‘বিশ্বাসের ঋণ’ ডুবিয়ে দিচ্ছে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোকে

‘এলটিআর’ বিষয়ে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোতে সতর্কতা জারি
সৈয়দ সামসুজ্জামান নীপু

‘বিশ্বাসের ঋণ’ ডুবিয়ে দিচ্ছে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোকে। কারণ রাষ্ট্রীয় ব্যাংকে ঋণ খেলাপির মূল কারণই এই ধরনের ঋণ। এলটিআর (লোন অ্যাগেইনস্ট ট্রাস্ট রিসিপট) বা বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে ব্যাংকগুলো অনেক ক্ষেত্রে তাদের গ্রাহকদের ঋণ দিয়ে থাকে। এই ঋণের পরিমাণও হয়ে থাকে বিপুল অঙ্কের এবং শর্তের দিকেও থাকে বেশ শিথিলতা। ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম ও দুর্নীতি জড়িয়ে থাকে। তাই এ ঋণে খেলাপির সংখ্যাও অনেক। খোদ অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে বলা হয়েছে, ‘এলটিআর ঋণ খেলাপির মূল কারণ বলে ধারণা করা হয়। তাই বিষয়টি খতিয়ে দেখে এলটিআর প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে আরো সতর্ক থাকতে হবে।’
আজ অর্থ মন্ত্রণালয়ে এক বৈঠকে এই এলটিআর বিষয়সহ অন্যান্য আরো কিছু বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হতে পারে বলে জানা গেছে। ‘রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকের অবস্থা পর্যালোচনা : চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় উপায়’ শীর্ষক এই বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ইউনুসুর রহমান।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের এক সূত্র জানিয়েছে, আজকের বৈঠকে রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংক সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক শীর্ষ নির্বাহীদের থাকতে বলা হয়েছে। বৈঠকে বেশ কয়েকটি বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। সরকারি ব্যাংকের ‘প্রণোদনা’ ও ‘শাস্তি’র ব্যবস্থায় চালুর সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। ঋণ বিতরণ ও আদায়ের কাজে সংশ্লিষ্টদের ভালো ঋণ বিতরণ ও মন্দ ঋণ আদায়ের জন্য এই প্রণোদনা প্রদান করা হবে। অন্য দিকে মন্দ ঋণ বিতরণ ও ঋণ আদায়ে ব্যর্থতার জন্য শাস্তির ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হবে। দীর্ঘমেয়াদে বড় বড় ঋণ খেলাপিদের তালিকা পত্রিকায়ও প্রকাশ করা হবে।
দেশে বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৭৫ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে ৪৫ হাজার কোটির ঋণ অবলোপন করে দেয়া হয়েছে। কারণ এই ঋণ আর কখনো আদায় করা সম্ভব নয়। ঋণ খেলাপি ও অবলোপনকৃত ঋণÑ এই দুই বিভাগেই শীর্ষে রয়েছে রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো। সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১১ হাজার ৪২২ কোটি টাকা, জনতায় ৫ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা, অগ্রণীতে ৪ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা, রূপালীতে ৪ হাজার ৭৫৯ কোটি টাকা এবং বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৭ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা।
সূত্র জানায়, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের ঋণ খেলাপি, দুর্নীতি এবং অন্যান্য কারণে বর্তমানে বেশ খারাপ অবস্থায় রয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে অনেকটা ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকের সাথে বৈঠক করা হচ্ছে। এসব বৈঠকে অবস্থা উন্নয়নে বেশ কিছু সুপারিশ উঠে এসেছে। বর্তমানে এসব সুপারিশ চূড়ান্ত হওয়ার অপেক্ষায় আছে।
আজকের বৈঠকের জন্য তৈরিকৃত কার্যপত্রে সুপারিশে বলা হয়েছে, ঋণ প্রক্রিয়াকরণ ও ঋণ অনুমোদনের বিদ্যমান পলিসি/পদ্ধতি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার আলোকে নিয়মিত রিভিউ করতে হবে। ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বোর্ড কর্তৃক অনুমোদনযোগ্য ঋণের ক্ষেত্রে শাখা থেকে প্রধান কার্যালয় পর্যন্ত স্তরগুলোর দুই-একটি ধাপ কমানো যেতে পারে।
জমি বা ভূ-সম্পত্তিকে জামানত বা সহায়ক জামানত হিসেবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য জালিয়াতি প্রতিরোধে জামানত বা সহায়ক জামানতের বিষয়ে নীতিমালা প্রণয়নসহ একটি কেন্দ্রীয় তথ্য কোষ গঠন করা যেতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী ঋণ গ্রহীতাকে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল নেয়ার জন্য ১৫০ শতাংশ জামানত দিতে হয়। এটি পরিবর্তন/সংশোধন করার বিষয়টি পরীক্ষা করে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সাথে জামানত হিসেবে জমির মূল্যমান নির্ধারণে অনুসরণীয় নীতিমালা/গাইডলাইন প্রণয়নের মাধ্যমে ঋণ কেসের জামানত যাচাই প্রক্রিয়া উন্নততর করতে হবে।
সুপারিশে বলা হয়েছে ঋণ প্রস্তাব মূল্যমানের ক্ষেত্রে জামানতের পাশাপাশি প্রকল্পের ক্যাশ ফ্লো, ক্রেডিট রিস্ক গ্রেডিং ভালোভাবে বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক বিষয়টি মনিটর করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
‘নো ইউর কাস্টমার’ (কেওয়াইসি) ব্যাংক হিসাব খোলার জন্য বিবেচনা করা হয়। ঋণ গ্রহীতাদের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে সিকেওয়াইসি (সেন্ট্রাল কেওয়াইসি) এবং ই-বিএএম (ইলেকট্রনিক ব্যাংক এ/সি ম্যানেজমেন্ট) বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক অনুমোদিত তালিকভুক্ত সার্ভেয়ার/কোম্পানির মাধ্যমে ঋণ প্রস্তাবের ফিজিবিলিটি স্টাডি করার প্রস্তাব বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। ঋণ অনুমোদনের আগে অবশ্যই গ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের ক্রেডিট রেটিং করার ব্যবস্থা নিতে হবে।
কার্যপত্রে ঋণ আদায়বিষয়ক সুপারিশে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর শ্রেণীকৃত ও অবলোপনকৃত ঋণ আদায়ের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ঋণ বিতরণ ও আদায়ের কাজে সংশ্লিষ্টদের ভালো ঋণ বিতরণ ও মন্দ ঋণ আদায়ের জন্য প্রণোদনা প্রদান এবং মন্দ ঋণ বিতরণ ও ঋণ আদায়ে ব্যর্থতার জন্য শাস্তির ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদে বড় বড় খেলাপির তালিকা পত্রিকায় প্রকাশ করার ব্যবস্থা করতে হবে।
ব্যাংকগুলোর ১০০ কোটি টাকার ওপরে বৃহৎ খেলাপি ঋণ গ্রহীতাদের আলাদা ডেট-মনিটরিংয়ের আওতায় এনে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় ডেট রিকভারি ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। মামলার সংখ্যা কমানোর জন্য ঋণ গ্রহীতা বা তার পক্ষে মামলা করার ক্ষেত্রে ব্যাংকের পাওনা অর্থের ৫০ শতাংশ বাধ্যতামূলকভাবে জমা প্রদানের ব্যবস্থা প্রবর্তন করা।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.