মুনাফিকদের বিষাক্ত ছোবল

আবুল হাসান

ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে সাধারণত সমাজে তিন ধরনের লোক পাওয়া যায়। মুসলিম, নন মুসলিম আর মোনাফিক। আল্লাহর রাসূলের (সা:) জামানায়ও এই তিন ধরনের লোকের পরিচিতি ছিল। পবিত্র কুরআনে তাদের সম্বন্ধে খুবই জোরালোভাবে আলোচনা এসেছে। তাদের মধ্যে মুনাফিকেরা ছিল অন্যতম। তারা মুসলিম সমাজের জন্য এমনই ভয়ঙ্কর ছিল যে, তাদের ইসলাম ও মুসলিমবিরোধী ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের জন্য মহান রাব্বুল আলামিন তার রাসূলকে(স:) পবিত্র কুরআনের একেবারে প্রথম দিকেই তাদের থেকে সতর্ক থাকার জন্য বলে দিয়েছেন।
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা পবিত্র কুরআনে তাদেরকে ‘মুনাফিক’ নামে ডেকেছেন। যার অর্থ হলো নিজের সাধ ও স্বার্থ আদায়ের জন্য ‘গোপনে গোপনে’ চক্রান্ত করা, অর্থাৎ যার কথায় ও কাজে কোনো প্রকার সামঞ্জস্য বা মিল নাই। কাফির বা অবিশ্বাসীরা কিন্তু মুনাফিক না, কারণ তারা তো প্রকাশ্যভাবেই দ্বীন তথা কুরআন ও রাসূলকে অস্বীকার করেছে সেই জন্যই তাদেরকে কাফির বলা হয়ে থাকে, আর মুনাফিক মুসলমানদের মধ্য থেকেই হয়ে থাকে, সেই জন্য তাদের চিনতেও অনেক সময় কষ্ট হয়।
মুনাফিক কারা? তাদের চেনার উপায় কী? এই প্রশ্নের উত্তর আল্লাহর রাসূল (স:) এইভাবে দিয়েছেন যেÑ যার মধ্যে তিনটি কাজ পাওয়া যায় সেই মুনাফিক। এক, সে যখন কথা বলে মিথ্যা বলে। অর্থাৎ তার চরিত্রই হলো মিথ্যার ওপর বেসাতি করা। দুই, সে যখন কোন প্রতিজ্ঞা করে বা কথা দেয়, তখন সেটা সে ভঙ্গ করে’। অর্থাৎ ওয়াদা ঠিক রাখে না, ইচ্ছা করেই ওয়াদা ভঙ্গ করে এবং তাতেই সে আনন্দ পায়। তিন, তার কাছে যখন কেউ কিছু আমানত হিসেবে রাখে তখন সে সেটা আত্মসাৎ করে’। অর্থাৎ আমানতের খেয়ানত করে। অন্য একটি হাদিসে মুনাফিকদের চতুর্থ অভ্যাস হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে যেÑ তারা কথায় কথায় খারাপ ভাষা ব্যবহার করে, গালিগালাজ করে ও ঝগড়া করে। এই দোষগুলো যাদের চরিত্রে পাওয়া যাবে তারাই মুনাফিক।
সাধারণ মুসলমানেরা তাদেরকে পরহেজগার বা ভালো মানুষই মনে করে। তবে এটা তাদের আসল চেহারা নয়। তাদের আসল চেহারা চিনা সবার পে সম্ভবও না। আল্লাহ তায়ালা যেহেতু সবার অন্তরের খবরই জানেন তাই তাদের চরিত্র সম্বন্ধে তার রাসূলকে (স:) বলে দিয়েছেন যেÑ তারা ঈমানের দাবি করে বটে, কিন্তু যা সত্য তা হলো ‘তারা ঈমানদার না মুমিন না, তারা ধোকাবাজ চক্রান্তকারী।
আসলে তারা এই সব মুসলমান বেশধারী পরিচয়ের মাধ্যমে আল্লাহ এবং মুমিনদেরকে ধোকা দেয়ার চেষ্টা করছে, কিন্ত প্রকৃত ঘটনা হলোÑ তারা নিজেরা নিজেদেরকেই ধোকা দিচ্ছে যা তারা অনুভব করতে পারছে না’। কারণ তারা তাদের পেশায় ইউজড টু বা অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। ফলে তাদের জিহবা তাদের আয়ত্বের বাহিরে চলে যাওয়ার ফলে মুখে সত্য মিথ্যা যা আসে তাই তারা বলে ফেলে। এমন কি আল্লাহর ঘর মসজিদে দাঁড়িয়েও মিথ্যা কথা বলতে তাদের অন্তরে বাধে না, বরঞ্চ তারা আরো আনন্দ পায়।
