রাস্তায় সন্তান প্রসব করা সেই পারভিন নিখোঁজ

আবু সালেহ আকন

আলোচিত সেই পারভিনের খোঁজ নেই। রাস্তায় সন্তান প্রসব এবং সেই সন্তানের মৃত্যু নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছিল পারভিনকে নিয়ে। আজিমপুর মাতৃসদন কর্তৃপক্ষ বলেছিল, ‘পারভিনকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মিডিয়ার সামনে তার স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।’ কিন্তু সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করে মাতৃসদন কর্তৃপক্ষ পারভিনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। সেখানে কয়েক দিন চিকিৎসার পর পারভিন কোথায় গেছে, কে বা কারা নিয়ে গেছে তা কেউ বলতে পারছে না। তবে সন্দেহ করা হচ্ছে, রাস্তায় সন্তানপ্রসবের ঘটনায় যাদের বিরুদ্ধে দায়িত্বহীনতার অভিযোগ তোলা হয়েছে তারা পারভিনকে কৌশলে আড়াল করেছে।
গত ১৭ অক্টোবর বেলা ১১টায় রাজধানীর আজিমপুর ‘মাতৃসদন ও শিশুস্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের’ সামনের রাস্তায় সন্তান প্রসব করে কিশোরী পারভিন। পারভিন একজন ভবঘুরে। রাজধানীর গুলিস্তান গোলাপশাহ মাজার হচ্ছে পারভিনের ঠিকানা। তার গ্রামের বাড়ি যশোরে। ১৬ অক্টোবর রাতে পারভিনের প্রসববেদনা উঠলে সে সোহেল নামে এক যুবককে ভাই ডেকে পায়ে ধরে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য বলে। সোহেল তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে নেয়ার পর চিকিৎসকেরা তাকে পরীক্ষা করে বলেন, তার স্বাভাবিক ডেলিভারি হবে। কিছুক্ষণ পর ডাক্তাররা আবার পরীক্ষা করে জানান, পারভিনের সিজার করাতে হবে। তার অবস্থা সঙ্কটাপন্ন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চেয়ে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালে ভালো চিকিৎসক রয়েছেন এবং সেখানে ভালো চিকিৎসা হবে। এসব বলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ডাক্তার পারভিনকে মিটফোর্ডে পাঠান। ভোর ৫টায় পারভিনকে মিটফোর্ডে নেয়ার পর তারাও পরীক্ষা করে বলেন, সিজারে বাচ্চা নিতে হবে। কিন্তু তাদের ওখানে ভালো হবে না। তখন তারা পারভিনকে আজিমপুর মাতৃসদন ও শিশুস্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যেতে বলেন। সেখান থেকে সকাল সোয়া ৮টায় মাতৃসদন ও শিশুস্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে নেয়া হয় পারভিনকে। কিন্তু সেখানে তার নামে কার্ড কিংবা রেজিস্ট্রেশন না থাকায় তারা পারভিনকে ভর্তি নেবে না বলে জানায়। অবস্থা গুরুতর দেখে পারভিনকে দ্বিতীয় তলার লেবার রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন লেবার রুমে কনসালট্যান্ট ডা: নিলুফা দায়িত্বরত ছিলেন। সোহেল জানিয়েছেন, লেবার রুমে নেয়ার পর এক নারী চিকিৎসক এসে তাদের বলেন, পারভিনের সিজার করতে হবে। ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা লাগবে। তোমাদের কাছে কত টাকা আছে? তখন পারভিন ও সোহেল তাদের কাছে টাকা নেই বলে জানালে তাৎক্ষণাৎ ওই চিকিৎসক চলে যান। এর কিছুক্ষণ পর হাসপাতালের পোশাক পরিহিত এক আয়া এসে পারভিনের হাত ধরে নিচে নামিয়ে দিতে টানাহেঁচড়া করতে থাকে। তিনি বলেন, আপনার চিকিৎসা এখানে হবে না, আপনি অন্য হাসপাতালে যান। না হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যান, আমরা ফোন করে দিচ্ছি। এই বলে আয়া তাকে টেনে নিচতলায় আনে। মাতৃসদনের দারোয়ান পারভিনকে টেনেহিঁচড়ে বাইরে বের করে দেয়। পারভিন হাঁটতে না পেরে কয়েকবার রাস্তায় পড়ে যায়। একপর্যায়ে রাস্তার ওপরই তার সন্তান প্রসব হয়। আশপাশের কয়েক মহিলা এসে চার দিকে কাপড় ধরে রাখলে সেখানে পুত্রসন্তান জন্ম দেয় পারভিন। খানিক পরেই সন্তানটি মারা যায়। সেখানে লোকজন যখন বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে তখন মাতৃসদন কর্তৃপক্ষ পারভিনকে ভেতরে নিয়ে যায় চিকিৎসা করানোর জন্য। সেই থেকেই পারভিন ভর্তি ছিল মাতৃসদনে।
