রিপোর্ট হাস্যকর : এইচআরডব্লিউ

চোখে ধুলো দিতে চাইছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী : অ্যামনেস্টি

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ তদন্ত রিপোর্টে রাখাইন সঙ্কটে নিজেদের দায়দায়িত্ব অস্বীকার করে উল্টো রোহিঙ্গাদের ওপর দোষ চাপানোর ঘটনাকে ‘চোখে ধুলো দেয়া’র চেষ্টা বলে আখ্যায়িত করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। তেমনি আরেক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ওই রিপোর্টকে হাস্যকর বলে উড়িয়ে দিয়েছে। এএফপি, বিবিসি ও রয়টার্স।
মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যাকাণ্ড ও যৌন নিপীড়ন চালানো এবং ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়ার অভিযোগ উঠলেও প্রকাশিত সেনা-তদন্ত রিপোর্টে তা অস্বীকার করা হয়েছে। জাতিসঙ্ঘসহ অন্যান্য মানবাধিকার সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সঙ্কটের কারণ হিসেবে দেশটির সেনাবাহিনীর মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, জাতিগত নিধন ও মানবতাবিরোধী অপরাধকে দায়ী করলেও প্রকাশিত তদন্ত রিপোর্টে সেনাবাহিনী উল্টো দোষ চাপিয়েছে রোহিঙ্গাদের ওপর। দেশটির সেনাপ্রধান জেনারেল মিং অং হেইংয়ের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত সেনা তদন্ত রিপোর্টে বলা হয়, ‘নিরপরাধ গ্রামবাসীদের’ তারা গুলি করেনি, নারীদের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়ন চালায়নি, গ্রামবাসীকে নির্যাতন করেনি, আটক বা হত্যা করেনি, তাদের সম্পদ সোনা পশু চুরি করেনি, মসজিদে আগুন দেয়নি, বাড়িতে আগুন দেয়নি এবং তাদের তাড়িয়ে দেয়ার জন্য জোর করেনি। সেনাবাহিনী ওই তদন্ত রিপোর্টে দাবি করে, রোহিঙ্গাদের মধ্যে সন্ত্রাসীরাই গ্রামবাসীদের বাড়িতে আগুন দেয়। তাদের ভয়েই পালিয়ে যায় গ্রামবাসী।
গত আগস্টের শেষের দিকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর রোহিঙ্গাবিরোধী কিয়ারেন্স অপারেশনে রাখাইন থেকে এখন পর্যন্ত ছয় লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে চলে এসেছে। জাতিসঙ্ঘের শীর্ষ এক কর্মকর্তা রাখাইনের এ ঘটনাকে জাতিগত নিধনের প্রকৃষ্ট উদাহরণ বলে মন্তব্য করেছেন।
রোববার জাতিসঙ্ঘের অপর এক কর্মকর্তা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সঙ্ঘবদ্ধ গণধর্ষণ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনেছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশের কক্সবাজারে আশ্রয়শিবির পরিদর্শন করেছেন তিনি।
মিয়ানমার সেনাবাহিনী বলছে, সেনা অভিযানে ৩৭৬ জন সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে। তবে কোনো নিষ্পাপ মানুষের প্রাণহানি ঘটেনি। এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ব্রাড অ্যাডামস বলেন, বার্মিজ সেনাবাহিনীর ‘হাস্যকর’ এ তদন্তরি পোর্ট বুঝিয়ে দিচ্ছে দায়ীদের শনাক্ত করতে কেন আন্তর্জাতিক স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন।
মিয়ানমারের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা করতে আজ বুধবার দেশটিতে সফরে যাবেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন। তার এ সফরের মাত্র দু’দিন আগে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ এই রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়। এর আগে সোমবার ম্যানিলায় আসিয়ানের সম্মেলনে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সু চির সাথে সাাৎ করেন টিলারসন। সম্মেলনে রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব অ্যান্থনিও গুতেরেসের সাথে আলোচনা করেছেন সু চি। এ সময় রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফেরত নিতে আবারো সু চির প্রতি আহ্বান জানান গুতেরেস।
মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ও সেনাবাহিনীর ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপে মার্কিন সিনেটররা ওয়াশিংটনে চাপ তৈরি করেছেন। মিয়ানমার সফরে এসে টিলারসন দেশটির সেনাপ্রধানকে কঠোর বার্তা দিতে পারেন বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, রোহিঙ্গাদের জাতিগত পরিচয় আড়াল করতে তাদের বাঙালি সন্ত্রাসী নামে ডাকে মিয়ানমার। ২৫ আগস্ট রাখাইনে পুলিশ ফাঁড়িতে কথিত রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হামলার পর সামরিক অভিযান জোরদার করে মিয়ানমার। তখন থেকেই রাখাইনে প্রবেশাধিকার নেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও সংবাদমাধ্যমের। সে কারণে সেখানকার চলমান পরিস্থিতি সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য জানা সম্ভব হচ্ছে না। তবে বিবিসিসহ বেশ কিছু সাংবাদিককে সাথে করে ওই এলাকা ঘুরে দেখিয়েছেন মিয়ানমারের সরকারি কর্মকর্তারা। বিবিসির দণি এশিয়ার সংবাদদাতা জোনাথন হেড জানিয়েছেন, তিনি নিজেই রাখাইনের রোহিঙ্গাদের গ্রামে বৌদ্ধদের আগুন লাগিয়ে দিতে দেখেছেন। সে সময় সেখানে সেনাবাহিনী মিয়ানমারের সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী উপস্থিত ছিল। অ্যামনেস্টি সত্য অনুসন্ধানে জাতিসঙ্ঘের অনুসন্ধানকারীদের ওই এলাকায় প্রবেশের অনুমতি দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
জাতিসঙ্ঘসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার অভিযোগ শুরু থেকেই অস্বীকার করে আসছে মিয়ানমার। এবার অভ্যন্তরীণ সেনা তদন্ত রিপোর্টেও একইভাবে সব দায়িত্ব অস্বীকার করা হলো। অ্যামনেস্টির একজন মুখপাত্র প্রকাশিত রিপোর্টের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বলেছেন, ‘একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে গেছে যে সেনাবাহিনী দায় স্বীকার করবে না। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেই এই সঙ্কট সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে।’

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.