সারা দেশ সফর করবেন বিএনপির শীর্ষ নেতারা

অব্যাহত থাকবে রাজনৈতিক কর্মসূচি
শফিকুল ইসলাম

দীর্ঘ ১৯ মাস পর রাজধানীতে বিশাল সমাবেশ করেছে বিএনপি। রোববারের ওই সমাবেশের পর বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীরা যেমন উজ্জীবিত তেমনি তাদের আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছে। বিএনপির কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল নেতাদের অনেকে জানিয়েছেন, তারা সমাবেশে অংশ নিয়ে দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কাছ থেকে ইতিবাচক বার্তা নিয়ে ফিরেছেন। এর মাধ্যমে তারা ‘ঝিমিয়ে পড়া’ তকমা থেকে মুক্ত হয়েছেন। নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন, প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে রাজধানীতে সমাবেশ করাটাই ছিল বিএনপির অন্যতম চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘ তিন মাস লন্ডনে চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরে কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের মধ্যে ত্রাণ দিতে যান বেগম জিয়া। কিন্তু যাত্রাপথে ফেনীতে তার গাড়িবহরে অতর্কিতে হামলা করা হয়। এ পরিস্থিতিতে ঢাকায় একটি সমাবেশ করা নিয়ে বিএনপি এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে সংশয় ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সুষ্ঠুভাবেই সমাবেশ সম্পন্ন হওয়ায় বিএনপি স্বস্তি বোধ করছে।
তবে সমাবেশে যাতায়াতের সময় যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তৃণমূলের বেশির ভাগ নেতাকর্মী। তারপরও হেঁটে সোহরাওয়ার্দীর সমাবেশস্থলে মিছিল নিয়ে সমাবেশে অংশ নেন বিএনপির লাখো নেতাকর্মী। বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্লান্তিভাব ছিল না বরং তারা উৎফুল্ল মেজাজে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমাবেশে অংশ নিয়ে তা সফল করেছে। সমাবেশ সফল করায় দলের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে অভিনন্দন জানিয়েছেন বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সমাবেশের পর বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে চাঙ্গা মনোভাব দেখা যাচ্ছে। এই মনোভাব ধরে রাখতে এবং সংগঠনকে আরো বেশি গতিশীল করতে বিএনপির সিনিয়র ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ জেলা পর্যায়ে সফর করবেন। তারা বেগম খালেদা জিয়ার ঘোষিত ‘ভিশন-২০৩০’ নিয়ে সারা দেশে জেলাপর্যায়ের নেতাকর্মীদের নিয়ে কর্মিসভা করবেন। পাশাপাশি বিশিষ্ট নাগরিকদের সাথে মতবিনিয় করবেন। চলতি নভেম্বর ও আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সারা দেশে তারা সফর করবেন বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।
এ দিকে আজ রাতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শীর্ষনেতাদের বৈঠকে ডেকেছেন বেগম খালেদা জিয়া। বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, শিগগিরই দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠক ডাকা হবে। সেখানে পরবর্তী কর্মসূচি ঠিক করা হবে। তবে নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং নির্বাচনী কার্যক্রম দুটোই অব্যাহত থাকবে।
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস পালন উপলক্ষে গত রোববার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক বিশাল সমাবেশ করে বিএনপি। দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া সমাবেশে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন, যা দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘ বক্তব্যে তিনি দেশের বর্তমান অবস্থা, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন, সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ, দেশের বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে তুলে ধরেন। এর আগে ২০১৬ সালে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ৫ জানুয়ারি গণতন্ত্রের ‘কালো দিবস’ পালন উপলক্ষে আয়োজিত সমাবেশে এবং একই বছরের ৫ মে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শ্রমিক সমাবেশে বক্তব্য দেন খালেদা জিয়া।