মুনাফিকেরা এই গুলো কেন করে তারও ব্যাখ্যা আল্লাহ দিয়েছেন। তা হলো, ‘তাদের এই মুনাফিকির পেশাটা আসলে একটা রোগ, যা তাদের অন্তরে গেড়ে বসেছে এবং তাদের কু-অভ্যাসের মাধ্যমে তা বেড়েই চলেছে যার জন্য আল্লাহর প থেকে তাদের জন্য আযাবুন আলিম অপো করছে।
আবদুল্লাহ ইবনে উবাই বিন সলুল, মদিনাতে একেবারে রাসূলের (সা:) পেছনে নামাজ পড়ত। রাসূলের (সা:) হিজরতের আগে সে মদিনার বাদশাহ হওয়ার ঘোষণার পর্যায়ে ছিল। রাসূলের (সা:) ইমামতির জাগাটার পেছনের স্থানটিকে ইসলামি শরিয়তি ভাষায় বলে ‘আর রৌদাহ’ যার অথ হলো বাগান। ইসলামি পরিভাষায় যাকে বলে জান্নাতের বাগানের অংশ বা টুকরা। এখানে দাঁড়িয়ে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই নামাজ পড়ত। রাসূলের (সা:) মসজিদে রাসূলের পেছনে নামাজ পড়া কত বড় বুজুর্গির কাজ তাতো সহজেই বুঝা যায়। তদুপরি তার দাড়ি ও জামা লম্বা কম ছিল না।
তার কাজ ছিল মানুষকে ধোকা দেয়া, রাসূলের (সা:) বিরুদ্ধে, মুমিনদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করা, ষড়যন্ত্র করা এবং ষড়যন্ত্রকারীদের কূট পরামর্শ দেয়া। মুসলমানদের তা জানা ছিলনা। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা কোরআন শরীফের একটা পূর্ণ সূরা অবতীর্ণ করে রাসূলকে(স:) ও মুমিনদেরকে জানিয়ে দিলেন যে, রাসূলের পেছনে যে লোকটি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামায়াতের সাথে পড়ছে সে প্রকৃত পে মুমিন না, সে মুনাফিক। এবং সূরার নাম পর্যন্ত রেখে দিলেনÑ সূরা আল-মুনাফিকুন। যাতে করে কিয়ামত পযন্ত মানুষ এই সূরা থেকে শিা নিতে পারে যে, মুনাফিক কারা এবং তাদের বিষাক্ত ছোবল কেমন।
আল্লাহর রাসূল (সা:) একবার মসজিদে নববিতে সাহাবায়ে কেরামদের নিয়ে আলোচনা করছিলেন। আলোচনার মধ্যেই ‘ভোম্ব’ করে একটা বিকট আওয়াজ শুনা গেল। আল্লাহর রাসূল (সা:) সাহাবায়ে কেরামকে জিজ্ঞাসা করলেনÑ ‘যে আওয়াজটা শোনা গেল সেটা কিসের আওয়াজ বলতে পার কি? সাহাবায়ে কেরাম উত্তর দিলেন, আল্লাহ ও তার রাসূলই (সা:) ভালো জানেন। তারপর হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে আওয়াজটা তোমরা এখন শুনলে সেটা একটা বড় রক বা পাথরের আওয়াজ। এখন থেকে ৫০ হাজার বছর আগে সেটা ছাড়া হয়েছিল। গড়াতে গড়াতে জাহান্নামের সর্বনি¤œ জায়গায় গিয়ে এখন সেটা স্পর্শ করেছে। তারই আওয়াজ ছিল এটা।
পবিত্র কুরআন এই কথার স্যা এইভাবে দিচ্ছে যে, ‘মুনাফিকদের স্থান হবে জাহান্নামের অতল গহ্বরে অর্থাৎ সর্বনি¤œ গর্তে’।
লেখক : প্রবন্ধকার

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.