বিচারপতি জয়নুল প্রসঙ্গ

দুদকে সুপ্রিম কোর্টের চিঠি আদালতের মর্যাদা খর্ব করেছে : হাইকোর্ট

নিজস্ব প্রতিবেদক

আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কোনো রকম ব্যবস্থা গ্রহণ করা সমীচীন হবে না, জানিয়ে দুদককে পাঠানো সুপ্রিম কোর্টের চিঠি সর্বোচ্চ আদালতের মর্যাদা খর্ব করেছে বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, দুর্নীতি দমন কমিশনে পাঠানো আপিল বিভাগ প্রশাসনের দাফতরিক চিঠি কোনোভাবেই সুপ্রিম কোর্টের মতামত হতে পারে না।
বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ গতকাল মামলার রায়সহ সাতটি পর্যবেক্ষণ দিয়ে রুল নিষ্পত্তি করেছেন।
রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, কেবল দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রপতি ছাড়া যে কারো বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগের তদন্ত চলতে পারে। অথচ বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের ক্ষেত্রে দুদকের অনুসন্ধানের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের চিঠিতে ভুল বার্তা দেয়া হয়েছে।
তবে সাত বছরেও দুদকের ওই অনুসন্ধান শেষ না হওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করে রায়ে বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের বিরুদ্ধে তদন্তের ক্ষেত্রে সতর্ক হতে হবে, যাতে তাদের মর্যাদাহানি না হয় বা অকারণে হয়রানির শিকার হতে না হয়।
এই আবেদনের শুনানিতে আদালত জানতে চেয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টের এই চিঠির বিচার করার এখতিয়ার হাইকোর্টের আছে কি না। রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেছেন, ওই রুল যথার্থ (ম্যানটেইনেবল)।
আদালতে দুদকের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন আইনজীবী খুরশীদ আলম খান। বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন। অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জয়নুল আবেদীন।
এই রায়ের ফলে সুপ্রিম কোর্টের ওই চিঠি অবৈধ এবং বিচারপতি জয়নুলের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে কোনো বাধা নেই বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা। পরে খুরশীদ আলম সাংবাদিকদের বলেন, এ রায়ে প্রমাণিত হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের ওই চিঠি অবৈধ, যার আইনগত কোনো ভিত্তি নেই। এই চিঠি দেয়া ঠিক হয়নি।
তিনি জানান, সাবেক বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের বিরুদ্ধে সাত বছর ধরে অনুসন্ধান চলতে থাকায় আদালত অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
তবে এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের আইনজীবী মঈনুল হোসেন বলেন, এই রায় পজিটিভ। কারণ আদালত বলেছেন, সাত বছর ধরে অনুসন্ধান চলছে, এটা গ্রহণযোগ্য নয়। তাই রায়টি পজিটিভভাবে দেখছি।
গত ৩১ অক্টোবর এই চিঠির বৈধতা সংক্রান্ত রুলের শুনানি শেষে বিষয়টি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখা হয়েছিল। গতকাল পর্যবেক্ষণসহ এ মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। এর আগে এ সংক্রান্ত রুলের ওপর বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন। এ ছাড়া, অ্যামিকাস কিউরি ছিলেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জয়নুল আবেদীন, অ্যাডভোকেট প্রবীর নিয়োগী ও সমিতির সাবেক সম্পাদক এ এম আমিন উদ্দিন।
উল্লেখ্য, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০১০ সালের ১৮ জুলাই সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিশ দেয় দুদক। তার বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচারেরও অভিযোগ রয়েছে দুদকের কাছে।
বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের বিষয়ে অনুসন্ধানের স্বার্থে গত ২ মার্চ সুপ্রিম কোর্টের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চেয়ে চিঠি দেয় দুদক। এর জবাবে গত ২৮ এপ্রিল আপিল বিভাগের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার অরুণাভ চক্রবর্তী স্বাক্ষরিত একটি চিঠি দুদকে পাঠায় সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন।
ওই চিঠিতে বলা হয়, ‘বিচারপতি জয়নুল আবেদীন দীর্ঘকাল বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এবং আপিল বিভাগের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দায়িত্ব পালনকালে তিনি অনেক মামলার রায় প্রদান করেন। অনেক ফৌজদারি মামলায় তার প্রদত্ত রায়ে অনেক আসামির ফাঁসিও কার্যকর করা হয়েছে।
চিঠিতে আরো বলা হয়, বাংলাদেশের সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের দেয়া রায় সবার ওপর বাধ্যকর। এমন পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ আদালতের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির বিরুদ্ধে দুদক কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করলে, তার দেয়া রায়গুলো প্রশ্নবিদ্ধ হবে এবং জনমনে বিভ্রান্তির উদ্রেক ঘটবে। তাই সাবেক বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের কোনো রকম ব্যবস্থা গ্রহণ করা সমীচীন হবে না।
দুদককে গত ২৮ মার্চ সুপ্রিম কোর্টের দেয়া চিঠিটি হাইকোর্টের নজরে আনেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট বদিউজ্জামান তরফদার। এরপর গত ৯ অক্টোবর আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মো: জয়নুল আবেদীনের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান বন্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) সুপ্রিম কোর্টের দেয়া চিঠি কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে স্বপ্রণোদিত হয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট।
রুলে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল, দুদক চেয়ারম্যান, আপিল বিভাগের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার অরুণাভ চক্রবর্তী ও বিচারপতি জয়নুল আবেদীনকে দশ দিনের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়। গত ১৯ অক্টোবর রুলের ওপর প্রথম শুনানি শুরু হয়।
এ সময় দুদক আদালতকে জানায়, সুপ্রিম কোর্ট এই চিঠি দিলেও ওই বিচারকের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান থেমে থাকেনি। আর দুদকের চাহিদা অনুযায়ী ওই বিচারকের বিষয়ে নথিপত্রও পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট। এরপর রুলের ওপর শুনানি শেষে গত ৩১ অক্টোবর মামলাটি যেকোনো দিন রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন হাইকোর্ট। এরপর আদালত গতকাল এ মামলার ওপর পর্যবেক্ষণসহ রায় প্রদান করেন।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.