রোহিঙ্গা মুসলিম! ওরাও মানুষ

ড. মোহাম্মদ আতীকুর রহমান

রোহিঙ্গা মুসলিম! অবর্ণনীয় দুঃখদুর্দশায় নিপতিত একটি মানবগোষ্ঠী। কী অপরাধ তাদের? কেন আজ তারা উপেক্ষিত? কেন তারা বিশ্বসম্প্রদায়ের করুণা বঞ্চিত? কারণ একটাই? তারা মুসলমান! প্রশ্ন থেকেই যায়। জাতিসঙ্ঘ ও মুসলিম বিশ্ব সমবেতভাবে আজ কেন সর্বশক্তি নিয়ে তাদের পাশে নেই? কেন মুসলিম বিশ্ব ভুলে গেছে মহানবী সা:-এর সেই বাণী, যেখানে তিনি বলেছেন, ‘মুমিনদেরকে পারস্পরিক দয়া ভালোবাসা এবং হৃদ্যতা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে একটি দেহের মতো দেখতে পাবে’। এখনো সময় আছে, আসুন আমরা ঝাঁপিয়ে পড়ি আমাদের সেই সব রোহিঙ্গা ভাই-বোনের প্রতি, যারা দেশহারা, স্বজনহারা, চরমভাবে অবহেলিত, নির্যাতিত ও নিষ্পেষিত।
মানবাধিকার ও রোহিঙ্গা মুসলিম : মৌলিক মানবাধিকার (খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা) মানুষের জন্মগত অধিকার। সামাজিক জীব হিসেবে মানুষ ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ জীবনযাপনের জন্য যে সামাজিক সুযোগ-সুবিধা ভোগের দাবি রাখে এবং যা ছাড়া সে মানুষ হিসেবে জীবনধারণ, জীবনের প্রয়োজন মেটাতে পারে না এবং তার প্রতিভার বিকাশ ও উন্মেষ ঘটাতে ব্যর্থ হয় সেসব প্রয়োজন পূরণের লিখিত ব্যবস্থার নাম অধিকার। আর মানুষের মৌলিক অধিকার পূরণের নামই হচ্ছে মূলত মানবাধিকার।
মানবাধিকার হরণ বর্তমান বিশ্বে এক বহুল আলোচিত বিষয়। পরকালবিমুখ এক দল মানুষ মতার দাপটে অন্যের অধিকার হরণ করে নিজেদের আধিপত্য, প্রভাব-প্রতিপত্তি ও বিত্তবৈভবের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনে ব্যস্ত। দুর্বল মানুষ সবলের হাতে, দুর্বলগোষ্ঠী প্রবলগোষ্ঠীর হাতে, দুর্বল জাতি শক্তিধর জাতি দ্বারা আজ নানাভাবে নির্যাতিত হচ্ছে। ‘জোর যার মুল্লুক তার’ মাইট ইজ রাইটÑ এ নীতিতেই যেন পুরো দুনিয়া চলছে। মানুষের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তাদানের জন্য জাতিসঙ্ঘ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় গঠিত সংস্থাগুলো বিপন্ন মুসলিম জনগোষ্ঠীর সাহায্যার্থে যথাযথভাবে এগিয়ে আসতে চরমভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। এর বাস্তব প্রতিচ্ছবি হচ্ছে রোহিঙ্গার মুসলিম সম্প্রদায়।
নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের বাস্তবচিত্র : জাতিগত নিধনের এক পাঠ্যপুস্তকীয় দৃষ্টান্ত আজ বার্মার নির্যাতিত মুসলিম সম্প্রদায়। নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্তির সময় মানবতার দুশমন অং সান সু চির দেয়া বক্তব্য ‘বাকস্বাধীনতা ও ভীতিমুক্ত সমাজ পাওয়া মানুষের অধিকার’ এ বক্তব্যকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বার্মার স্থানীয় সরকার, কেন্দ্রীয় সরকার, সেনাবাহিনী, পুলিশ ও রাখাইন বৌদ্ধ সন্ত্রাসীরা পরিকল্পিতভাবে প্রতিটি রোহিঙ্গাকে বার্মা (মিয়ানমার) থেকে বের করে দেয়ার অভিপ্রায়ে গণহত্যার উন্মাদনায় মেতে উঠেছে। তারা মুসলিম অধ্যুষিত গ্রাম ও শহরে তাদের আটকে রেখে আগুনের গোলা ছুড়ছে। মৃত্যু আতঙ্কে পালাতে চেষ্টা করা মুসলিদের ওপর নির্বিচারে করছে গুলিবর্ষণ। ‘জীব হত্যা মহাপাপ’ কিন্তু ‘মানবহত্যা মহাপুণ্য’Ñ এ মন্ত্রে বিশ্বাসী বর্ণবাদী রাখাইন রাজনীতিবিদ ও ভিক্ষুরা দিনে দিনে সেখানে গড়ে তুলছে বর্ণ ও ধর্মের ঘৃণ্য পরিবেশ, যাতে নিরস্ত্র রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সব ধরনের সহিংসতাকে অনুমোদন দেয়া যায়। সেনাবাহিনীসহ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসীরা অগণিত মা-বোনের সম্ভ্রম নষ্ট করছে নির্বিকারচিত্তে। অনেক রোহিঙ্গা তাই প্রাণভয়ে পালাচ্ছে সাগরে কিংবা জঙ্গলে। সেখানেও রক্ষা নেই তাদের। সহস্রাধিক রোহিঙ্গার সলিল সমাধি হয়েছে বঙ্গোপসাগরে। বাধ্য হয়ে প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে এসেছে বাংলাদেশে একেবারেই শূন্য হাতে। বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের অধিকাংশেরই নেই মাথাগোঁজার ঠাঁই, আহারের সংস্থান, পয়ঃনিষ্কাষণের ব্যবস্থা। যথাযথ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত অনেকেই মুমূর্ষু অবস্থায় ছটফট করে দিন কাটাচ্ছে। অনেক মা তার সন্তানের পরিমিত আহার জোগাতে ব্যর্থ হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে দৌড়াচ্ছে এক মুঠো খাদ্য জোটাতে। ধর্ষিত হয়ে অনেক মা-বোন লাঞ্ছিত জীবনযাপন করছে। অবস্থা দর্শনে জাতিসঙ্ঘের কর্মকর্তা অশোক নিগম বলেছেন, ‘জাতিসঙ্ঘ রোহিঙ্গাদের নির্বাসন ও ধ্বংসযজ্ঞের ব্যাপারে শঙ্কিত।’
জাতি হিসেবে আমাদের কর্তব্য : আমরা বাংলাদেশী। পরোপকারে আমাদের রয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বী সবাই রোহিঙ্গা মুসলিমদের প্রতি যেভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন তার তুলনা বিরল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শরণার্থীদের করুণ অবস্থা দর্শনে তাদের দুর্দশা লাঘবে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বিশ্বময় রোহিঙ্গা মুসলিমদের পক্ষে জনমত গঠন ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের যথাযথ ভূমিকা পালনে উৎসাহিত করছেন। তিনি যে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। চ্যালেঞ্জিং পদ্মা সেতু নির্মাণে সরকারিভাবে যেভাবে অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছিল, রোহিঙ্গা মুসলিমদের দুর্দশা লাঘবের জন্য সেভাবে অর্থ সংগ্রহ করে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে অর্থ বণ্টন করা হলে শরণার্থীরা যথেষ্ট উপকার পাবে নিঃসন্দেহে।
মুসলিম হিসেবে আমাদের করণীয় : বাংলাদেশ আমাদের প্রিয় জন্মভূমি। এ দেশের অধিকাংশ নাগরিকই মুসলমান। রোহিঙ্গার নির্যাতিত মুসলমানদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য মুসলিম হিসেবে আমাদের রয়েছে বাড়তি কিছু দায়িত্ব। ইসলাম মুসলমানদের কাছে দাবি করে পারস্পরিক দয়া-বদান্যতা, সাহায্য-সহানুভূতি, দান-দক্ষিণা এবং পারস্পরিক সহযোগিতা। ইতিহাসের পাতা উল্টালে এর হাজারো নজির আমাদের চোখে ভেসে ওঠে।
মহানবী সা: মক্কার অত্যাচারী কাফের সম্প্রদায়ের অমানবিক অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে মহান আল্লাহর নির্দেশে মদিনায় হিজরত করে আসার পর মদিনার আনসাররা মুহাজিরিনদের যেভাবে সাহায্য করেছিলেন আজ আমাদের প্রয়োজন রোহিঙ্গার নির্যাতিত মুসলমানদের সেভাবে সহায্য করা। সে দিন আনসাররা মুহাজিরিনদেরকে নিজেদের ধনসম্পদ, আর ঘরবাড়িতে অংশীদার করে নিয়েছিলেন। তাদের পক্ষ থেকে তারা তাদের জরিমানা আদায় করে দিতেন। আর কয়েদিদের মুক্ত করার জন্য নিজেরা ফিদিয়া দিয়ে দিতেন। এক কথায় তারা মুহাজিরিনদের মনেপ্রাণে এমনভাবে আপন ভাইয়ের মতো করে নিয়েছিলেন যার নজির বর্তমান জগতে বিরল। এদের সেই ভ্রাতৃসুলভ আচরণের সাক্ষ্য দিয়ে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘তারা মুহাজিরদেরকে ভালোবাসে এবং মুহাজিরিনদেরকে যা দেয়া হয়েছে তার জন্য তারা অন্তরে আকাক্সক্ষা পোষণ করেন না। আর তারা তাদেরকে নিজেদের ওপর অগ্রাধিকার দেয় নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও। যাদেরকে অন্তরের কার্পণ্য থেকে মুক্ত রাখা হয়েছে, তারাই সফলকাম’ (সূরা হাশর : ৯)।
