবং গত দেড়-দুই মাস আগে থেকে আট ও নয় নম্বর পৃষ্ঠায় বিভিন্ন ব্যক্তির কলাম ছাপা হচ্ছে। বেশির ভাগ কলাম লেখকই নিয়মিত। পত্রিকার কর্তৃপক্ষ, অনেক কলাম লেখকের জন্যই একটা সুন্দর আবহ-শিরোনাম (জেনেরিক টাইটেল) করে দিয়েছেন। জনাব এবনে গোলাম সামাদের কলামের আবহ শিরোনাম হলো ‘আত্মপক্ষ’। আমার কলামগুলোর আবহ শিরোনাম হলো ‘সংবিধান ও রাজনীতি’। পত্রিকা কর্তৃপক্ষ আমার রাজনৈতিক পরিচয়কেই হাইলাইট করে এরূপ শিরোনাম দিয়েছেন বলে অনুমান করি। অতএব, একটি প্রশ্ন আমি উপস্থাপন করতেই পারি। প্রশ্নটি হলো, আজকের কলামটিও কি সংবিধান ও রাজনীতি এই আবহ শিরোনামের ছায়াভুক্ত হবে? উত্তরটা পাঠকই দেবেন; আগামী বুধবার ২২ নভেম্বর তারিখের কলামে আমিও অবশ্যই আংশিক উত্তর দেবো। আমার আজকের কলাম লেখার উদ্দেশ্য খুবই সাদামাটা; যেটা উপরের অনুচ্ছেদে ব্যাখ্যা করেছি।

কেন শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তিত্ব?
মহানবী সা:-এর জীবনী নিয়ে বহু পুস্তক লেখক বা কলাম লেখক বা প্রবন্ধকারকেই দেখেছি একটি পুস্তকের রেফারেন্স দিতে। এর নাম ‘দি হান্ড্রেড : অ্যা র্যাংকিং অব দি মোস্ট ইনফ্লুয়েনশিয়াল পারসনস ইন হিস্ট্রি’। এই বইয়ের লেখক পাশ্চাত্যের একজন অমুসলমান পণ্ডিত, যার নাম মাইকেল এইচ হার্ট। মাইকেল হার্ট পৃথিবীর বা মানবসভ্যতার ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বা সর্বাধিক প্রভাব বিস্তারকারী ১০০ জন ব্যক্তিত্বের তালিকা ও জীবনী প্রকাশ করেছেন তার বইয়ে। মাইকেল হার্টের মতে এবং তার বইয়ে প্রকাশিত তালিকা মোতাবেক, এই ১০০ জনের মধ্যে ক্রমিক নম্বর ১-এ আছেন বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সা:। অর্থাৎ মাইকেল হার্টের ভাষায়, মুহাম্মদ সা: হচ্ছেন মানবসভ্যতার ওপরে, মানব ইতিহাসের ওপরে সর্বাধিক প্রভাব বিস্তারকারী ব্যক্তিত্ব। অতএব সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তিনি জানতেন যে, তার এই বিবেচনা বা সিদ্ধান্ত প্রশ্নের সম্মুখীন হবে। তাই তিনি মুহাম্মদ সা:-এর জীবনী নিয়ে যে অধ্যায় তার পুস্তকের শুরুতেই আছে, এর শুরুতেই এই সিদ্ধান্তের সপক্ষে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ব্যাখাটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু এর মর্ম ব্যাপক। হার্ট লিখেছেন যে, ‘ইতিহাসে মুহাম্মদই একমাত্র ব্যক্তি যিনি ধর্মীয় অঙ্গনে এবং জাগতিক অঙ্গনে তথা উভয় ক্ষেত্রে চরমভাবে সফল হয়েছিলেন। বাকি ৯৯ জনের মধ্যে বেশির ভাগই কোনো না কোনো সভ্যতার কেন্দ্রে বা জনপদে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং উৎসাহব্যঞ্জক বা জ্ঞানবান্ধব পরিবেশে বড় হয়েছেন। কিন্তু ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে যখন মুহাম্মদ আরব উপদ্বীপের মক্কা নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তখন চতুর্দিকের জনপদগুলো, তাদের লেখাপড়ার এবং ধর্মীয় চিন্তাচেতনার স্তর তৎকালীন পৃথিবীর পরিচিত মানদণ্ডে নি¤œস্তরে ছিল। সেরূপ নি¤œস্তরে থেকেও তিনি একটি নতুন চিন্তা, নতুন চেতনা ও নতুন সভ্যতার উন্মেষ ঘটিয়েছিলেন।’ আমি (মেজর জেনারেল ইবরাহিম) মাইকেল হার্টের সিদ্ধান্তের কারণেই মুহাম্মদ সা:-কে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ মানুষ বলব না; বরং আমার নিজের বিশ্লেষণ ও নিজের বিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্তেই আমি তাকে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ মানুষ মনে করি।

সঠিক জ্ঞান কেন প্রয়োজন?
