দশ বছর পরও সিডরের ভয়াবহতা ভুলতে পারেননি উপকূলের মানুষ

ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধগুলো আজো সংস্কার হয়নি
নয়া দিগন্ত ডেস্ক

আজ ভয়াল ১৫ নভেম্বর। ২০০৭ সালের এই দিনে প্রলয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’ আঘাত হানে বরগুনা ও পটুয়াখালী জেলাসহ দেশের উপকূলীয় এলাকায়। এতে হতাহত হন বহু মানুষ। ঘরবাড়ি, গবাদিপশু, গাছপালা, ফসলসহ সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয়। সিডর আঘাত হানার ১০ বছর অতিবাহিত হলেও এই অঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত বহু পরিবার এখনো বসতঘরে ফিরতে পারেনি। নদীর ঢালে ঝুপড়িতে কোনোমতে দিন পার করছেন তারা।
বরগুনা সংবাদদাতা জানান, জেলার লতাকাটা, আয়লাপাতাকাটা, ছোনবুনিয়া, কুমিরমারা, পদ্মা, বুড়িরচর, সোনাতলা, নিশানবাড়ীয়া এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, সিডরে এসব এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ এখনো পুনর্নির্মাণ না হওয়ায় খুবই হতাশ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিস সূত্রে জানা যায়, সিডরের আঘাতে বরগুনায় প্রাণ হারান এক হাজার ৫০১ জন মানুষ। ৩০ হাজার ৪৯৯টি গবাদিপশু ও ছয় লাখ ৫৮ হাজার ২৫৯টি হাঁস-মুরগি মারা যায়। জেলার দুই লাখ ১৩ হাজার ৪৬১টি পরিবারের সবাই কমবেশি তিগ্রস্ত হন। সম্পূর্ণ গৃহহীন হয় জেলার ৭৭ হাজার ৭৫৪টি পরিবার। এ ছাড়া আংশিক তি হয়েছে আরো এক লাখ ১২ হাজার ৩১টি বসতঘরের। এ ছাড়া রাস্তাঘাট, ব্রিজ- কালভার্ট, বিদ্যুৎসহ সব েেত্র ব্যাপক তি হয়। ঘূর্ণিঝড় সিডরের পর আসে ঘূর্ণিঝড় আইলা, তারপর মহাসেন। মহাসেনের আঘাতে বরগুনায় তেমন প্রাণহানি না হলেও সিডর ও আইলায় জেলায় বহু মানুষ নিহত হন। সিডরের পর পানি উন্নয়ন বোর্ড কিছু বেড়িবাঁধ সংস্কার করলেও বর্তমানে জেলার ছয় কিলোমিটার বেড়িবাঁধ পুরোপুরি এবং প্রায় ১৯ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ আংশিক ভাঙা রয়েছে। ফলে এখনো জেলায় লক্ষাধিক মানুষ দুর্যোগ ঝুঁকিতে রয়েছেন। বেড়িবাঁধগুলো পুনর্নির্মাণ না করায় এখনো ঝুঁকির মধ্যে আছে বরগুনার নদী পাড়ের বহু এলাকা। ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলায় নদী পাড়ে উজাড় হওয়া জমিতে এখন গড়ে উঠেছে শত শত ঘরবাড়ি ও আবাসন প্রকল্প। সেখানে বসবাস করছে বহু ভূমিহীন পরিবার। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা বলেন, বরগুনা জেলায় ২০০৭ সালে ১১৭টি সাইকোন শেল্টার ছিল। বর্তমানে আছে ৩২৪টি। জেলায় এখনো প্রায় ৩০০টি সাইকোন শেল্টারের চাহিদা আছে। এখনো লক্ষাধিক মানুষ বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছেন। এর মধ্যে জেলার তালতলী উপজেলাটি বেশি ঝুঁকিতে আছে।
জেলা প্রশাসক মোখলেসুর রহমান বলেন, ২০০৭ সালের মতো ঘূর্ণিঝড় এখন হলে খুব বেশি তি হবে না। তার প্রমাণ হলো ২০১৩ সালের ঘূর্ণিঝড় মহাসেন।