এ দিকে বিষয়টি যখন গণমাধ্যমে প্রচার হয়, তখন দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। উচ্চ আদালত পারভিনকে কেন উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন। একই সাথে যারা পারভিনকে চিকিৎসা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে কেন আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে না তাও জানতে চেয়েছেন। স্বাস্থ্যসচিব, আইজিপি, সমাজকল্যাণ সচিব, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক, সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক, আজিমপুর শিশু মাতৃসদনের সুপার, মাতৃসদনের চিকিৎসক নিলুফার, ঢাকা জেলা প্রশাসক ও লালবাগ থানার ওসিকে রুলের জবাব দিতে বলেছেন আদালত। এ রুলের জবাব দেয়া হয় গত রোববার। কিন্তু জবাবে আদালত অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
গতকাল হাসপাতাল এবং পারভিনের বাড়িতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পারভিন কোথাও নেই। সকালে খোঁজ নিতে গেলে মাতৃসদনের তত্ত্বাবধায়ক ইসরাত জাহান সাংবাদিকদের বলেন, পারভিনকে ২১ অক্টোবর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। সেখানে পারভিন চিকিৎসাধীন আছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা যায় সেখানে পারভিন নেই। পারভিনকে ঠিকই সেখানে ভর্তি করা হয়েছিল কিন্তু কয়েক দিন চিকিৎসা নেয়ার পর তাকে ছাড়পত্র দেয়া হয়।
মাতৃসদনের তত্ত্বাবধায়ক বলেছেন, হঠাৎ পারভিনের মানসিক সমস্যা শুরু হলে তাকে ঢাকা মেডিক্যালে রেফার করা হয়। তখন থেকে দায়দায়িত্ব ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের গাইনি ওয়ার্ডের সিনিয়র স্টাফ নার্স ফারজানা গত রাতে বলেছেন, পারভিনকে হাসপাতালের সমাজকল্যাণ বিভাগ থেকে ভর্তি করা হয়েছিল। সমাজকল্যাণ বিভাগই বলতে পারবে সে কোথায় আছেন। সমাজকল্যাণ বিভাগে বারবার যোগাযোগ করেও সেখানে কাউকে পাওয়া যায়নি।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসির উদ্দিনের সাথে রাতে এ বিষয়ে কথা বলার জন্য তার মোবাইলে ফোন করা হলে তিনি কথা বলা সম্ভব নয় বলে ফোন কেটে দেন।
হাসপাতালে পারভিনকে না পেয়ে খোঁজ নেয়া হয়েছিল তার গ্রামের বাড়ি যশোরে। মোবাইলে পারভিনের মা রোজিনার সাথে যোগাযোগ করা হলে গত রাতে তিনি বলেন, পারভিন বাড়িতে যায়নি। পারভিনের বাবা অসুস্থ। পরিবারে আর কোনো সক্ষম লোক নেই যে পারভিনের খোঁজ নেবে। গোলাপশাহ মাজার এলাকাতে গিয়েও পারভিনের কোনো খোঁজ মেলেনি। সেখানে যারা নিয়মিত অবস্থান করেন তাদের অনেকেই পারভিনকে চেনেন। কিন্তু তারা বলেছেন, ঘটনার পর আর পারভিনকে তারা দেখেননি।
শাহবাগ থানার ওসি আবুল হাসান বলেছেন, পারভিনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি বা তাকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেয়ার ব্যাপারে থানা পুলিশকে কিছুই অবহিত করা হয়নি।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.