বিএনপির একাধিক নেতা আলাপকালে বলেন, নিরাপত্তার অজুহাতে সমাবেশ করতে দেয়ার ব্যাপারে সরকার নানা টালবাহানা ও গড়িমসি করেছে। অনেক জল্পনাকল্পনা শেষে ২৩ শর্তে সমাবেশ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু অনুমতি দিয়েও সমাবেশে আসার সময় বিভিন্ন এলাকায় যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। রাজধানীতে বাস চলাচল বন্ধ করা হয়।
রোববারের সমাবেশ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নয়া দিগন্তকে বলেন, দেশের মানুষ চায় একটি পরিবর্তন। তারা নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন চায়। এটিই ছিল সমাবেশের মূল স্লোগান। তিনি বলেন, দলের নেতাকর্মীরা শত বাধা উপেক্ষা করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমাবেশে অংশ নিয়েছেন। কোনো বাধাই সমাবেশে জনতার ঢল ঠেকাতে পারেনি। আল্লাহর রহমতে আমরা শান্তিপূর্ণভাবে একটি প্রতীক্ষিত সমাবেশ সম্পন্ন করেছি। তিনি বলেন, আমাদের জন্য এখন একটি খারাপ সময় যাচ্ছে। দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে প্রতি সপ্তাহে আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে। আমরা সময় বুঝে পরবর্তী কর্মসূচি দেবো।
দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, যানবাহন চলাচল বন্ধ করে আমাদের সমাবেশে সরকার বিঘœ সৃষ্টি করেছে। তবুও জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়ে সমাবেশ সফল করেছেন। এ ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি বিএনপি অব্যাহত রাখবে। আগামীর বাংলাদেশ নিয়ে ‘ভিশন-২০৩০’ বিষয়ে জনগণের কাছে ধারণা দিতে কর্মসূচি থাকবে। জনগণের দাবি আদায়ে বিএনপি যা করণীয় তা করবে। বেগম খালেদা জিয়া ঢাকার বাইরে এ ধরনের কোনো সমাবেশ করবেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের রাজনৈতিক অনেক কর্মসূচি থাকবে। তবে এই মুহূর্তে কোথাও কোনো কর্মসূচি নির্ধারণ করা হয়নি।
বিএনপির স্বেচ্ছাসেবকবিষয়ক সম্পাদক মীর সরাফত আলী সপু বলেন, সমাবেশে বিপুল জনসমাগম এটিই প্রমাণ করে যে, এ দেশের মানুষ আওয়ামী লীগ সরকারকে আর দেখতে চায় না। দেশের জনগণ চায় পরির্বতন এবং নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের অধীনে গ্রহণযোগ্য সুষ্ঠু নির্বাচন।
নেত্রকোণা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা: আনোয়ারুল হক নয়া দিগন্তকে বলেন, দীর্ঘ দিন পর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সমাবেশে নেতাকর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। তারা কেবল একটাই স্লোগান দিয়েছেন- আর তা হলো- আওয়ামী লীগকে দেশের মানুষ আর চায় না। তারা চায় নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ঢাকা মহানগর বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শেখ রবিউল আলম রবি বলেন, সরকার সমাবেশকে বাধাগ্রস্ত করতে যানবাহন চলাচল বন্ধ করা থেকে শুরু করে বাসাবাড়িতে তল্লাশি করে অনেক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে। কিন্তু সরকারের কোনো ষড়যন্ত্র কাজে আসেনি; সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সমাবেশে জনতার ঢল নেমেছিল। সমাবেশ থেকে নেতাকর্মীরা বেগম খালেদা জিয়ার কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পেয়েছেন। নিরপেক্ষ সহায়ক সরকার ছাড়া যে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না সে ব্যাপারে বিএনপির তৃণমূল একমত। এটিই জনগণের দাবি। আর এ দাবি আদায়ের জন্য বিএনপি আগের তুলনায় আন্দোলনের জন্য আরো বেশি প্রস্তুত। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশনার অপেক্ষায় আছি আমরা।
ছয় শতাধিক নেতাকর্মী নিয়ে সমাবেশে অংশ নিয়েছিলেন মাদারীপুরের শিবচর উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ইয়াজ্জেম হোসেন রোমান। তিনি বলেন, শত বাধা উপেক্ষা করে শান্তিপূর্ণ সমাবেশে অংশ নিয়েছি। দীর্ঘ দিন পর বেগম জিয়া আমাদের দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দিয়েছেন। আমরা এই সরকারকে আর দেখতে চাই না। তারা হচ্ছে ভোট ডাকাত। তাদের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। আমরা নিরপেক্ষ সহায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচনে যেতে চাই না। যত দিন স্বৈরাচারী সরকারের হাত থেকে দেশ মুক্ত না হবে তত দিন আমরা রাজপথ ছাড়ব না, ইনশাল্লাহ।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.