ছাগলনাইয়ার হালিমের বাড়িতে শোক

ইরাকে দুই বাংলাদেশী অপহৃত : নিহত এক

আবুল হাসান ছাগলনাইয়া- পরশুরাম (ফেনী)

ইরাকের রাজধানী বাগদাদে অকথ্য নির্যাতনের পর আবদুল হালিম (৩৬) নামে এক বাংলাদেশীকে হত্যা করেছে স্বদেশীয় অপহরণকারী চক্র। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানায় অপহরণকারী চক্রের এ দেশীয় দুই সদস্যকে আটকের পর একই সাথে অপহৃত মোমিনুল নামে আরো এক বাংলাদেশীকে ইরাকে ছেড়ে দিয়েছে ওই চক্রটি।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ইরাক প্রবাসী ফেনীর ছাগলনাইয়ার আবদুল হালিম ও টাঙ্গাইলের কালিহাতির মোমিনুল নামে দুই বাংলাদেশীকে গত ১ নভেম্বর ওই চক্রটি অপহরণ করে। গত ১০ নভেম্বর হালিম ও মোমিনুলের স্বজনেরা টাকা দিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গেলে পুলিশের তৎপরতায় মোমিনুল ১৩ নভেম্বর সোমবার ভোরে অপহরণকারী চক্রের হাত থেকে ইরাকে মুক্তি পান। হালিমকে তিন দিন আগে অপহরণকারীরা মেরে ফেলেছে বলে হালিমের স্বজন ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশকে জানিয়েছেন মুক্তি পাওয়া মোমিনুল।
দুই বছর আগে ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার পাঠাননগর হরিপুর গ্রামের নুর আহম্মদের ছেলে আবদুল হালিম একটি এজেন্সির মাধ্যমে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত ইরাকের বাগদাদে যান। এর মধ্যে চলতি মাসের ২ তারিখ বিকেল ৪টায় একটি ইন্টারনেট নম্বর থেকে বৃদ্ধা মা হোসনেআরা বেগমের নম্বরে একটি ফোন আসে। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে আবদুল হালিম আহাজারি করে বলেন, মা এখানের লোকগুলো আমাকে ধরে এনে মারধর করে ঝুলিয়ে রেখেছে, তাদের ছয় লাখ টাকা না দিলে আমাকে মেরে ফেলবে। ওই সময় তার ভাইসহ অন্য স্বজনেরাও অপহৃত হালিম ও অপহরণকারী দলের সদস্যদের সাথে কথা বলেন। একইভাবে পরদিন ৩ নভেম্বর ও ৭ নভেম্বর রাত ১০টায় আবারো ফোন করে অপহরণকারী চক্রের সদস্যরা আবদুল হালিমকে মা ও ভাইয়ের সাথে কথা বলায়। ওই সময় তাকে বাঁচানোর আঁকুতি প্রকাশ করে বাড়িঘর বিক্রি করে হলেও তাদের টাকার ব্যবস্থার কথা বলেন হালিম। কথা বলার একপর্যায়ে হালিমকে মারধর শুরু করে তা তার স্বজনদের শোনায় তারা। পরদিন দুই লাখ টাকা জোগাড় করেছে বলায় তাকে ঝুলানো থেকে নামানো হয়। এরই মধ্যে হালিমের চোখ ও হাত বাঁধা অবস্থায় শরীরে নির্যাতনের আঘাত সংবলিত বেশ কিছু ছবি পাঠানো হয় তার স্বজনদের কাছে। হালিমের নির্যাতনের ছবি দেখে দিশেহারা মা-বাবা ও ভাই বাড়ি বন্ধক রেখে টাকা জোগাড় করে। হালিমের ভাই ওবায়দুর নুর মানিক অপহরণকারীদের দেয়া তথ্যানুযায়ী ট্রেনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আখাউড়া রেলস্টেশনে নামেন। তখন অপহরণকারীদের একজন মানিকের সাথে কথা বলে সে কোথায় আছে জানতে চায় ওবায়দুর নূর। মানিক টাকা নিয়ে আখাউড়ায় রয়েছেন জানিয়ে অপহৃত ভাই আবদুল হালিমের সাথে কথা বলতে চান। কিন্তু বারবার কথা বলার আগ্রহ ব্যক্ত করার পরও কথা বলতে না পারায় কৌশলে টাকা নিয়ে গভীর রাতে ট্রেনে চড়ে ফেনী চলে আসেন হালিমের ভাই মানিক।