ভাঙন সৃষ্টি করা বা ভেঙে দেয়া সহজ, জোড়া লাগানো বা গঠন করা কঠিন। সমালোচনা করা খুব সহজ, সমালোচনার উত্তর দেয়া কঠিন। সমালোচনা করা খুব সহজ কেন? কারণ, গুজবের ওপর ভিত্তি করে, কানকথার ওপর ভিত্তি করে, চটকদার সংবাদ পড়ে, ভিত্তিহীন রচনা পড়ে যে হালকা জ্ঞান অর্জন করা হয় এর ওপর ভিত্তি করেই সমালোচনা করা যায়। কিন্তু সমালোচনার জনাব দিতে গেলে গভীর ও ব্যাপক লেখাপড়া করতে হবে, সুপ্রতিষ্ঠিত পণ্ডিতের সুপরিচিত লেখা পড়তে হবে এবং যেকোনো তথ্য বা মতামতের গোড়ায় যেতে হবে। এই কথাটি সাম্প্রতিক এক দশকের ফেসবুকের রচনাবলির ক্ষেত্রে যেমন প্রযোজ্য, তেমনি দেড় হাজার বছরের দ্বীন ইসলামের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, শুধু আজ বলে নয়, গতকাল এবং গত পরশু, এমনকি গত দশক বা গত শতাব্দী বা তার আগেও একটি প্রবণতা যেমন ছিল, সেই একই প্রবণতা আজো আছে। প্রবণতা হলো, সাধারণভাবে মুসলিম তরুণ-তরুণীরা লেখাপড়া থেকে দূরে থাকা, গবেষণা থেকে দূরে থাকা, কানকথা ও গুজবের ওপর নির্ভর করা, ইসলাম সম্পর্কে লেখাপড়াকে পশ্চাৎমুখিতা মনে করা এবং রাসূলুল্লাহ সা:-এর জীবনী পড়াকে অনুৎপাদনশীল শ্রম মনে করা। এই প্রবণতার কারণে, মুসলমান সমাজের তরুণ-তরুণী, সাধারণভাবে অর্থাৎ ব্যতিক্রম ছাড়া অন্যরা, আমরা যেকোনো বিষয়ের মৌলিক জ্ঞান থেকে দূরে থাকি।

ব্যক্তিগত জীবন থেকে একটি উদাহরণ
ব্যক্তিগত জীবন থেকে একটি উদাহরণ দিই। এসএসসি বা এইচএসসি লেভেলে ছিলাম কলা বিভাগের (বা মানবিক বিভাগের) ছাত্র। স্নাতক করেছি কলা বিভাগে অর্থাৎ বিএ। মাস্টার্স করেছি কলা এবং বিজ্ঞানের মাঝামাঝি। তবে কলার দিকে প্রাধান্য বেশি; মাস্টার্স ইন ডিফেন্স স্টাডিজ। আমি কোমরে ব্যথ্যা কেন হয়, গলব্লাডারে পাথর কেন হয়, চোখে কেন ছানি পড়ে ইত্যাদি নিয়ে গবেষণা করে কূল পাবো না। তাই জ্ঞানী ডাক্তারদের সিদ্ধান্তই মেনে নিই। কিন্তু পৃথিবীর উষ্ণতা কেন বেড়ে যাচ্ছে, সেটা সম্বন্ধে কিছু না কিছু জানতে চেষ্টা করি। কারণ, পুরোটা বুঝব না; কিন্তু কিছুটা বুঝব। বাংলাদেশ থেকে টাকা কিভাবে পাচার হয়, বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান নাম দিয়ে কিভাবে বড় বড় মাত্রার টাকা চুরি করা হয় ইত্যাদি চিন্তা করলে আমি হয়রান হই না। তাই চিন্তা করি; কারণ রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে এটা আমাকে বুঝতেই হবে। এখন মৌলিক প্রসঙ্গটি উপস্থাপন করি।

রাসূলুল্লাহ সা:-এর জীবনী জানার প্রাসঙ্গিকতা
আমার ঈমানে প্রথম বা আদি বা শিকড় যে বাক্যে এবং যে অনুভূতিতে নিহিত, সেখানে দু’টি শব্দ বা নাম পাশাপাশি অবস্থিত, একটি শব্দ বা নাম ‘আল্লাহ’ এবং অপর শব্দ বা নাম ‘মুহাম্মদ’। তাই মুহাম্মদ সা:-এর মাধ্যমে মহান আল্লাহ যে দ্বীন বা জীবন বিধান পৃথিবীতে আমাদের জন্য পাঠিয়েছেন, সেই প্রসঙ্গে চিন্তা করা আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে এবং সবার জন্য উপকারী তো বটেই। অনুরূপ, যাঁর মাধ্যমে সেই প্রতিষ্ঠিত দ্বীন এই পৃথিবীতে এসেছে, তাঁর সম্বন্ধে জানাও আমাদের কর্তব্য ও দায়িত্বের