মির্জাগঞ্জ (পটুয়াখালী) সংবাদদাতা জানান, উপজেলার চরখালী ও মেন্দিয়াবাদ গ্রামের মানুষ সিডরের ভয়াবহতা আজো ভুলতে পারেনি। একদিকে জলোচ্ছ্বাসের তা বে সর্বস্ব হারিয়ে তারা নিঃস্ব, অন্য দিকে আবার ঝড়ের আশঙ্কায় এসব পরিবার এখনো পায়রা নদীর পাড়ে বেড়িবাঁধের ঢালে ছাপরার নিচে খুপড়িঘরে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। আকাশে মেঘ দেখলেই এখনো আতকে ওঠেন তারা। অন্যদিকে পায়রা নদীর ভাঙনে উপজেলার ২০ গ্রামের মানুষ আতঙ্কের মধ্যে দিনাতিপাত করছেন। ভাঙন রোধে তারা শক্ত বেড়িবাঁধ চান।
ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি মির্জাগঞ্জ উপজেলার সিডর ক্ষতিগ্রস্তরা। সব হারিয়ে অনেকেই ঢাকায় গেছেন কাজের সন্ধানে, কেউ বা নদীতে মাছ ধরে এবং কেউ অন্যের সঙ্গে কাজ করে পরিবারপরিজনের জন্য দু’ মুঠো খবার সংগ্রহ করার চেষ্টা করছেন। সিডরের তা বে উপজেলার কপালভেরা গ্রামের পালোয়ান বাড়িতে একই ঘরে স্বামী-স্ত্রীসহ ছয়জন মারা যান। মৃত জব্বার পালোয়নের ভাই রহিম পালোয়ান বলেন, তাদের ভাগ্যে তেমন কিছু জোটেনি।
জানা যায়, মির্জাগঞ্জে সিডরের আঘাতে ১০ হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত এবং ১১৫ জন নারী, পুরুষ ও শিশুর প্রাণহানিসহ অনেক সম্পদের তি হয়। আংশিক বিধ্বস্ত হয় ১৪ হাজার ৫০০ ঘর, গবাদিপশু মারা যায় দুই হাজার ৫০০, হাঁস-মুরগি মারা যায় এক লাখ ৩০ হাজার, ফসল বিনষ্ট হয় ১১ হাজার ৯৯০ একর জমির, সাত হাজার ৯৮৭টি পুকুরের প্রায় কোটি টাকার মাছ ভেসে যায়। এ ছাড়া উপজেলার ৮০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ২৪০টি মসজিদ সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়, ৩৪ কিলোমিটার পাকা ও ১৫৬ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক এবং ৩৫ কিলোমিটার বাঁধ তিগ্রস্ত হয়।
দশমিনা (পটুয়াখালী) সংবাদদাতা জানান, ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও দশমিনা উপজেলার সহায়সম্বল ও স্বজন হারানো মানুষ ফিরে যেতে পারেননি তাদের স্বাভাবিক জীবনে। একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই আর দুবেলা দুমুঠো খাবারের জন্য আজো নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। সিডরের ১০ বছর পরে কাউখালীতে আবাসন ও খাদ্য সঙ্কট পূরণ হওয়ায় তিগ্রস্তরা খুশি। তবে প্রতিবছর এ সময়টায় সিডরের কথা মনে করে তারা আঁতকে ওঠেন। ব্যাপক সম্পদ এবং স্বজন হারানোর ব্যথায় কেঁদে বুক ভাসান এ এলাকার মানুষ। মসজিদগুলোতে এবং বাড়ি বাড়ি দোয়া মুনাজাতের মধ্যদিয়ে এবারের সিডরকে স্মরণ করার প্রস্তুতি নিয়েছেন তারা। কাউখালীতে ১৫ হাজার ঘর-বাড়ি, শতাধিক ব্রিজ কালভার্ট, বহু শিাপ্রতিষ্ঠানসহ অফিস আদালত, হাটবাজার তিগ্রস্ত হয়েছে। সরকারি হিসাবে প্রায় ১০০ কোটি টাকার য়তি হয়েছে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.