কাকরাইল মারকাজ মসজিদে দুই গ্রুপের সংঘর্ষ

তাবলিগ নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব নিরসনের উদ্যোগ

খালিদ সাইফুল্লাহ

তাবলিগের নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। ভারত থেকে শুরু হওয়া এ দ্বন্দ্ব বাংলাদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ভারতের নিজামুদ্দিনের অন্যতম শূরা সদস্য মাওলানা সাদ কান্ধলভির একক নেতৃত্ব দাবি ও আকিদাবিরোধী কার্যকলাপের কারণে এ দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি ঢাকার কাকরাইলে মসজিদ নির্মাণের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ নিয়ে দ্বন্দ্ব আরো বেড়েছে। এ জন্য বাংলাদেশের শীর্ষ আলেমরা আগামী জানুয়ারিতে টঙ্গীর ইজতেমায় মাওলানা সাদ কান্ধলভি যাতে আসতে না পারেন সে জন্য আগে থেকেই তৎপর হয়ে উঠেছেন। এ ব্যাপারে তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনার পাশাপাশি সরকারের সাথেও বৈঠক করেছেন। এ ছাড়া আগামী নভেম্বর বা ডিসেম্বরের প্রথম দিকে তাবলিগের পাঁচ সদস্যের একটি টিম ভারত সফরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ দিকে গতকালও কাকরাইল মসজিদে মাওলানা ওয়াসিফুল ইসলাম ও মাওলানা জুবায়ের আহমদ গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটেছে।
জানা যায়, আগামী ১৭ নভেম্বর শুক্রবার টঙ্গীতে তাবলিগের পাঁচ দিনব্যাপী জোড় শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এ জোড়ের প্রস্তুতি নিয়ে গতকাল দুপুরে কাকরাইল মারকাজে বৈঠকের আয়োজন করা হয়। বৈঠকের আলোচনার একপর্যায়ে আসন্ন জোড়ে নারায়ণগঞ্জ জেলাকে না রাখায় প্রতিবাদ জানান মাওলানা জুবায়ের আহমদ। এ নিয়ে তখন বাগি¦তণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে ওয়াসিফুল ইসলামের অনুসারীরা জুবায়ের আহমদ সমর্থকদের ওপর হামলা চালায়। তখন দুই গ্রুপে সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে এলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। রমনা থানার ওসি কাজী মইনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, মতবিরোধের জের ধরে তাবলিগের দুই গ্রুপের মধ্যে হাতাহাতি ও মারামারির ঘটনা ঘটেছে। পরিন্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। এ দিকে সংঘর্ষের পর তাবলিগের দুই গ্রুপের মুরব্বিদের নিয়ে বৈঠক করে পুলিশ। ওই বৈঠকে দুই গ্রুপ আর কোনো সংঘর্ষে জড়াবে না বলে মুচলেকা দেয়।
দেওবন্দে দিক্ষা নেয়া মাওলানা ইলিয়াস আখতার কান্ধলভি ১৯২৬ সালে অবিভক্ত ভারতে তাবলিগ জামাত প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর তার ছেলে মাওলানা ইউসুফ, পরে তাদের পরিবারের সদস্য মাওলানা এনামুল হাসান এ তাবলিগ জামাতের নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু এনামুল হাসানের মৃত্যুর পর তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য একক গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি না থাকায় শূরা সদস্যদের মাধ্যমে তাবলিগ পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ওই শূরা সভায় ভারত ছাড়াও পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা ছিলেন। মাওলানা ইলিয়াস আখতার কান্ধলভির বংশধর মাওলানা সাদ কান্ধলভিও ওই শূরার সদস্য রয়েছেন। তবে গত কয়েক বছর আগে থেকে তিনি নিজেকে আবার তার পরিবারের পূর্বসূরিদের মতো একক ইমাম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেন। এ নিয়ে শূরা সদস্যদের মধ্যে দেখা দেয় মতভেদ। এ ছাড়া মাওলানা সাদ কান্ধলভি ইসলামি আকিদাবিরোধী বিভিন্ন বক্তব্য ও কার্যকলাপ করছেন বলে শূরা সদস্যরা অভিযোগ করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাবলিগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শূরা সদস্য মাওলানা ইবরাহিম দেওনা, মাওলানা ইয়াকুব ও মাওলানা আহমদ লাট মাওলানা সাদ কান্দ্বলভীর তাবলিগ গ্রুপ থেকে বের হয়ে যান। এতে ভারতে সৃষ্টি হওয়া বিভক্তি বাংলাদেশেও ছড়িয়ে পড়ে। জানা যায়, বাংলাদেশে বর্তমানে ১১ সদস্যবিশিষ্ট একটি শূরা কমিটি রয়েছে। এদের মধ্যে মাওলানা ওয়াসিফুল ইসলামসহ কয়েকজন মাওলানা সাদের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রাখলেও মাওলানা জুবায়ের আহমদসহ কয়েকজন তার একক নেতৃত্ব মানতে রাজি নন। এতে দেখা দেয় দ্বন্দ্ব। কয়েক বছর ধরে চলে আসা এ দ্বন্দের জেরে গত বছর ভারতের মাওলানা সাদকে বাংলাদেশে বিশ্ব ইজতেমায় আসা ঠেকানোর চেষ্টা করা হয়। এ জন্য তাকে দিল্লির বিমানে ওঠার পরও প্রশাসন নামিয়ে দেয়। পরে অবশ্য কলকাতা বিমানবন্দর হয়ে বাংলাদেশে আসতে সক্ষম হন তিনি। এ কারণে গত বছরের টঙ্গী ইজতেমার প্রথম পর্বে তিনি বক্তব্য রাখতে পারেননি। তবে দ্বিতীয় পর্বে তিনি বক্তব্য রাখেন।