এ দিকে গত ১০ নভেম্বর বৃহস্পতিবার অপর ইরাক প্রবাসী মোমিনুলের স্বজনেরা টাঙ্গাইল থেকে মুক্তিপণের টাকা নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যান। ঘটনাটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানা পুলিশকে জানানো হয়। খবর পেয়ে ওই থানার এএসআই মো: আবু আহম্মদ সুজন চক্রটিকে ধরতে তৎপর হন। অপহৃত দু’জনের স্বজনদের মধ্যে যোগাযোগের ভিত্তিতে দুইপক্ষ ব্রাহ্মণবাড়িয়া যায়। সেখানে যাওয়ার পর অপহরণকারীদের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নন্দনপুর নামার পর নদী পার হয়ে ওপারে যেতে বলে চক্রটি। তাদের গতিবিধি পুলিশ নজরে রাখে। এ সময় মুক্তিপণের টাকা নিতে ওই জেলার বিজয়নগর থানার নন্দকোলা গ্রামের গোলাম নবীর ছেলে এক সময়ের প্রবাসী হাবিল (৩৭) ও তার ভগ্নিপতি সদর থানার শিমরাইকান্দি গ্রামের হাফিজ আহম্মদের ছেলে সুমন (৩১) আসে। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে হাবিল ছিটকে পড়লেও পুলিশের জালে ধরা পড়ে সুমন। সুমনের দেয়া তথ্য মতে হাবিলের স্ত্রীকে পুলিশ আটক করলে হাবিল পুলিশের সাথে ফোনে যোগাযোগ করে। অপহৃতদের স্বজন ও পুলিশের যোগাযোগের ভিত্তিতে ইরাকে আটক মোমিনুলকে ছেড়ে দেয় ওই চক্রটি। হালিমকেও ছেড়ে দেয়ার কথা জানায় ওই চক্রটি। তবে বর্তমানে হালিমের ভাগ্যে কী ঘটেছে এ ব্যাপারে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত হালিমের স্বজনেরা নিশ্চিত হতে পারেননি। পুলিশ মুক্তি পাওয়া মোমিনুলের সাথে কথা বলে। মোমিনুলই পুলিশকে জানিয়েছে হালিমকে মেরে ফেলার কথা। এ দিকে ঘটনার খবর শোনার পর থেকে অপহৃত হালিমের বৃদ্ধ বাবা- মা নির্বাক, স্ত্রী ও স্বজনদের আহাজারিতে বাতাসভারী হয়ে উঠছে। হালিমের পাঁচ বছর বয়সী একমাত্র ছেলেকেও এ সময় কাঁদতে দেখা গেছে।
হালিমের বাবা নুর আহম্মদ কান্না জড়িত কণ্ঠে সাংবাদিকদের মাধ্যমে তার ছেলেকে জীবিত কিংবা মৃত অবস্থায় আনতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সবার সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছেন হালিমের ভাই আবদুল মতিন ও ওবায়দুর নুর মানিক।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানার এএসআই আবু আহম্মদ সুজন জানান, স্থানীয়ভাবে আরো কয়েকজনকে হালিমের অপহৃতের ঘটনায় জড়িত থাকার কথা শুনেছি। ইরাকে অপহৃত মোমিনুল ছাড়া পাওয়ার কথা জানিয়ে তিনি আরো বলেন, পাঁচ দিন ধরে পুলিশের তৎপরতায় ইরাকে অপহৃত দুই বাংলাদেশীর একজন মুক্ত হয়েছেন। হালিমকে অপহরণকারীরা মেরে ফেলেছে বলে মুক্তি পাওয়া মোমিনুল তাকে জানিয়েছেন বলেও জানান তিনি।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.