মধ্যে পড়ে এবং জানাটা নিঃসন্দেহে উপকারী। আমি মনে করি, দ্বীন সম্বন্ধে এবং রাসূল সম্বন্ধে না জানাটা বড় রকমের অপরাধ এবং মারাত্মক ক্ষতিকারক। এই দুনিয়ায় যে ব্যক্তি যত বড় পদ অলঙ্কৃত করেছেন, যত বড় দায়িত্ব পালন করেছেন, যত বেশি ধন-সম্পদের মালিক হয়েছেন, যত বেশি সুনাম অর্জন করেছেন, একজন বিশ্বাসীর দৃষ্টিতে বলতে চাই, তিনি ওই পরিমাণ বেশি বেশি আল্লাহর পক্ষ থেকে দয়াপ্রাপ্ত হয়েছেন। তাহলে যিনি যত বেশি দয়া পেয়েছেন, তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশও তত বেশিই হতে হবেÑ এটাই স্বাভাবিক। অতএব, যেসব মুসলমান ভাইবোন লেখাপড়া জানেন তাদের জন্য এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব যে, তারা মহানবী সা:-এর জীবনী পড়বেন এবং বুঝতে চেষ্টা করবেন। যেসব মুসলমান ভাইবোন আল্লাহর প্রেমে ডুব দিতে চান, নবী সা:-এর প্রেমে ডুব দিতে চান, তাদের জন্য এটা অত্যন্ত সহায়ক যে, তারা মহানবী সা:-এর জীবনী পড়বেন এবং বুঝতে চেষ্টা করবেন। এই সঙ্ঘাত-সঙ্কুল একবিংশ শতাব্দীতে, পৃথিবীর চারটি প্রধান মহাদেশে বিপদগ্রস্ত মুসলমানদের বিপদসঙ্কুল পরিবেশ সম্বন্ধে যদি গভীর ধারণা পেতে হয়, তাহলে যেকোনো আগ্রহী ব্যক্তির জন্য এটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় যে, তিনি মহানবী সা:-এর জীবনী পড়ে বুঝতে চেষ্টা করবেন। ইতিহাসে বর্ণিত আছে যে, মহানবী সা:-এর ইন্তেকালের পর, এক দিন একজন সাহাবি উপস্থিত হলেন মহানবী সা:-এর সম্মানিত স্ত্রী (তথা ‘মুসলমানগণের মা’) হজরত আয়েশা সিদ্দিকা রা:-এর সামনে। সম্মানিত সাহাবি, বিনীত আবেদন করলেন : ‘আমাদেরকে রাসূল সা:-এর চরিত্র সম্পর্কে কিছু বলুন।’ মা আয়েশা সিদ্দিকা রা: উত্তর দিলেন : ‘আপনি কি কুরআন পড়েননি? পবিত্র কুরআনই তো তাঁর অনুপম চরিত্র।’ অর্থাৎ পবিত্র কুরআনের আলোকেই রাসূলুল্লাহ সা: তথা নবীজীর পবিত্র জীবন গঠিত। পবিত্র কুরআনে প্রিয় বন্ধু রাসূল সা:-কে সম্বোধন করে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেছেন : ‘আপনি তো মহান চরিত্রের ওপর অধিষ্ঠিত’। মহান আল্লাহ তায়ালা, কুরআনের পাঠক ও বিশ্বাসীদের সামনে নবীজী সা:-এর পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন এভাবে : ‘তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের কাছে এক রাসূল এসেছেন। তোমাদেরকে যা উদ্বিগ্ন করে সেগুলো তাঁর জন্য কষ্টদায়ক। তিনি তোমাদের কল্যাণকামী, মুমিনদের প্রতি তিনি দয়ার্দ্র এবং পরম দয়ালু।’ অনুসন্ধিৎসু বা অনুসন্ধানী যেকোনো সচেতন মুসলমানই জানতে চাওয়ার কথা, স্বাভাবিক যুক্তিতে, কী কারণে বা কী যুক্তিতে বা কী প্রেক্ষাপটে মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় বন্ধু সম্বন্ধে এগুলো উপস্থাপন করেছিলেন। সম্মানিত পাঠক খেয়াল করুন, পূর্ববর্তী বাক্যে লিখেছি দু’টি শব্দ : স্বাভাবিক যুক্তিতে। কিন্তু সাম্প্রতিক বিশ্বে মুসলমানদের সামনে স্বাভাবিক যুক্তিগুলোকে অস্বাভাবিকভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। সহনীয় বিষয়গুলোকে অসহনীয় হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। সুন্দর সুস্মিত বিষয়গুলোকে অসুন্দর ও কঠোর হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। কারা করছে? পাশ্চাত্য বিশ্ব; বন্ধুবেশী শত্রু এবং অল্প বিদ্যায় আপ্লুত অহঙ্কারী মুসলমানরা। আমি নিজে প্রার্থনা করি মহান আল্লাহ তায়ালা যেন আমাকে বা আমাদেরকে সঠিক উপস্থাপনার সম্মুখীন করেন।