এ জন্য এ বছর আগে থেকেই মাওলানা সাদকে ঠেকাতে তৎপর হয়ে উঠেছে এ দেশের তাবলিগের মুরব্বিরা। গত ২৯ অক্টোবর দেশের তাবলিগ জামায়াতের কয়েকজন আলেম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে তার ধানমন্ডির কার্যালয়ে বৈঠকে মিলিত হন। ওই সভার পর গত ১২ নভেম্বর উত্তরার একটি মসজিদে তারা বৈঠকে বসেন। ওই সভায় হেফাজত ইসলামের নায়েবে আমির আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী, মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী, মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস, মাওলানা মাহফুজুল হক, মাওলানা ওবায়দুল্লাহ ফারুক, মাওলানা আবদুল কুদ্দস, মাওলানা সাজিদুর রহমান, মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। সভায় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির শাহ আহমদ শফীর উপস্থিত হওয়ার কথা থাকলেও অসুস্থ থাকায় তার পক্ষে ছেলে মাওলানা আনাস লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান। সেখানে তারা হুঁশিয়ারি জানান, দেওবন্দের অনুমোদন ছাড়া মাওলানা সাদকে বাংলাদেশে আসতে দেয়া হবে না। তা ছাড়া ভারতের নিজামুদ্দিন থেকে যেসব মুরব্বি বের হয়ে গেছেন তাদের ফিরিয়ে আনতে হবে। আর ভারতের বিভক্তি দেশে টেনে না আনারও আহ্বান জানানো হয় ওই সভায়। এ ব্যাপারে পাঁচ সদস্যের একটি টিমের ভারত সফরেরও সিদ্ধান্ত নেয় হয়। টিমের সদস্যরা হলেন, তাবলীগের মুরব্বি মাওলানা জুবায়ের আহমদ ও মাওলানা ওয়াসিফুল ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক, জমিয়তের উলামায়ে ইসলামের সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা ওবায়দুল্লাহ ফারুক। ত্েব আরেক জনের নাম এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এ দিকে এ ব্যাপারে আগামীকাল ১৬ নভেম্বর যাত্রাবাড়ী মাদরাসায় আবার তাদের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক নয়া দিগন্তকে বলেন, ভারতের নিজামুদ্দিনের তাবলিগের মুরব্বি মাওলানা সাদ কান্ধলভির আকিদা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তিনি ইসলামবিরোধী বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন। এ কারণে তাবলিগের অনেক মুরব্বি তাকে ছেড়ে চলে গেছে। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের কাকরাইলে তাবলিগ জামাতের মুরব্বি মাওলানা জুবায়ের আহমদ এবং মাওলানা ওয়াসিফুর রহমানের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। মাওলানা ওয়াসিফুর রহমান ভারতের মাওলানা সাদের পক্ষ নিলেও মাওলানা জুবায়ের তার ব্যাপারে ভিন্নমত পোষণ করেন। এ কারণে কয়েক বছর ধরে দ্বন্দ্ব চলছে। তিনি বলেন, আমরা বাংলাদেশে কোনো দ্বন্দ্ব চাই না। এ জন্য মাওলানা সাদ যাতে বাংলাদেশে না আসেন সে ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে।
মাওলানা ওবায়দুল্লাহ ফারুক বলেন, মাওলানা সাদ আকিদাবিরোধী কার্যকলাপ করছেন। এ কারণে তাকে এ দেশে আমরা গ্রহণ করতে পারি না। কিন্তু আমরা ভারতের মাওলানা সাদকে যেহেতু নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না, সে জন্য দেশের মসজিদে মসজিদে যাতে কোনো বিভক্তি দেখা না দেয় সে চেষ্টা করছি।
এ ব্যাপারে কাকরাইল মারকাজের ওয়াসিফুর রহমানের সমর্থক মুরব্বি অধ্যাপক মোশাররফ হোসাইন নয়া দিগন্তকে বলেন, মাওলানা সাদ তার আমলের মাধ্যমে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছেন। কিন্তু ইহুদি-নাসারদের দোসররা তাবলিগের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টির অপপ্রয়াস চালাচ্ছে। কিন্তু তারা সফল হবে না।
ওয়াসিফুর রহমানের আরেক সমর্থক মুরব্বি জাফর আলম নয়া দিগন্তকে বলেন, মাওলানা সাদ যেমন ঈমানের দিক থেকে বড় তেমনি অর্থের দিক থেকেও বড়। তার অনেকের সাথে যোগাযোগ আছে। তাকে নিয়ে কোনো ষড়যন্ত্র সফল হবে না।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.