নিজে না খেয়ে ছোট ভাইয়ের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে রোহিঙ্গা শিশু নূরে জান্নাত :নয়া দিগন্ত
নিজে না খেয়ে ছোট ভাইয়ের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে রোহিঙ্গা শিশু নূরে জান্নাত :নয়া দিগন্ত
জরিপের প্রাথমিক কাজ শেষ

৩৬ হাজার রোহিঙ্গা এতিম শিশু শনাক্ত

কক্সবাজার (দক্ষিণ) সংবাদদাতা

উখিয়া-টেকনাফের ১২টি অস্থায়ী ক্যাম্পে ‘রোহিঙ্গা এতিম শিশু সুরক্ষা প্রকল্পে’ জরিপের প্রাথমিক কাজ শেষ করেছে সমাজসেবা অধিদফতর। জরিপে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও রাখাইন উগ্রবাদীদের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে ৩৬ হাজার ৩৭৩ এতিম শিশু শনাক্ত করা হয়েছে। ২০ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এ জরিপের প্রাথমিক কাজ ১০ নভেম্বর শেষ হয়।
এসব এতিমের মধ্যে কুতুপালং (লম্বাশিয়া) শরণার্থী শিবিরে রুবিনা নামে এক এতিম শিশুকন্যার সাথে কথা হয়। সাত বছরের রোহিঙ্গা এতিম শিশু রুবিনা মাতৃভাষায় এ প্রতিবেদককে জানায়,‘আধা রাতিয়া ঘুমত্ চমকি চমকি উড়ি। ঘুমত্ মাম্মা আঁরে ডাকে। বাবারে গুলি মারেদ্দে দেখিলে ঘুম ভাঙ্গি যা-গই।’ অর্থাৎ মধ্যরাতে ঘুমের মধ্যে চমকে উঠি। ঘুমে মা এসে আমাকে ডাকেন। বাবাকে গুলি করে হত্যার দৃশ্য দেখে ঘুম ভেঙে যায়।
মংডু প্রাংপ্রু গ্রামের আব্দুল্লাহ ও জুনুবাহারের সন্তান রুবিনা। বর্তমানে কুতুপালং (লম্বাশিয়া) শরণার্থী শিবিরে একমাত্র ভাইয়ের কাছে থাকে। বাবা-মাকে চোখের সামনে মারা যেতে দেখেছে সে। গত কুরবানির ঈদের দুই দিন পর তার বাবাকে মিলিটারি গুলি করে হত্যা করে। তার মা জুনুবাহার স্বামী শোকে পাথর হয়ে যান। মগ, উগ্রপন্থী বৌদ্ধ ও মিলিটারি মিলে তাদের গ্রাম পুড়িয়ে দিলে, অন্য গ্রামে তারা এক মাস অবস্থান করে। মিলিটারি একের পর এক রোহিঙ্গা গ্রাম পুড়াতে থাকায় বাধ্য হয়ে বাংলাদেশে পাড়ি দেয়।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার এক দিন আগে রুবিনার মা জুনু বাহার মারা যান। বাবা-মায়ের মৃত্যুর দৃশ্য বলতে গিয়ে এক রকম চুপ হয়ে যায় রুবিনা। শিশু রুবিনার চোখেমুখে এখনো ভয় ও আতঙ্ক কাজ করছে।
তার একমাত্র বড় ভাই জানায়, এখনো তার ছোটবোন ঠিকমতো খেতে চায় না। কারো সাথে তেমন কথা বলে না। একা একা বসে থাকে। মাঝ রাতে ঘুমের মধ্যে কান্নাকাটি করে। চিৎকার করে জেগে ওঠে। ছোটবোনের অস্বাভাবিক আচরণে সে চিন্তিত। রুবিনার মতো হাজারো এতিম শিশু বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে অবস্থান করছে।
খেলে ক্ষুধা চলে যায়, ওষুধে শরীরের ক্ষত সেরে যায়। কিন্তু হৃদয়ের ক্ষত সহজেই সেরে ওঠে না। সার জীবন দুর্বিষহ স্মৃতি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করবে রুবিনাদের। বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে ২০ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এ জরিপের প্রাথমিক কাজ ১০ নভেম্বর শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ও রোহিঙ্গা এতিম শিশু সুরক্ষা প্রকল্পের ফোকাল কর্মকর্তা মো: আল আমিন জামিলী। তিনি বলেন, জরিপের প্রাথমিক কাজ শেষ হলেও রোহিঙ্গা আসা অব্যাহত থাকায় জরিপের কাজ পরেও চলমান থাকবে। ফলে এতিম শিশুর সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। তবে এ পর্যন্ত প্রাথমিক কাজ শেষ হয়েছে। বর্তমানে ডাটা এন্ট্রির কাজ চলছে।
তিনি আরো বলেন শূন্য থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত রোহিঙ্গা এতিম শিশুদের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এতিম শিশু শনাক্তের ক্ষেত্রে কারো মা আছে; বাবা নেই। আবার কারো বাবা-মা কেউ নেই। অথবা মা, বাবা থাকার পরও পরিত্যক্ত শিশুদের এতিম বলেই গণ্য করা হয়েছে। পরে এসব রোহিঙ্গা এতিম শিশুকে সুরক্ষার মাধ্যমে সেবাযতœ দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
২৫ আগস্ট মিয়ানমারে চলমান সহিংসতার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ছয় লক্ষাধিক রোহিঙ্গা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসে উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয় নিয়েছে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.