জানা-অজানার যন্ত্রণা ও আনন্দ

আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রতিদিনের খবরের কাগজ পড়লে ও সংবাদমাধ্যমের দিকে একটু মনোনিবেশ করলে যেকোনো মননশীল ব্যক্তিই শুধু নয়, সাধারণ মানুষ ভীত-শঙ্কিত-বিহ্বল না হয়ে পারেন না। কারণ হত্যা, ধর্ষণ, দখল, মিথ্যাচারসহ সব রকম অনাচার-অবিচার-অপরাধের গতি ক্রমবর্ধমান। এর গতিরোধে নানা প্রচারও চলছে একসাথে, কিন্তু সার্বিক অবস্থার কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। এ অবস্থাকে এক বিখ্যাত মার্কিন লেখক-সাংবাদিক রুগ্ণ সংস্কৃতির রোগবিজ্ঞান (Pathologies of diseased culture) বলে বর্ণনা করেছেন এবং সম্ভবত সঠিক মন্তব্যই করেছেন। এর ফলে জন্ম নিচ্ছে ‘হতাশার রোগ’, যা নানা অসামাজিক ও অগ্রহণযোগ্য কর্মকাণ্ডের জন্ম দিচ্ছে। এ অবস্থা এখন এমনভাবে জেঁকে বসেছে, সবাই এখন ভাবছে এটাই স্বাভাবিক। তাদের কাছে যা ভালো মানবিক এবং প্রশংসনীয় সেটা যেন অস্বাভাবিক।
সাংবাদিক ক্রিস হেজেস লিখেছেন, বৃহৎ জনগোষ্ঠী এমন হতাশায় ভুগছে শুধু তৃতীয় বিশ্বেই নয়; প্রথম বিশ্বের নেতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও এটা প্রবল হয়ে উঠছে প্রতিদিন। ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী যারা সব সম্পদ ও সুবিধা উপভোগ করছে, তারা তাদের প্রচার এবং নানা কর্মকাণ্ডের মাঝ দিয়ে জনমনকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করে তাদের স্বার্থ উদ্ধার করছে। বৃহৎ জনগোষ্ঠী ভুলেই গেছে তাদের অধিকার কী এবং তার হকদার তারা কি না। এই ক্ষুদ্র গোষ্ঠী নিরন্তর নানা অসামাজিক কর্মকাণ্ড এমনভাবে পরিচালনা করছে, যেন সেটাই স্বাভাবিক। ফলে চলছে অবিরাম সামাজিক সঙ্ঘাত ও সংঘর্ষ, যার সাথে সাধারণ মানুষ এবং বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। অথচ সেই কর্মকাণ্ডকে সমাজের স্বাভাবিক প্রকাশ বলে এই গোষ্ঠী নতুনভাবে জননিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। বিশেষ করে এসব জনবিরোধী কর্মকাণ্ডকে জনকল্যাণমূলক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বলে অভিহিত করা হয়।
এ কর্মকাণ্ডগুলো যখন বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কাছে সাধারণভাবে অগ্রহণীয় বলে প্রতিভাত হতে থাকে, তখনই বিপত্তির সৃষ্টি হয়। কারণ, তখন ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর শাসন-শোষণ-ভোগের বিঘœ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। যেহেতু এসব গোষ্ঠী জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে নিজেদের জাহির করে থাকে, তারা তখন অনুভব করতে থাকে, তাদের প্রতি জনগণের অবিশ্বাসের উত্তাপ। এরা তখন তাদের দলের নানা হাস্যকর অনুষ্ঠান ও কার্যক্রমের অবতারণা করে শুধু জনগণের দৃষ্টি পরিবর্তন করতে অথবা ভিন্নপথে পরিচালিত করতে। এ কার্যক্রম কখনো কখনো নিষ্ঠুর হয়ে থাকে। এমনটি হয় যখন এ গোষ্ঠী ক্ষমতাসীন থাকে এবং রাষ্ট্রকে ইচ্ছেমতো ব্যবহার করতে পারে। যেমনÑ হিটলারকে এখানে স্মরণ করা যায়। তার অগ্রহণীয় কার্যক্রম চলাকালে তিনি প্রকৃতিকে দোষারোপ করে বলেন, ‘আমি বুঝি না কেন মানুষ প্রকৃতির মতো নিষ্ঠুর হবে না’ (আই ডুনট সি হোয়াই ম্যান শুড নট বি এজ ক্রুয়েল এজ নেচার)। তার আরেকটি বক্তব্য ক্ষমতালোভীদের কাছে প্রিয়। হিটলার বলেছিলেন, ‘কোনো জাতি বা গোষ্ঠীকে পদানত বা জয় করতে চাইলে প্রথমে জনগণকে নিরস্ত্র করো।’ এ বক্তব্য দিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন স্বৈরাচার, ক্ষমতা দখলের এবং তা স্থায়ী করার পদ্ধতি। জনগণকে বাধ্যানুগত করতে হলে, তার সহজ পদ্ধতি হলো ক্ষমতাসীনদের কাছে অগ্রহণীয় যেকোনো কার্যক্রম, আলোচনা-সমালোচনা অসম্ভব করে তোলা এবং এ কার্যক্রমের প্রধান বাহন হলো ভীতি সৃষ্টি করা। তিনি সত্যে বিশ্বাস করতেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন বিজয়ে (ইট ইজ নট ট্রুথ দ্যাট ম্যাটারস, বাট ভিকটরি)। অন্য কথায় হিটলার বিশ্বাস করতেন শুধু শক্তির ব্যবহারে। আজ বিশ্ব তাকে নিপুণভাবে অনুসরণ করে চলেছে। একটি উদাহরণই যথেষ্ট। তা হলো, সত্য বলা নিয়ে নানা বিতর্ক।
যে সত্য তথ্য জানে এবং বলায় বিশ্বাস করে, অথচ সে তা বলতে পারছে না, এটা তার সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা। যেমন আধুনিক রাষ্ট্র, আর্থিক এবং শাসনব্যবস্থার নানা মিথ্যাকে ঢাকতে হচ্ছে এর পরিচালক এবং ব্যবহারকারীদের। লেখক চার্লস এইচ স্মিথ তার ‘সারভাইবাল দি প্রাইমার’ বইয়ে বিষয়টির বিশদ আলোচনা করে বলেছেন, ‘এটা জানার বোঝা’ (বার্ডেন অব নোজ), যা অত্যন্ত বিশাল ও গভীর। স্মিথ লিখেছেন, ‘জনগণকে সর্বদা এক ধোঁকার রাজ্যে রাখছে একসাথে রাষ্ট্র ও তার তল্পিবাহকেরা, যার মাঝে সংবাদমাধ্যমও একটি।’ ১) উদাহরণ হিসেবে চীনের ১৯৫০ সালের ‘গ্রেট লিপ ফরওয়ার্ডের’ চিত্রটি টেনে এনেছেন। তখন প্রতিটি চীনাকে তাদের সব লোহার বস্তু গলিয়ে রাষ্ট্রে জমা দিতে বলা হয়েছিল। যার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ দুর্ভিক্ষজনিত মৃত্যু ঘটে। এ ঘটনা পুরোপুরিভাবে কখনো জনসমক্ষে আসতে দেয়া হয়নি। যারা এসব তথ্য জানত, তারা জানার যন্ত্রণায় মৃত্যুবরণ করেন। একই ঘটনা ঘটছে সারা বিশ্বে, বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বে। ক্ষমতাবানদের জনবিরোধী কর্মকাণ্ডের তথ্য কদাচিৎ জনসমক্ষে আসে। ঠিক একইভাবে আজ মার্কিনি জনগণ শুনছে শুধু উন্নয়ন ও জাতীয় প্রবৃদ্ধির বিশাল প্রচার। স্মিথ লিখেছেন, ‘সাধারণ মার্কিনিরা জানে না, ক্ষুদ্র শাসকগোষ্ঠী ও তাদের তল্পিবাহকেরা ভোগ ও অপচয়ের মাঝ দিয়ে জাতীয় সম্পদ কেমন করে ধ্বংস করছে। একটা উদাহরণ দিয়েছেন তেলের অপচয় নিয়ে। প্রতিদিন দুই বিলিয়ন (২০০ কোটি) ব্যারেল তেল তাদের ২৬ কোটি গাড়ি খরচ করে। শাসকেরা জানেন তেলের ভবিষ্যৎ কী? তাই তারা তেলসমৃদ্ধ এলাকায় সঙ্ঘাত-সংঘর্ষ ইত্যাদির ব্যবহার করে এই প্রাকৃতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ করছে। ক্রিস হেজেস লিখেছেন, বিশ্বে যে যুদ্ধ-বিগ্রহ ও অশান্তি চলছে তার মূলে তাদের ক্ষমতাসীনেরা। এখানেও সেই যন্ত্রণা, জানার যন্ত্রণা। কেউ ভবিষ্যৎ জানে না এবং ভাবেও না। কারণ ক্ষমতাসীনেরা এবং তাদের বশংবদ সংবাদমাধ্যম বিরতিহীনভাবে নির্মাণ করে যাচ্ছে এক সোনালি সময়ের চিত্র। ‘মিথ্যা, ধোঁকা ও প্রচার সত্যিকারের চিত্রকে ঢেকে রাখছে। কিন্তু যখন সত্য বেরিয়ে আসবে, তা হবে ভয়ঙ্কর’, স্মিথ মন্তব্য করেছেন।
অথচ এমনটি হওয়ার কথা নয়। সম্পদের সঠিক ব্যবহার ও ক্ষমতাবানেরা যদি তাদের সুযোগগুলো সাধারণ মানুষের সাথে ভাগ করে নেয়, তাহলে ভবিষ্যৎ হয়তো ভয়ঙ্কর হবে না। স্মিথ এক মজার মন্তব্য করেছেন এর সমাধান নিয়ে। ‘আমরা টিভি বন্ধ করে দিতে পারি। অনলাইনের ব্যবহার সীমিত করতে পারি। তাহলে মগজধোলাই কম হবে। অপ্রয়োজনীয় তথ্য ভিড় জমাবে না। এটা অবশ্য ছোট্ট শুরু’, স্মিথ বলেছেন। অবশ্য তিনি বই পড়তে উৎসাহিত করেছেন, প্রিয়জনদের সাথে মেলামেশা বাড়াতে বলেছেন। তিনি আরো সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন ক্ষমতাবানদের প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়ে। তারা আইন তৈরি করছেন, নিয়ম বানাচ্ছেন এ কথা বলে যে, তারা জনগণ ও দেশকে রক্ষা করছেন। অথচ একটু হিসাব করলেই দেখা যাবে, এগুলো শুধু ক্ষমতাবানদের কাজে আসছে, তাদের সম্পদ বাড়ছে। জনগণের ভাগ্যে কিছুই নেই। তিনি বলেছেন, এসব ক্ষমতা ও সম্পদলোভীরা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য সব সময় পাগল থাকে এবং ক্ষমতায় যাওয়ার ক্ষেত্রে যেকোনো কর্মকাণ্ডের জন্য প্রস্তুত থাকে এবং প্রায়ই জনগণ এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি বলছেন, ‘এই অবস্থা যারা জানে এবং কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না, এটা তাদের বড় যন্ত্রণা।’
সম্ভবত মোক্ষম কথাটি বলেছেন বিখ্যাত লেখক নোয়াম চমস্কি। ‘প্রতিটি সরকারের প্রধান পথনির্দেশনামূলক নীতি হলো যতক্ষণ জনগণ বাধ্য থাকবে, প্রশ্ন করবে না, ততক্ষণ সব কিছু ঠিক। ক্ষমতাবানেরা তাদের সব প্রয়োজন ও আধিপত্যের জন্য সব রকম পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারবে।’ জনগণ ও তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই। মার্কিন সরকারের বাজেট আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, ‘সরকারের প্রতিরক্ষা বাজেট সারা অর্থনীতির টুঁটি চেপে ধরেছে।’ তিনি সন্ত্রাস দমনের নামে কর্মকাণ্ডের নিন্দা ও কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, ‘এগুলো মূলত সন্ত্রাস নির্মাণ করছে এবং সাধারণ মানুষের সব স্বাধীনতা হরণ করে তাদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে।’ এ প্রসঙ্গে তিনি সন্ত্রাস দমনের নামে মুসলিমবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিশদ আলোচনা করেন তার এক বক্তৃতায়। ‘মুসলমানেরা আমাদের স্বাধীনতাকে ঘৃণা করে বলে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত’ বলে যে বক্তব্য প্রেসিডেন্ট বুশ দেন, তিনি তার সমালোচনা করে বলেন, ‘মুসলমানেরা আমাদের স্বাধীনতা নয়, আমাদের নীতিকে ঘৃণা করেন। উল্লেখ্য, চমস্কির স্পষ্ট ভাষণ এবং সত্য উচ্চারণের কারণে তার লেখা মার্কিন প্রধান সংবাদমাধ্যমে ছাপা হয় না। অর্থাৎ সত্য প্রকাশ প্রায়ই অসম্ভব সেখানে। অন্যতম কারণ, তিনি মার্কিন ইতিহাস আলোচনায় ভয়ঙ্কর সত্যগুলো তুলে ধরতে পিছপা হন না।
নোয়াম চমস্কির একটি মন্তব্য অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য। ‘সারা বিশ্বে গণতন্ত্রের এমন অপব্যবহার আগে এত হয়নি।’ তার মতে, এখন গণতন্ত্রের ধারকেরা একটি নীতিতেই বিশ্বাস করে। তা হলো, কে তাদের বাধ্যানুগত। মত বা নীতির কোনো স্থান নেই। সারা বিশ্বেই এটা প্রবল। ফলে গণতন্ত্রের নামে চলছে দখল, শোষণ ও নিয়ন্ত্রণ। এটা তৃতীয় বিশ্বে এক কথায় ভয়াবহ। জনগণের মত প্রকাশের স্বাধীনতার নামে এ নিয়ন্ত্রণের সব পদ্ধতি নির্মাণ ও অনুসরণ চলছে। এ জন্য এখন নতুন হিটলারের প্রয়োজন হচ্ছে না। যখনই কেউ এর প্রতিবাদ করছে বা সত্য উদঘাটনের চেষ্টা করছে, তখন এই ক্ষমতাবানেরা রাষ্ট্র ও তার সব অঙ্গকে ব্যবহার করে সে প্রচেষ্টাগুলোকে স্তব্ধ করে দিচ্ছে। অন্য কথায়, গণতন্ত্রের এমন দুর্দিন এর জন্মকালীন সময়ে কল্পনা করা হয়নি। এসব জানা ও প্রকাশের অক্ষমতা সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা এবং না জানাই আনন্দ।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.