আমরা কি একটিবারের জন্যও চিন্তা করে দেখেছি, আজ যে রোহিঙ্গা মুসলমানরা বাধ্য হয়ে দেশান্তরিত হয়েছে তারা তো আমাদেরই ভাই-বোন। তারা আজ কতটা অসহায়? তারা আজ কতটা বিপন্ন? তাদের অনেকেই মা-হারা, বাবাহারা, সন্তানহারা, অনেকেই পঙ্গুত্ব বরণ করে দিশেহারা। আমরা কি তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসতে পারি না? আমাদের অবশ্যই এগিয়ে আসা উচিত। কারণ আমরা তো সেই মহান ব্যক্তিদের উত্তরসূরি, যারা মহানবী সা: মদিনা শরিফে হিজরত করে আসার পর আনসার সাহাবাদের রা: অন্তর নিংড়ানো ভালোবাসা এবং প্রাণ উজাড় করা সাহায্যে শান্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পেরেছিলেন। আমরা যদি আজ আনসার সাহাবিদের মতো রোহিঙ্গা মুহাজিরদের সাহায্যে এগিয়ে আসি তাহলেই স্বার্থক হবে আমাদের মুসলিম হয়ে জন্ম। মুসলিম হিসেবে আমাদের নৈতিক দায়িত্ব হবে তাদের পাশে দাঁড়ানো। তাদের অভাব দূর করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করা।
রাষ্ট্রপ্রধান, প্রধানমন্ত্রীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে আমাদের প্রত্যাশা; রোহিঙ্গা ভাই-বোনেরা যাতে নিজ দেশের নাগরিকত্ব লাভ করে তাদের দেশে সম্মানের সাথে নিরাপদে ফিরে যেতে পারেন তার জন্য চেষ্টা করবেন।
পরোপকারকারীদের সম্পর্কে মহানবী সা: বলেছেন, ‘গোটা সৃষ্টিকুল আল্লাহর পরিবার। অতএব যে ব্যক্তি আল্লাহর পরিবারের সাথে সদ্ব্যবহার করে সে আল্লাহর সর্বাধিক প্রিয় সৃষ্টি’ (বায়হাকি)।
শেষ কথা : রোহিঙ্গারা আজ মৌলিক মানবাধিকার বঞ্চিত। তারা অসহায়, অবহেলিত। তারা আজ করুণার পাত্র। কোটিপতি আজ পথের ভিখারি। দাতা আজ গ্রহীতা। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, তারা চেয়ে আছে মহান আল্লাহর সীমাহীন অনুগ্রহ এবং আপনার আমার পক্ষ থেকে সামান্য সহযোগিতাপ্রাপ্তির প্রত্যাশায়। বাংলাদেশী এবং মুসলিম জাতি হিসেবে আজ আমাদের করণীয় হচ্ছে রোহিঙ্গা ভাই-বোনদের পাশে দাঁড়ানো। তাদের দুঃখে দুঃখী হওয়া। তাদের সহযোগিতায় সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো। মহানবী সা: বলেছেন, ‘তোমরা ক্ষুধার্তকে খেতে দেবে, রোগীর পরিচর্যা করবে, বন্দীকে মুক্ত করে দিবে’ (বুখারি)। হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা যদি রোগীর সেবা করতে তাহলে আমাকেই সেবা করা হতো, তোমরা যদি অনাহারীকে আহার করাতে তাহলে আমাকেই আহার করানো হতো, তোমরা যদি বস্ত্রহীনকে বস্ত্র দিতে তাহলে তা আমাকেই দেয়া হতো’ (মুসলিম)।
আমরা জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবাই স্বীয় সাধ্যমতে, শারীরিক, মানসিক, আর্থিক, নৈতিক সহযোগিতা ও সমর্থন দিয়ে মহান আল্লাহর সন্তোষ অর্জন এবং মানবিকতা নিয়ে রোহিঙ্গা মুসলিমদের পশে দাঁড়াবো এবং বিশ্বজনমতকে কাজে লাগাতে সচেষ্ট হবোÑ এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
লেখক : গবেষক

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.