বই-পুস্তকের বিশাল ভাণ্ডার
রাসূলুল্লাহ সা: তথা নবীজীর জীবনী বা তাঁর জীবনের কর্ম সম্বন্ধে জানার জন্য সুযোগের কোনো অভাব নেই। বই-পুস্তকের অভাব নেই। যে ভাষায় মানুষের ইচ্ছা, সেই ভাষাতেই যথেষ্ট বই-পুস্তক এবং লেখাপড়ার উপাদান আছে। গত পাঁচ-ছয় দশকে, বাংলা ভাষায় অনেক জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি কর্তৃক মহানবী সা:-এর জীবনী লেখা হয়েছে বা তাঁর কর্মাবলির মূল্যায়নমূলক গ্রন্থ লেখা হয়েছে বা অন্যান্য ভাষা থেকে এ ধরনের পুস্তক বাংলায় অনুবাদ করে প্রকাশ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সা:-এর জীবনী গ্রন্থগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রাচীন ও নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ হলো ইবনে ইসহাক লিখিত ‘সিরাত’। এই গ্রন্থটি বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে। অতি সম্প্রতি বাংলা ভাষায়ও এর অনুবাদ পুনঃপ্রকাশ করেছে ঢাকা মহানগরের কাওরানবাজার ও ধানমন্ডিতে অবস্থিত ‘প্রথমা’ নামক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। ২০১৪ সালের ১২ জুলাই বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত ইসলামি বইমেলা থেকে ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রকাশিত ‘মহানবীর জীবন চরিত’ নামক গ্রন্থটি সংগ্রহ করি; ওই দিন ছিল রমজান মাসের ১৩ তারিখ। আলোচ্য বইটি হলো মিসরের বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক ডক্টর মুহাম্মদ হোসাইন হায়কল কর্তৃক আরবি ভাষায় প্রণীত ‘হায়াতে মুহাম্মদ সা:’ নামক গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ। অনুবাদক হচ্ছেন সাংবাদিক ও ইসলামি চিন্তাবিদ মাওলানা আবদুল আউয়াল। প্রায় এক দশক আগে বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও সঙ্গীতশিল্পী মুস্তাফা জামান আব্বাসী কর্তৃক লিখিত জীবনী গ্রন্থ ‘মুহাম্মদ-এর নাম’ আমার হস্তগত হয়েছিল। আরো দুই ডজন বইয়ের নাম উপস্থাপন করছি না। ইন্টারনেট, মানুষের জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রশস্ত রাস্তা খুলে দিয়েছে। গুগল-এ মুহাম্মদ সা:-এর জীবনের কোনো ঘটনা নিয়ে সার্চ দিলে বা জীবনী গ্রন্থের তালিকা প্রসঙ্গে সার্চ দিলে বিশাল তথ্যভাণ্ডার উপস্থিত হবে। তবে এখানে একটি সংবেদনশীল সাবধানতা অবলম্বন করতেই হবে; সেই প্রসঙ্গে ইনশাআল্লাহ আগামী সপ্তাহে আলোচনা করব।
লেখক : মেজর জেনারেল (অব:);
চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
যোগাযোগ : mgsmibrahim@gmail.com

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.